মাতৃত্ব মানেই নতুন প্রাণের আগমন, আনন্দ আর এক অনাবিল স্বস্তি। কিন্তু এই আনন্দের আড়ালেই অনেক সময় লুকিয়ে থাকে এক নিঃশব্দ অন্ধকার, যার নাম পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন বা প্রসবোত্তর অবসাদ। সামপ্রতিক সময়ে খবরের কাগজ বা সামাজিক মাধ্যমে আমরা প্রায়শই অত্যন্ত মর্মান্তিক কিছু সংবাদ দেখি মায়েদের নিজেদের সন্তানকে হত্যা করা এবং পরবর্তীতে আত্মহত্যা করার মতো ঘটনা। এই ভয়ংকর ও হৃদয়বিদারক প্রবণতা আজ শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, বরং সমাজ ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য এক বড় সতর্কবার্তা।
পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন আসলে কী?
সন্তান প্রসবের পর শারীরিক, মানসিক এবং হরমোনগত পরিবর্তনের কারণে নারীরা যে তীব্র ও দীর্ঘমেয়াদী মানসিক অবসাদের শিকার হন, তাকেই চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন বলা হয়।
এটি প্রসবের পরের সাধারণ কিছু মন খারাপ বা খিটখিটে মেজাজ ‘Baby Blues’ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ‘বেবি ব্লুজ’ সাধারণত সন্তান জন্মের কয়েক দিনের মধ্যে নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যায়। কিন্তু পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন অত্যন্ত তীব্র রূপ ধারণ করে এবং সঠিক চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং ছাড়া এটি মাসের পর মাস এমনকি বছরজুড়েও স্থায়ী হতে পারে।
খবরের কাগজ বা সোস্যাল মিডিয়ায় যখন আমরা পড়ি বা দেখি কোনো মা নিজের সন্তানকে শেষ করে চুপচাপ বসে থাকেন নিজে গৃহে, কেন নিজের বাচ্চাকে মেরেছে সে তখন মিথ্যা বলে, সে মিথ্যাগুলোও স্পষ্ট বোঝা যায়, তখন আমাদের মনে প্রচণ্ড ক্ষোভ ও ঘৃণা জন্ম নেয় সে মায়ের প্রতি। আমরা সকলেই বিচার বসাই তার অন্য কারো সাথে পরকীয়া আছে, সে কারণে বাচ্চাটাকে মেরে ফেলেছে। তাকে পাড়াপ্রতিবেশীরা মারছে, চুলকেটে দিচ্ছে, আবার পুলিশের কাছেও তুলে দিচ্ছে।
কিন্তু ভেবে দেখলে একজন সুস্থ ও স্বাভাবিক মা কখনোই এমনটি করতে পারেন না। এর পেছনে কাজ করে গভীর মানসিক অসুস্থতা এবং চরম অসহায়ত্ব। তীব্র হরমোনগত ও রাসায়নিক ভারসাম্যহীনতায় সন্তান প্রসবের ঠিক পরপরই শরীরে ইস্ট্রোজেন এবং প্রজেস্টেরনের মাত্রা নাটকীয়ভাবে কমে যায়। মস্তিষ্কের নিউরো ট্রান্সমিটারগুলোতে এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, যা চরম হতাশায় নিমজ্জিত করে।
প্রসবোত্তর সাইকোসিস এটি পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনের একটি অত্যন্ত মারাত্মক পর্যায়। এই অবস্থায় আক্রান্ত মা সম্পূর্ণ বাস্তবতাবোধ হারিয়ে ফেলেন। তার মনে হ্যালুসিনেশন হতে পারে। তিনি অবাস্তব কোনো আদেশ শুনতে পান বা বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে, এই পৃথিবী শিশুর জন্য নিরাপদ নয়, আমাকে আর আমার সন্তানকে এখনই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে। এই মানসিক বিকারের সময়ই মায়েরা নিজের অজান্তে চরম সর্বনাশা পদক্ষেপ নেন।
নিঃসঙ্গতা ও সামাজিক সমর্থনের অভাবে বর্তমান যৌথ পরিবার প্রথা ভেঙে যাওয়া এবং একক পরিবারের যুগে অনেক প্রসূতি মায়েদের পাশে দাঁড়ানোর মতো পর্যাপ্ত মানুষ থাকে না। রাত জেগে সন্তান সামলানো, পরিবারের কাজ, শারীরিক ধকল এবং একাকীত্ব একজন মানুষকে ভেতর থেকে পুরোপুরি ভেঙে দেয়। পারিবারিক ও মানসিক নিপীড়নে অনেক সময় প্রসবোত্তর মায়েদের শারীরিক অবস্থা ও মানসিক চাপকে পরিবার বা সঙ্গীরা গুরুত্ব দিতে চান না। উল্টো সন্তান ঠিকমতো সামলাতে না পারলে কটূকথা শোনানো হয়। এই মানসিক নির্যাতন অবসাদকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
সহায়তার চরম অভাবে যখন একজন মা অনুভব করেন যে তার কষ্টের কথা কেউ শুনছে না, তিনি চারপাশ থেকে সম্পূর্ণ একা এবং এই মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তির আর কোনো পথ খোলা নেই, তখন তীব্র অন্ধকারের কবলে পড়ে তিনি নিজেকে এবং অবুঝ সন্তানকে এই পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার মতো চরম সিদ্ধান্ত নেন।
পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনে আক্রান্ত মায়েদের মধ্যে সাধারণত নিচের লক্ষণগুলো দেখা যায়–
১। সার্বক্ষণিক অতিরিক্ত কান্নাকাটি বা বিষণ্ন মন।
২। নিজের সন্তানের প্রতি উদাসীনতা বা সন্তানকে নিজের বলে মনে না হওয়া।
৩। অতিরিক্ত ভীতি বা আতঙ্ক যে সন্তানকে সে ঠিকমতো সামলাতে পারবে না বা কোনো ক্ষতি হয়ে যাবে।
৪। চরম মাত্রার অনিদ্রা।
৫। নিজের বা সন্তানের ক্ষতি করার অবুঝ ও ভীতিকর চিন্তা বারবার মনে আসা।
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সবার আগে পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনকে একটি বাস্তব ও চিকিৎসাধীন রোগ হিসেবে মেনে নিতে হবে, কোনো মানসিক দুর্বলতা বা খামখেয়ালিপনা নয়। পারিবারিক সহানুভূতি ও সহযোগিতায় প্রসবের পরের সময়টাতে নতুন মায়ের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি পরিবারের সবার সবচেয়ে বেশি নজর দেওয়া উচিত। স্বামী এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের উচিত মায়ের কাজের চাপ ভাগ করে নেওয়া এবং তাকে মানসিক ভরসা দেওয়া। সামান্যতম সন্দেহ হলেই দেরি না করে অবিলম্বে সাইকিয়াট্রিস্ট বা সাইকোলজিস্টের শরণাপন্ন হতে হবে। সঠিক থেরাপি এবং চিকিৎসায় এটি সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। সামাজিক সচেতনতায় গণমাধ্যম, সাহিত্য ও সামাজিক আলোচনার মাধ্যমে এই বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা কথা বলতে হবে, যাতে মায়েরা নিজেদের এই যন্ত্রণার কথা অপরাধবোধ ছাড়াই বলতে পারেন।
একটি নতুন প্রাণের কোলাহলে ঘর ভরিয়ে তোলার কথা ছিল যে মায়ের মুখটির, সেই মুখটি বিষাদের চাদরে ঢাকা। প্রসবোত্তর এই নীরব লড়াইয়ে কোনো মা যেন আর একা হয়ে না পড়েন। একটি নতুন জীবন পৃথিবীতে এনে যে মা নিজেই মৃত্যুর অন্ধকার সুড়ঙ্গে হারিয়ে যান, তার সেই নীরব আর্তনাদ কি আমরা কেউ শুনতে চেয়েছি? সন্তানকে বুকের কাছাকাছি টেনে নিয়ে যে মায়ের পরম আয়েশে ঘুমানোর কথা, তিনি যখন ভেতরে–ভেতরে তিলে–তিলে শেষ হয়ে যান, তখন সমাজ হিসেবে আমাদের ব্যর্থতা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়? মায়েরা তো ফেরেস্তা নন, তারাও রক্ত–মাংসের মানুষ। তাদেরও ক্লান্ত হওয়ার অধিকার আছে, ভেঙে পড়ার অধিকার আছে। প্রসবের পরের ওই ভঙ্গুর দিনগুলোতে একটা মোলায়েম হাতের স্পর্শ, একটুখানি উষ্ণ সান্ত্বনা আর নিঃশর্ত ভালোবাসাই পারে একজন মা–কে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরিয়ে আনতে।
আসুন, কোনো মা–কে আর অন্ধকারের অতলে একা লড়াই করতে না দিই। ঘরের প্রতিটি কোণ থেকে মুছে যাক অবহেলার ধুলো, স্বামী ও পরিবারের প্রতিটি মানুষ যেন হয়ে ওঠে নতুন মায়ের নির্ভরতার একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়। কারণ, পৃথিবীর কোনো শিশুই যেন মায়ের শূন্য কোল নিয়ে বড় না হয়, আর কোনো ক্লান্ত মা যেন বুকভরা অভিমান নিয়ে চিরতরে ঘুমিয়ে না পড়েন। একটি শিশুর সুন্দর শৈশবের প্রথম শর্তই হলো তার মায়ের সুস্থ ও নিরাপদ বেঁচে থাকা।












