বাঙালির সর্বজনীন উৎসব

নাসিরুদ্দিন চৌধুরী | মঙ্গলবার , ১৪ এপ্রিল, ২০২৬ at ৫:৪৭ পূর্বাহ্ণ

পহেলা বৈশাখ বাঙালির নববর্ষের প্রথম দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা অনুষদের ছাত্ররা ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে একটি বর্ণাঢ্য র‌্যালি বের করতো। সেটি নিয়ে কখনো কথা উঠতে পারে কেউ তা ভাবেনি। একটি নির্দোষ অনুষ্ঠান যেটি দলমত নির্বিশেষে একটি সর্বজনীন রূপ পেয়েছিলো। এই ঐতিহ্যবাহী শোভাযাত্রাটি এমনকি ইউনেস্কো কর্তৃক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে শুরু এই শোভাযাত্রা ঢাকাবাসীর একটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছিলো; চারুকলার ছাত্ররা বাঘ, ভালুক, হাতি, ঘোড়া, ড্রাগন ইত্যাদি নানা রংয়ের জীবজন্তু এঁকে শোভাযাত্রাকে কালারফুল করে তুলতো, যা দেখে বাচ্চারা বেশ মজা পেত। সেজন্য অনেকে সপরিবারে অংশগ্রহণ করতো বা দেখতে আসতো। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে এত বছর পর সেই শোভাযাত্রার নাম কেন মঙ্গল শোভাযাত্রা হলো সেটা একটা আপত্তির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মঙ্গল শব্দের মধ্যে কারা কোথায় হিন্দুয়ানির গন্ধ খুঁজে পেল, সুতরাং মঙ্গল চলবে না। মঙ্গল তো বাংলা শব্দই, এর সঙ্গে মুসলমানিহিন্দুয়ানি লেবেল দেয়ার চেষ্টা কেন?

জুলাই আন্দোলনের পর থেকে এসব কাণ্ড হচ্ছে। জুলাই শব্দের মধ্যে এত ভয়, বিভীষিকা, আতঙ্ক যে, জুলাই থেকে বাঙালির জীবনে সব আনন্দ, আহলাদ উঠে গেছে, এ যেন সেই মারাঠী বর্গীর মত, যে বর্গীর কথা বলে মায়েরা ছেলেদের ঘুম পাড়তো। জুলাই ভীতির মধ্যে গত বছর বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা হয়েছে। এবছর বিএনপি সরকারের আমলেও পহেলা বৈশাখ উদযাপিত হচ্ছে। তবে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে নয়, বৈশাখী শোভাযাত্রা নামে নববর্ষ উৎসব হচ্ছে । ‘হায় আল্লাহ’ ! কোনদিন শুনতে হবে বৈশাখও হিন্দুয়ানি শব্দ, সুতরাং বৈশাখ নাম বাদ দিয়ে নতুন কোন নাম খুঁজতে হবে বাংলা বছরের প্রথম মাসের জন্য।

পঞ্চকবির অন্যতম রজনীকান্ত সেনেরও একটি গান আছে, যার সঙ্গে নববর্ষের যোগ রয়েছে এবং যেটি নববর্ষের গাওয়া হয়। গানটির প্রথম লাইন এরকম-“তুমি নির্মল কর, মঙ্গল করে মলিন মর্ম মুছায়ে’কবি মঙ্গল হস্তের কথা বলেছেন।

কবি নজরুল তাঁর একটি কবিতায় ‘সজীব করিব মহাশ্মশান’ কথা লিখেছিলেন। পাকিস্তান হওয়ার পর পাকি বুদ্ধিজীবীরা বললেন ‘মহাশ্মশান’ হিন্দুয়ানি শব্দ, এটাকে ইসলামীকরণ করতে হবে। তারা মহাশ্মশানের স্থলে গোরস্থান বসিয়ে দিলেন। নজরুল অসংখ্য শ্যামসঙ্গীতও লিখেছেন, শিব দুর্গার প্রশস্তি গেয়ে গান লিখেছেন। শিব দুর্গা হিন্দুদের দেবদেবী বলে ফিরোজা বেগম, সোহরাব হোসেন, ফেরদৌস আরা, শবনম মুস্তারীরা কী সেসব শ্যামাসঙ্গীত বাদ দিয়ে নজরুল সঙ্গীতের সাধনা করেন। নজরুল বিয়েও করেছিলেন হিন্দু তরুণী প্রমীলা দেবীকে। সে সম্পর্কে কাউকে উচ্চবাচ্য করতে শুনি না। করলে নজরুলকে হারাতে হবে। নজরুল হারিয়ে গেলে হিন্দুর সাথে ঝগড়া করার জন্য মুসলমানের আর কী থাকলো?

বাংলা নববর্ষ উদযাপন নিয়েও কম বিতর্ক হয়নি। বাংলা নববর্ষ হিন্দুর উৎসব, মুসলমানের উৎসব নয় এমন কথা বলা হতো। এ নিয়ে বিস্তর আলাপআলোচনা, উত্তপ্ত বিতর্ক কম হয়নি। অবশেষে সম্রাট আকবরের কথা যখন আসলো, তখন নববর্ষ যে হিন্দু, মুসলমান নির্বিশেষে বাঙালির উৎসব সেটা গ্রাহ্য হলো। কারণ আকবর তো মুসলমান। নববর্ষে মঙ্গল শোভাযাত্রা শুধু নয়, ঢাকায় পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান শুরু হয় রমনা বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। এখন মনে হচ্ছে উদীচীর অনুষ্ঠানে বোমা হামলাও বাঙালি সংস্কৃতি বিদ্বেষ থেকেই করা হয়েছিলো। আসলে মূল বিষয়টা হচ্ছে বাঙালিত্বকে মুসলমানিত্বের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানোর একটা ঘৃন্য প্রচেষ্টা থেকে এসব কাণ্ডকারখানা হচ্ছে।

লেখক : সাংবাদিক, মুক্তিযোদ্ধা, সংস্কৃতি সংগঠক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচিরায়ত বৈশাখ : বাঙালির ঐতিহ্য
পরবর্তী নিবন্ধজ্বালানি সংকটের মধ্যে অর্ধশত গাড়ি নিয়ে ভোটের প্রচার, ছাত্রদল নেতাকে অব্যাহতি