বন নেই করিডোর নেই, বিপন্ন বন্য হাতির পাল

টেকনাফে রোহিঙ্গা ক্যাম্প, রেললাইন ও দখলে বনের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত

কক্সবাজার প্রতিনিধি | সোমবার , ২৭ জুলাই, ২০২৬ at ৫:০৩ পূর্বাহ্ণ

অবাধে বন উজাড়, পাহাড় কাটা, করিডোর দখল এবং বনের ভেতর রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের ফলে কক্সবাজারের টেকনাফে বন্যহাতির বিচরণ কমে গেছে। আবাস্থল সংকট, চলাচলে বিঘ্নতা ও খাদ্য সংকটের কারণে হাতির জীবন এখন সংকুচিত হয়ে পড়েছে। দিন দিন এই সব সমস্যা আরো বৃদ্ধি পাওয়ায় এই অঞ্চলে বন্য হাতির অস্তিত্ব আরও হুমকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবেশবিদরা।

টেকনাফের স্থানীয় পরিবেশকর্মী মোহাম্মদ ইদ্রিস আলী জানান, একসময় টেকনাফের বনাঞ্চলে ১৫ থেকে ২০টি হাতির একাধিক পাল নিয়মিত বিচরণ করত। এক দশক আগেও এসব হাতির অবাধ চলাচল ছিল নিত্যনৈমিত্তিক দৃশ্য! কিন্তু বনভূমি ধ্বংস, অবৈধ দখল, পাহাড় কাটা এবং খাদ্য সংকটের কারণে এখন সেই দৃশ্য প্রায় বিরল হয়ে গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, বনাঞ্চলে হাতির চলাচল সংকুচিত হলেও খাদ্যের সন্ধানে আকস্মিক হাতির দল লোকালয়ে চলে আসে। এতে ফসল ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি মানুষহাতির সংঘাতও বাড়ছে। লোকালয়ে আসা হাতিগুলোকে অপুষ্ট ও দুর্বল অবস্থায় দেখা যায়। সমপ্রতি টেকনাফের নাইট্যাংপাড়ায় পাহাড় থেকে পড়ে মারা যাওয়া মা হাতিটি লোকালয়ে খাদ্যের সন্ধানে এসেছিলো। সেখানেই দুর্ঘটনার শিকার হয় হাতিটি। বনাঞ্চলে হাতির স্বাভাবিক চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় তারা পর্যাপ্ত খাদ্য সংগ্রহ করতে পারছে না। ফলে মানুষহাতির সংঘাতও বাড়ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় লোকজন।

টেকনাফ রেঞ্জের বন কর্মকর্তা আব্দুর রশিদ জানান, আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) পরিচালিত ২০১৬ সালের জরিপ অনুযায়ী, কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের আওতাধীন এলাকায় বর্ষাকালে ৪৮টি এবং গ্রীষ্মকালে গড়ে ৭৮টি বন্য হাতির চলাচল রেকর্ড করা হয়েছিল। তবে বর্তমানে কয়টি হাতি রয়েছে বা বিচরণ করছে, সে বিষয়ে হালনাগাদ কোনো তথ্য নেই।

স্থানীয় শিক্ষক ইলিয়াস বলেন, হাতির আবাসস্থল ও চলাচলের করিডোর সংরক্ষণ, বন উজাড় বন্ধ, পাহাড় ধ্বংস রোধ, হাতির খাবারের উপযোগী গাছ রোপণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বন্য হাতি সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, হাতির খাদ্য নিশ্চিত করতে বন বিভাগ বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় খাদ্য উপযোগী বাগান তৈরি করছে। তবে হাতির চলাচলের ঐতিহ্যবাহী করিডোরগুলো এখন আগের মতো নেই। যেসব এলাকায় হাতি চলাচল করত, সেখানে এখন রোহিঙ্গা ক্যাম্প, রেললাইন ও বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে উঠেছে।

তিনি বলেন, একটি বন্য হাতি প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে এবং প্রায় ২০০ কেজি খাদ্য গ্রহণ করে। কিন্তু উখিয়াটেকনাফে এখন টানা ২০ কিলোমিটার বিস্তৃত এমন বনাঞ্চল নেই। ফলে হাতির দল বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং খাদ্য সংকট আরও তীব্র হয়েছে।

ডিএফও আরও জানান, অতীতে হাতিগুলো নাফ নদী পেরিয়ে মিয়ানমারে যাতায়াত করত। কিন্তু বর্তমানে সীমান্তে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়ায় সেই প্রাকৃতিক চলাচলের পথ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। মানুষহাতি সংঘাত কমাতে বন বিভাগ ২৭টি ‘এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম’ (ইআরটি) গঠন করেছে। পাশাপাশি নতুন করে বন্য হাতির সংখ্যা ও অবস্থান নির্ধারণে জরিপ কার্যক্রমও শুরু হয়েছে।

কক্সবাজারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হাতির জন্য আলাদা কোনো করিডোর নেই। একসময় হাতিগুলো বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করলেও বর্তমানে সীমান্তের কাঁটাতার ও ল্যান্ডমাইনের কারণে সেই পথ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসুখছড়ি খালের ভাঙনে বিলীন গ্রামীণ সড়ক
পরবর্তী নিবন্ধভালোবাসায় সিক্ত ছোট্ট বীরের গল্প