শিক্ষা মানুষের চিন্তা, শক্তি, বোধ ও মানবিকতা বিকাশের অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সেই শিক্ষার মূল ভিত্তি হলো বই। বই মানুষের জ্ঞানভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে, চিন্তার পরিধিকে প্রসারিত করে। ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এক কথায় বই মানুষের জ্ঞানের ভাণ্ডার। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের অভিজ্ঞতা, চিন্তা, আবিষ্কার দর্শনের সংকলনই হলো বইয়ের জগত।
একজন শিক্ষার্থী যখন একটি বই পড়ে, তখন সে কেবল কিছু তথ্যই জানে না! সে বিভিন্ন সময়, সংস্কৃতি ও মানুষের ভাবনার সঙ্গে পরিচিত হয়। বই পড়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, ভাষা দক্ষতা বৃদ্ধি পায়, চিন্তাশক্তি পরিপক্ব হয় এবং যুক্তিবোধ শক্তিশালী হয়। বইমুখী শিক্ষার্থী কেবল পরীক্ষার জন্য পড়ে না, শেখাকে জীবনের অংশ হিসেবে গ্রহণ করে পড়ে। আজীবন শিক্ষার মানসিকতা একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজের দীর্ঘমেয়াদি শক্তি।
মানবসভ্যতার অগ্রগতির ইতিহাস মূলত জ্ঞানচর্চার ইতিহাস। এই জ্ঞানচর্চার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও শক্তিশালী মাধ্যম হলো বই পড়া, বই লেখা। বই মানুষের মনের জগতের সকল অন্ধকার দূর করে জ্ঞানের আলোকে প্রসারিত করে। চিন্তার দিগন্তকে আলোকিত করে, মানুষকে মানবিক, দেশপ্রেম সচেতন ও সৃজনশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। একটি জাতির মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়ন অনেকাংশে নির্ভর করে সেই জাতির পাঠাভ্যাসের উপর। বর্তমান সময়ের বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, প্রযুক্তির দ্রুত প্রসার, বিনোদনের নানা মাধ্যম, পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার কারণে শিক্ষার্থী ধীরে ধীরে বই থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ফলে তাদের চিন্তাশক্তি, কল্পনাশক্তি, জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র সীমিত হয়ে পড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদেরকে বইমুখী করা শুধু একটি শিক্ষাগত উদ্যোগ নয়! এটি একটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের অপরিহার্য অংশ। একটি উন্নত, সচেতন ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।
শিক্ষার্থীদের বইমুখী করার প্রথম ও প্রধান ক্ষেত্র হলো পরিবার। শিশুরা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয় তাদের বাবা–মা ও পরিবারের সদস্যদের আচরণ থেকে। যে পরিবারের সদস্যরা নিয়মিত বই পড়েন, শিশুদের সঙ্গে বই নিয়ে আলোচনা করেন, তবে শিশুদের মধ্যেও স্বাভাবিকভাবেই বই পড়ার আগ্রহ তৈরি হয়। বই জ্ঞানচর্চার ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। সভ্যতার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান আবিষ্কার ও অভিজ্ঞতা মূলত বইয়ের মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়েছে। প্রাচীন যুগ থেকে মধ্যযুগ, আধুনিক যুগ পর্যন্ত মানুষ তার চিন্তা, দর্শন, বিজ্ঞান, সাহিত্য, ইতিহাসকে বইয়ের মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে দিয়েছে।
বই মানুষের জ্ঞানের এক অমূল্য ভাণ্ডার। একজন শিক্ষার্থী যখন একটি বই পড়ে, তখন সে শুধু কিছু তথ্য অর্জন করে না! সে অতীতের অভিজ্ঞতা, বিভিন্ন সংস্কৃতি, মানবজীবনের গভীর উপলব্ধির সঙ্গে পরিচিত হয়। বই পড়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা পৃথিবীকে নতুনভাবে দেখতে শেখে। বিশেষ করে সাহিত্য, দেশের সঠিক ইতিহাস, বিজ্ঞান ও দর্শনের বই মানুষের চিন্তাকে গভীর ও পরিপক্ব করে তোলে।
বই মানুষের কল্পনাশক্তিকে জাগ্রত করে, বিশ্লেষণী ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, সত্য–মিথ্যা বিচার করার বোধ তৈরি করে। বই হলো মানুষের সবচেয়ে নীরব, সবচেয়ে প্রভাবশালী শিক্ষক।
শিক্ষার্থীদের জন্য বই পড়ার গুরুত্ব বহুমাত্রিক। বই পড়ার মাধ্যমে তাদের জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয়, বহুমুখী হয়। পাঠ্যবইয়ের বাইরে বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরি হয়, যা তাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রসারিত করে। বই পড়া ভাষাগত দক্ষতা বৃদ্ধি করে। নিয়মিত বই পড়লে মনোজগতের শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয়, বাক্যগঠন সুন্দর ও সাবলীল হয়। প্রকাশভঙ্গি উন্নত হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা তাদের চিন্তা ও অনুভূতি আরও স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে পারে। বই পড়লে চিন্তাশক্তি ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা বাড়ে। বই পড়ার সময় পাঠক বিভিন্ন ধারণা ও তথ্যের সঙ্গে পরিচিত হয়, সেগুলো নিয়ে ভাবতে শেখে। ফলে তার সমালোচনামূলক চিন্তা ও যুক্তিবোধ শক্তিশালী হয়।
গল্প, উপন্যাস কিংবা কবিতা পড়তে পড়তে শিক্ষার্থীরা মানবজীবনের নানা আবেগ, সম্পর্ক ও বাস্তবতার গভীর উপলব্ধি লাভ করে। এতে তাদের মানবিকতা, সহানুভূতি ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি পায়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীদের বইবিমুখ হওয়ার অনেকগুলো কারণ আছে। প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার, স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও গেম ও অনলাইন, শিক্ষার্থীদের সময় ও মনোযোগকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করছে। দ্রুত বিনোদনের এই সংস্কৃতি ধৈর্য ও মনোযোগের অভ্যাসকে দুর্বল করে দিচ্ছে, যা বই পড়ার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
জাতির প্রকৃত শক্তি তার প্রাকৃতিক সম্পদে নয়, মানুষের জ্ঞান, বুদ্ধিবৃত্তি ও চিন্তাশক্তিতে নিহিত। যে সমাজে মানুষ জ্ঞানের আলোয় আলোকিত, সেই সমাজই প্রকৃত অর্থে উন্নত ও সভ্য। আর এই জ্ঞানচর্চার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হলো বই।
সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা বৃদ্ধি বই পড়া শিক্ষার্থীদের চিন্তার পরিসর বিস্তৃত করে এবং তাদের বিশ্লেষণী ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। বইয়ের মাধ্যমে তারা বিভিন্ন মত, দৃষ্টিভঙ্গি ও ধারণার সঙ্গে পরিচিত হয়। ফলে তারা অন্ধভাবে কোনো কিছু গ্রহণ না করে যুক্তি ও তথ্যের আলোকে বিচার করতে শেখে। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য এই সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের বই পড়ার আনন্দকে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছে। অনেক শিক্ষার্থী বইকে শুধুমাত্র পরীক্ষার ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত করে দেখে। ফলে পাঠ্যবইয়ের বাইরে অন্য বই পড়ার প্রতি তাদের আগ্রহ তৈরি হয় না। পারিবারিক পরিবেশের পরিবর্তনে অনেক পরিবারে এখন বই পড়ার সংস্কৃতি কমে গেছে। বাবা–মা নিজেরা যদি বই না পড়েন, সন্তানদের বই পড়তে উৎসাহ না দেন, তাহলে শিশুদের মধ্যেও সেই অভ্যাস তৈরি হয় না। পাঠাগার বা লাইব্রেরির অভাবও একটি বড় সমস্যা। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও এলাকায় পর্যাপ্ত লাইব্রেরি নেই। আবার কোথাও লাইব্রেরি থাকলেও তা সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয় না। ফলে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ধরনের বইয়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। শিক্ষার্থীদের বইমুখী করার জন্য পরিবার, সমাজ, বিদ্যালয় ও রাষ্ট্রকে সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে হবে। ছোটবেলা থেকেই শিশুদের হাতে গল্পের বই তুলে দেওয়া, তাদের সঙ্গে বই নিয়ে আলোচনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিদ্যালয় ও কলেজ শিক্ষার্থীদের পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সমৃদ্ধ লাইব্রেরি থাকা প্রয়োজন। শিক্ষকরা যদি পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি অন্যান্য বই পড়তে উৎসাহ দেন, বই নিয়ে আলোচনা করেন, তাহলে শিক্ষার্থীরা বই পড়ার আনন্দ উপলব্ধি করতে পারে।
বিদ্যালয়ে পাঠচক্র, বইপড়া প্রতিযোগিতা, সাহিত্য আলোচনা এবং বইমেলার আয়োজন শিক্ষার্থীদের বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট করতে পারে। সমাজে গণপাঠাগার প্রতিষ্ঠা ও সেগুলোকে সক্রিয় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাঠাগার শুধু বই পড়ার জায়গা নয়, এটি জ্ঞানচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। নিয়মিত সাহিত্য আলোচনা, পাঠচক্র ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করলে শিক্ষার্থীরা বইয়ের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে। শিক্ষার্থীদের বয়স, সামর্থ্য ও রুচি অনুযায়ী আকর্ষণীয় বই সহজলভ্য করতে হবে। বিজ্ঞানভিত্তিক বই, জীবনী, ভ্রমণকাহিনি, কল্পবিজ্ঞান ও রূপকথা শিশু–কিশোরদের মধ্যে কৌতূহল সৃষ্টি করে এবং তাদের বই পড়তে উৎসাহিত করে। প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তিকে বইয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে সহযোগী হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। ই–বুক, অডিওবুক ও অনলাইন লাইব্রেরির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সহজেই বিভিন্ন বই পড়ার সুযোগ পেতে পারে।
যে জাতির তরুণ প্রজন্ম বই পড়ে, সেই জাতি জ্ঞান ও সৃজনশীলতায় সমৃদ্ধ হয়। বইমুখী শিক্ষার্থীরা সাধারণত যুক্তিবাদী, মননশীল ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে। তারা সমাজের সমস্যা সম্পর্কে সচেতন হয় এবং উন্নয়নের জন্য নতুন চিন্তা ও ধারণা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়।
বইমুখী শিক্ষার্থীই জাতির উন্নয়নের ভিত্তি। একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার তরুণ প্রজন্মের জ্ঞান ও চিন্তার উপর। যে সমাজে শিক্ষার্থীরা বই পড়ে, সেই সমাজে জ্ঞানচর্চা, সৃজনশীলতা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের পরিবেশ তৈরি হয়।
একটি জাতির প্রকৃত উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো, প্রযুক্তি বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে সম্ভব নয়।তার জন্য প্রয়োজন চিন্তাশীল, মানবিক ও জ্ঞানসমৃদ্ধ নাগরিক। সেই নাগরিক তৈরির সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হলো বই।
আজকের বইমুখী শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের গবেষক, বিজ্ঞানী, শিক্ষক, নীতিনির্ধারক ও সৃজনশীল নেতৃত্বে পরিণত হবে। তাদের চিন্তা, জ্ঞান ও উদ্ভাবনী শক্তিই একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও উন্নত রাষ্ট্র নির্মাণের মূল চালিকাশক্তি। তাই পরিবার, বিদ্যালয়, সমাজ ও রাষ্ট্র সবাইকে সম্মিলিতভাবে এমন একটি পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে বই পড়া হবে আনন্দের, জ্ঞানচর্চা হবে সংস্কৃতির অংশ, আর পাঠাভ্যাস হবে জীবনের স্বাভাবিক অভ্যাস। বই শুধু জ্ঞান দেয় না, মানুষকে আলোকিত করে, চিন্তার স্বাধীনতা দেয়, মানবিক, সচেতন ও সৃজনশীল সমাজ গঠনের পথ দেখায়। সুতরাং বলা যায়,আজকের বইমুখী শিক্ষার্থীই আগামী দিনের আলোকিত নাগরিক, আর সেই নাগরিকদের হাত ধরেই নির্মিত হবে একটি জ্ঞানসমৃদ্ধ, মানবিক ও উন্নত ভবিষ্যৎ।
লেখক : প্রাবন্ধিক, কবি ও শিক্ষক।














