সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল জোটের ইরান আক্রমণের কারণে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য যতবেশি উত্তপ্ত হচ্ছে বাংলাদেশ ততবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই যুদ্ধে বহুমুখী সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে বাংলাদেশ। এতে একদিকে রেমিট্যান্স প্রবাহ ও প্রবাসীদের যাওয়া আসা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা তেল ও গ্যাস সময়মত আনা যাচ্ছে না, দ্বিগুণ দামে অপরিশোধিত তেল ও এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। ফলে সরকারকে হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চাপের মুখে পড়ছে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের পণ্যের রপ্তানি বাজার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেকে নিরাপত্তাহীনতার কারণে পণ্য রপ্তানি করতে পারছে না। আবার বেশকিছু রপ্তানি পণ্য শিপমেন্ট হওয়ার পরেও বিভিন্ন বন্দর থেকে ফেরত এসেছে। এই যুদ্ধটি মধ্যপ্রাচ্য কেন্দ্রিক হওয়ায় বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজার চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ফ্লাইট সংকট, ভিসা জটিলতা এবং নিরাপত্তার অভাবে নতুন করে কর্মী যাওয়া প্রায় এক–চতুর্থাংশে নেমে এসেছে। এতে প্রায় ৬০ লাখ প্রবাসীর কর্মসংস্থান, নির্মাণ ও সেবা খাতের প্রকল্প এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দুবাই, ওমান, সৌদি আরব, বাহরাইন, জর্দান ও ইরাকসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মী যাওয়ার হার কমে গেছে এবং নতুন কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া ধীর হয়ে পড়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়ায় দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়ছে। এদিকে যুদ্ধকবলিত অঞ্চলে বাংলাদেশি কর্মীরা কাজ হারানো, বেতন না পাওয়া এবং নিরাপত্তার অভাবে চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। তবে আশার কথা হচ্ছে, এই সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকার নতুন শ্রমবাজার সমপ্রসারণের জন্য ১৮০ দিনের বিশেষ কর্ম পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থান মূলত মধ্যপ্রাচ্য নির্ভর। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি কর্মী যায় সৌদি আরবে। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ফ্লাইট অনিয়মিত হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বলছে, মার্চ মাসের প্রথম ১০ দিনে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বিদেশে যেতে ছাড়পত্র নেওয়া কমেছে প্রায় ৫০%। বিদেশে কর্মী পাঠানোর সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের অভিমত, বিকল্প বাজার তৈরি করা গেলে এ ঝুঁকি তৈরি হতো না। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, দীর্ঘ সময়েও মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বড় রকমের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেনি বাংলাদেশ। দক্ষ কর্মী তৈরি করতে না পারায় ইউরোপ ও জাপানের মতো সম্ভাবনাময় বাজারেও কর্মী পাঠানো যাচ্ছে না। প্রায় দুই বছর ধরে বন্ধ হয়ে আছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের অভিমত সরকার মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীরা ফিরে এলে তাঁদের পুনর্বাসনে সহায়তা করবে। যাঁরা যেতে পারছেন না, তাঁদের ভিসার মেয়াদ বাড়াতে দূতাবাসকে অনুরোধ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে আবেদনের ভিত্তিতে কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও আরব আমিরাত ৩১ মার্চ পর্যন্ত ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে সরকারের লক্ষ্য হলো নতুন শ্রমবাজার তৈরি করা। এজন্য দক্ষ কর্মী গড়ে তোলায় অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। সম্ভাবনাময় বাজার জাপান ও ইউরোপ নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। এর বাইরে এশিয়ার আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
এদিকে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) বলছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১১ মার্চ পর্যন্ত ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মোট ৩৯১টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। ইরান, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডান তাদের আকাশসীমা বন্ধ রেখেছে। সৌদিতে সীমিত ফ্লাইট চালু থাকায় কর্মীদের কিছু কিছু যেতে পারছেন। আবার কেউ কেউ ভয়ে এখন যেতে চাইছেন না। বিএমইটি বলছে, ফেব্রুয়ারি মাসে বিভিন্ন দেশে গেছেন ৬৫,৬১৩ জন কর্মী। এর মধ্যে প্রথম ১০ দিনে গেছেন প্রায় ৩৮ হাজার। অন্যদিকে ১ থেকে ১০ মার্চ পর্যন্ত বিদেশ যেতে ছাড়পত্র নিয়েছেন ২১,১২২ জন। গত বছর একই সময়ে ছাড়পত্র নিয়েছেন ৪৬,৭৪৪ জন। তার মানে যুদ্ধ শুরুর পর এটি কমে অর্ধেকে নেমেছে। তৃণমূল অভিবাসীদের সংগঠন অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) কর্মকর্তারা বলেন, ৪৫ থেকে ৫০ লাখ কর্মী মধ্যপ্রাচ্যে আছেন। তাঁদের কী হবে, সবার চাকরি থাকবে কি না। এসব চিন্তা করতে হবে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বড় ধরনের দুর্যোগ নেমে আসবে। যাঁরা টাকা দিয়েও যেতে পারছেন না, তাঁদের ডেটাবেজ (তথ্যভাণ্ডার) করতে পারে সরকার, যাতে পরে যাওয়ার সুযোগ পান। অভিবাসন খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অনেকেই বিদেশে যেতে ঋণ করেন। এখন যেতে না পারায় ঋণের টাকাও শোধ করতে পারবেন না। পরিবার উল্টো চাপে পড়বে। ঋণগ্রস্ত পরিবারকে জরুরি সহায়তা করতে পারে সরকার।
বাংলাদেশ সরকার টিকে আছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের উপর ভিত্তি করে। কারণ আমাদের রপ্তানি আয়ের বিপরীতে আমদানি ব্যয় বেশি। যেমন ২০২৪–২৫ অর্থবছরের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয় ছিল ৪৮.২৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। একই অর্থবছরে পণ্য আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৬৬.৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি (২০২৩–২৪ অর্থবছরের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে একটি আনুমানিক চিত্র)। অর্থাৎ ঘাটতি হলো প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার।আবার ২০২৫ সালে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ৩২.৮২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তাই প্রবাসীরা সময়মত রেমিট্যান্স না পাঠালে দেশের অবস্থা ভয়াবহ হবে ও রিজার্ভে ধস নামবে।
আসলে এই যুদ্ধে বাংলাদেশ মুখোমুখি হয়েছে এক কঠিন অবস্থায়। না পারছে ইরানের পক্ষ নিতে, না পারছে আমেরিকার পক্ষ নিতে। কারণ বর্তমান বৈশ্বিক অবস্থায় আমেরিকান প্রশাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে টিকে থাকা যে কোন সরকারের পক্ষে অসম্ভব। যার প্রমাণ হলো নিকারাগুয়া পানামাসহ মুক্তবাজার অর্থনীতির দেশগুলো ও মধ্যপ্রাচ্য। আবার বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও তেল আমদানি করতে হয় মধ্যপ্রাচ্য থেকে। যেখানে যুদ্ধের ডামাডোলে মানবসম্পদ রপ্তানি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ও তেল আমদানিতে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করা ছাড়া আর কোন গত্যান্তর নেই। আমাদেরকে বিধাতার কাছে যুদ্ধ বন্ধের ফরিয়াদ করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই। তাই আমরা কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করি যেন এই যুদ্ধের দ্রুত পরিসমাপ্তি ঘটে।
লেখক: প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট।












