আবহমান বাংলার ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে একটাই সর্বজনপ্রিয় প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষ। বছর ঘুরে আবারও এলো নববর্ষ ১৪৩৩। নববর্ষ বাংলা ও বাঙালির সংস্কৃতির একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গিয়েছে। ইতিহাসবিদরা বলেন বাংলা নববর্ষের প্রচলন করেন মোগল সম্রাট আকবর। কিন্তু তারও আগের আলোচনায় পাওয়া যায় জ্যেতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেউল্লাহ সিরাজি সৌরপঞ্জিকা বা শক বর্ষ পঞ্জিকা অনুযায়ী বাংলা সনের নিয়ম তৈরি করেন।
শক থেকে এখানে শাক্যকুলবংশের একটা আভাস পাওয়া যায়। কারণ শাক্য কুলবংশ অনুযায়ী শকাব্দ রচিত হয়েছে বলে কথিত আছে, সবই মিথ বা পুরাণে পাওয়া কথা। আবার শাক্যবংশের রাজপুত্র সিদ্ধার্থ গৌতমের জন্মও বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে। তখন থেকেই বর্ষের প্রথম মাস হিসেবে বৈশাখ কে ধরে নেওয়া হয় বলে অনেক জায়গায় বলা আছে। (তথ্যসূত্র— বুদ্ধ পূর্ণিমা সংখ্যা দীপংকর গ্রন্থ)। এর আগে অগ্রহায়ন মাস থেকে বছর গণনা শুরু হতো বলে কথিত আছে। বছরের প্রথম মাস অগ্রহায়ণ। তখন ফসল কাটার উৎসব হিসেবেও বর্ষবরণ উৎসব পালন করা হতো।
তবে মোগল সম্রাটের নবরত্ন সভার নিয়ম অনুযায়ী বর্ষ গণনা ১ বা প্রথম থেকে শুরু হয়নি। প্রজাদের খাজনা মওকুফ, মাশুল ও শুল্ক আদায় এর সুবিধার্থে ৯৬৩ হিজরিকে ৯৬৩ বঙ্গাব্দ ধরে কথিত আছে ৯৫৩ হিজরি তখন ১৫৫৬ খ্রীস্টাব্দ থেকে হলে বাংলা বছরের ৪৬২ বছর হয়। কারণ ১ থেকে নয় ৯৬৩ বঙ্গাব্দ থেকে হলে ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত বাংলা নববর্ষের ধারা ৪৬২ বছর। যাই হোক না কেন সকল খাজনা, মাশুল, শুল্ক রাজদরবারে নিজে এসে প্রজারা যেন নির্বিঘ্নে দিতে পারে, মধ্যসত্বাভোগীদের নির্যাতন থেকে বাঁচানোর জন্যই এই প্রথা সম্রাট আকবরের সময় প্রচলিত বলে সর্বশেষ ব্যাখ্যা আমরা পাই। পরেরদিন পহেলা বৈশাখ থেকে হালখাতা বা নতুন হিসাব চালু করার জন্য রাজদরবার থেকেই লাল মলাটে বাঁধা মোটা খাতা দেয়া হতো। সেটা আকবরের দীন ই ইলাহী বা তারিখ ই ইলাহী থেকে প্রচলন করা হয় বলে কথিত আছে।
বর্তমানেও নববর্ষে ব্যবসায়ীরা পুরোনো হিসাব চুকিয়ে নতুন হালখাতা খোলেন। নববর্ষের দিন প্রত্যেক দোকানী, ব্যবসায়ীরা নববর্ষে প্রত্যেক ক্রেতাকে মিষ্টিমুখ করান। তবে বাংলাদেশে এই নববর্ষের প্রচলন বিভিন্ন ভাবে বিভিন্ন সময়ে, গ্রামে, গঞ্জে, বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পালিত হয়ে আসছে। একটাই উৎসব সবাই একসাথে প্রাণের উৎসব হিসেবে পালন করে। ছায়ানট ১৯৬৫ সালে বাংলা ১৩৭২ সালে বর্তমান ঢাকার রমনা বটমূলে বর্ষবরণ এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে। ১৯৮৯ সাল থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। ২০১৬ সালে জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন ইউনেস্কো এই উৎসবকে মনোগত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
নববর্ষ পহেলা বৈশাখ বাংলার প্রতিটি ঘরে পালিত ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে। একজন দরিদ্র মানুষ ও চায় সেদিন নতুন কিছু দিয়ে বর্ষ শুরু করুক নতুন আশায় বছরটা শুভ হোক সবাই কামনা করে,সেটা একমুঠো নতুন নবান্নে হোক, একটি নতুন জামায় হোক, একটি নতুন কথায় হোক, নতুন সূর্যোদয় দেখেই হোক সকলের প্রার্থনা থাকে নতুন বছর শুভ হোক, নতুন কিছুর সংযোজন ঘটুক যাপিত জীবনে।
তেমনি চৈত্র শেষে বর্ষ বিদায়ও দেয়ার নিয়ম প্রচলিত রয়েছ, বর্ষবিদায় সুনিশ্চিত হলেই বর্ষবরণও সুন্দর হয় এরকম মানসিক একটা স্বস্তি কাজ করে অনেকের মনে। বিশেষ করে বিভিন্ন জায়গায়, কুশপুত্তলিকাকে অপশক্তির প্রতীকী সাজিয়ে আগুনে পুরিয়ে বর্ষ বিদায় করা হয়, ঘরের সবকিছু ধুয়ে মুছে শুদ্ধ করে ফুল দিয়ে সাজানো হয় প্রতিটি গ্রামে গঞ্জের ঘরের আঙিনা, চারিপাশ। রবিঠাকুর তাই বোধ হয় লিখেছিলেন – ‘আগুন জ্বালো আগুন জ্বালো / ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলে / আগুন জ্বালো ’
বর্ষ বিদায়ে বাংলাদেশে আদিবাসীদের বিশেষ রীতি ও প্রথা রয়েছে যা অনিন্দ্য সুন্দর উৎসবে রূপ নেয়। নেচে গেয়ে বাদ্য বাঁজিয়ে পানিখেলা উৎসব হয়। নদীতে বিচিত্র সাজে ফুল ভাসিয়ে বর্ষ বিদায় করে নতুন বছরকে আহ্বান জানানো হয়। এছাড়া এখানে উল্লেখ করতে চাই বিভিন্ন ভেষজ, ঔষধি সবজি দিয়ে একটি বিশেষ ধরনের ‘পাঁচন’ রান্না করা হয় যা খাবার হিসেবে খেলে চৈত্র–বৈশাখের গরমের সবরোগ চলে যায় বলে মনে করা হয়, এসবের কিন্তু পরীক্ষিত কিছু বিজ্ঞান সম্মত সত্যতা রয়েছে বৈকি। এটি রান্না করার একটা আনন্দঘন প্রতিযোগিতাও চলে কার চেয়ে কে বেশি সবজি দিতে পারে, কার চেয়ে কে বেশি সুস্বাদু করে রান্না করতে পারে। এটা অতিথিদের এমনিতেই পরিবেশন করা হয়। এখন ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে এ পাঁচন খেয়ে আনন্দ পায়।
এছাড়াও বাংলার প্রতিটি গ্রামে গ্রামে বৈশাখী মেলা হয়, নৌকা বাইচ, লাঠিখেলা, বলী খেলা, মোরগ লড়াই, গরু লড়াই, যেখানে যেটা রেওয়াজ তা আবহমান কাল ধরে চলে আসছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামে জব্বারের বলী খেলা বহুবছর থেকে এখনো প্রচলিত আছে। এ উপলক্ষে মেলা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য গত সব লোকজ গান ও শিল্পের আয়োজনও করা হয় সবমেলা উপলক্ষে। এজন্য অনেক মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকে সারাবছর এসব ঐতিহ্যবাহী বর্ণাঢ্য মেলায় অংশ গ্রহণের আশায়।
বৈশাখী মেলায় আরও চলে খাওয়া দাওয়ার আয়োজন, মুড়ি, মুড়কি, খই নাড়ু, বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী পিঠা পুলি, পায়েস, দই চিড়া সন্দেশ, মিষ্টি আরও কত কি! তবে পান্তা ইলিশ, ভাজি, ভর্তা দিয়ে আয়োজন খুব আবেগের একটা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল বহুদিন ধরে। এখন ইলিশ অনেকের সাধ্যের বাইরে যাওয়ায় ঘাটতি এসেছে পান্তা ইলিশ খাওয়ার। ভর্তা, ভাজি দিয়েই সই এখন। তবে যাদের প্রতিদিনই পান্তা দিয়ে যাপিত জীবন তারাও খোঁজে অন্য কিছু দিয়ে আনন্দ করার। আর হোটেল রেস্তোরাঁও আয়োজন করে এসব ঐতিহ্যবাহী খাবার দাবার এর, এমন কি ঐতিহ্যবাহী পাঁচনও এখন স্থান পায় সেখানে, যা অবশ্য অধিকাংশই উঠতি তারুণ্য ও ধনীদের দখলে।
এরপর যদি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এর কথা বলা হয় তা প্রতিটি গ্রামে, গঞ্জে, বাংলার সব জায়গায় অতি সমারোহে আয়োজন করা হয়, সেটা ছোট বড় যেমনই হোক। সেটা বাউল, মুর্শিদি, মারফতী জলসায় হোক, পাড়া মহল্লায় ছোট খাটো আয়োজনে হোক, হবেই। কারণ এটা বাঙালির মনোগত সাংস্কৃতিক বিষয়। এটাকে কেউ রুখতে পারবে না।
এছাড়াও মঙ্গল শোভাযাত্রাও বিভিন্ন জায়গায় হবেই সেটা ঢাকা চারুকলা ইন্সটিটিউটের হোক, অন্য কোন প্রতিষ্ঠানের হোক, বৈশাখী শোভাযাত্রা নামেই হোক, নামে, বেনামে হোক হবেই। কারণ নববর্ষে বংলা ও বাঙালির প্রাণের স্পন্দন ফুটেই এটা বের হয়। কেউ হয়তো কোন আয়োজন ছাড়াই দলবেঁধে গেয়ে গেয়ে হাঁটতে থাকে এসো হে বৈশাখ এসো এসো। এটাতেও আনন্দের যাত্রা আছে। বাংলা নববর্ষকে বরণ করা আমাদের ঐতিহ্য, সকলের হৃদয়ের একসাথে উদযাপন করার একমাত্র উৎসব হিসেবে বরণ ও বরণের নানা আয়োজন কেউ বন্ধ করতে পারবে না। এটা সবাই মন থেকে করবে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে একযোগে, একাত্মতার মেলবন্ধনে। পান্তা ইলিশে না হোক সৌহার্দ্য ও সমপ্রীতিতে বরণ হোক বাংলা নববর্ষ।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক, শিক্ষাবিদ।









