আবহমান বৈশাখ ও তার সেকাল-একাল

বিজয়া মুন্না | মঙ্গলবার , ১৪ এপ্রিল, ২০২৬ at ৫:৪৫ পূর্বাহ্ণ

পহেলা বৈশাখ, বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন। প্রাচীনকাল থেকেই এর ঐতিহ্য চিরন্তন। বাংলাদেশ বাঙালির যেমন, তেমনই ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিকদেরও। বাংলায় বৈশাখ উদযাপন মানেই শোভাযাত্রা, রমনার বটমূল, শাড়িপাঞ্জাবী, হাতপাখা, বাঁশি আর গোলাপগাজরার সমাহার।

বৈশাখের প্রথম দিনটির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে বাঙালিয়ানা। আবার ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক পরিবারে বৈশাখ মানে বিজু, বৈসাবী, সাংগ্রাই উৎসব। আদিবাসী সংস্কৃতিতে পহেলা বৈশাখ এক অনন্য রঙিন এবং ঐতিহ্য পরম্পরার উৎসব।

অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, গৌড়ের রাজা শশাঙ্ক এই বাংলা সনের প্রবর্তন করেছিলেন, যা প্রতিপত্তি লাভ করে আলাউদ্দিন হুসেন শাহ্‌ এর আমলে। কিন্তু মোঘল সম্রাট আকবরের সময়কালে পহেলা বৈশাখ তার জৌলুসের রঙে রঙিন হতে শুরু করে। বাদশাহ্‌ আকবর খাজনা নেয়ার সুবিধার্থে বাংলা সনের চৈত্র মাসের শেষ দিন খাজনা জমা দেয়ার দিন নির্ধারণ করেন। চৈত্রের শেষ দিনে কৃষক, জমিদার, ভূস্বামীরা তাদের খাজনা দিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতেন। তাই বৈশাখের প্রথম দিনে দোকানগুলিতে ব্যবসায়ীরা সারা বছরের হিসাব সংরক্ষণ করার জন্য নতুন হালখাতা খুলেন। লাল কাপড়, সোনালী জরি পাড় দিয়ে বাঁধাই করা এত্ত মোটা হালখাতা। দোকানে দোকানে, পাড়ায় পাড়ায় মিষ্টিমুখ করান। বাচ্চা বুড়ো সবাই নিজ নিজ সাধ্যমতো নতুন কাপড় পরে।

সনাতনী গৃহস্থ বাড়িগুলোয় রাত জেগে চলে ছাতুর মোয়া, মুড়ি মুড়কির মোয়া, খইয়ের মোয়া, যব ধানের খই ভাজার ধুম। যেন দম ফেলার ফুরসত নেই কারো। দুইদিন ধরে চলে এই উৎসব।

পহেলা বৈশাখের আগের দিন চৈত্র সংক্রান্তি। সেদিন সকালে উঠে বাসি ঘরদোর লেপে মুছে, বাসি রান্না রয়ে গেলে সব ফেলে দিয়ে নতুন করে লেপা হয়। চুলা, পরিষ্কার করে নিকোনো হয় উঠোন। তারপর সারা গায়ে হলুদসরিষা, নিম বাটা, আর সরিষার তেলের মিশ্রণ মিশিয়ে স্নান। বলা হয়এতে করে গায়ে সারাবছর আর চর্মরোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যাবে না। স্নান সারা হলে নিমপাতা দিয়ে খাওয়া হয় আটরকমের ভাজা শস্যবীজ (তিল, সীমের বিচী, বাদাম, মিষ্টিকুড়ার বিচীসহ আরো অনেক রকমের বীজ ও শস্যদানা) দিয়ে মুড়িমুড়কি আর নাড়ু মোয়া। প্রাতঃরাশ পর্ব শেষ করে এসে বাড়ির বউঝিয়েরা গোল হয়ে বসে পাঁচনের তরকারি কাটতে। অম্ল, মধুর, তিক্ত, কষা, ঝালসহ পাঁচ রকমের স্বাদ দিতে হয় তাতে। আঠারো রকমের ব্যঞ্জন সহকারে রান্না হয় সেই চৈতালী ঘন্ট। এ বাড়ি ও বাড়ি বণ্টন করে মনে তৃপ্তি পেতো সবাই।

পরের দিন চলতো পোলাও, কষা মাংস, দই, মিষ্টি, রাবড়ি, পায়েস আরো কত কি! উৎসবের ধুম পড়ে যেতো পাড়ায় পাড়ায়। তবে আজকাল এসেছে কিছুটা ভিন্নতা। আমরা এখন এতই আধুনিক, রাস্তায় কোন ব্যক্তি বাঁচার প্রাণপণ আকুতি দেখেও ভিউ বাড়ানো, ভাইরাল হওয়া আর টাকা কামানোর নেশায় আমরা ভিডিও করতে ব্যস্ত থাকি। মানুষটাকে বাঁচানোর জন্য হাসপাতালে নেওয়ার তাগিদ আমাদের বিবেকে অনুভূত হয় না! আমরা এখন সন্তর্পণে এড়িয়ে চলি আবেগ, অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ। আমরা এখন নিজেকে আধুনিক দেখাতে ভালোবাসি কাউকে অসম্মান করে, কারো রুটি রুজির পথ বন্ধ করে দিয়ে। আমাদের বৈশাখ এখন শুধুই শোভাযাত্রার তর্কবিতর্ক। আমাদের বৈশাখ এখন মায়ের হাতের মুড়িমুড়কি ছেড়ে ভদ্র হয়ে থিতু হয়েছে বিলাসবহুল রেস্তোরাঁয়।

আমাদের বৈশাখ এখন দীনহীন কায়ক্লেশে সজ্জিত হয়ে হারিয়েছে তার প্রাক্তন ঐতিহ্য, প্রাক্তন জৌলুস। তবু আমরা স্বপ্ন দেখি এক সুন্দর বাংলার, যেখানে থাকবে রবিঠাকুর, নজরুল, লালন, হাসনরাজা, জারি সারি, ভাটিয়ালী। থাকবে আগের মতোই যাত্রাপালা, বাউল গান, নৌকাবাইচ। আমরা স্বপ্ন দেখি সেই নুরলদীনের, যে নুরলদীন একদিন এসে গলা হাঁকিয়ে ডাক দেবে, ‘জাগো বাহে, কোনঠে সবাই?’ সেই ডাকে সবাই আবার মিলেমিশে একাকার হয়ে গড়ে তুলবে সুন্দর এক দেশ, আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ।

লেখক : শিক্ষক

পূর্ববর্তী নিবন্ধবাঙালির ঐতিহ্য কৃষ্টি সংস্কৃতির লোকজ উৎসব
পরবর্তী নিবন্ধলোকজ জীবনের সঙ্গে নাগরিক জীবনের সেতুবন্ধন