একটি মেয়েশিশু কখন থেকে বুঝতে শেখে, তার ভালো হওয়ার শর্তগুলো ছেলেশিশুর চেয়ে আলাদা? হয়তো তখনই, যখন তাকে বলা হয়, এত জোরে হাসতে নেই, তর্ক করতে নেই, বড়দের মুখের ওপর কথা বলতে নেই। কিংবা যখন নিজের পছন্দের কোনো বিষয়ে আপত্তি জানালে শুনতে হয়, মেয়েদের এত জেদ ভালো নয়। এই কথাগুলো আলাদা করে দেখলে খুব সাধারণ পারিবারিক উপদেশ মনে হতে পারে। কিন্তু শৈশব থেকে কৈশোর, কৈশোর থেকে যৌবন এবং তারপর পরিণত বয়স পর্যন্ত এমন অসংখ্য উপদেশ একটি মেয়ের আচরণ, আত্মপরিচয় ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। সমাজে ‘ভালো মেয়ে’ হয়ে ওঠার যে দীর্ঘ প্রশিক্ষণ চলে, তার কোনো নির্দিষ্ট পাঠ্যক্রম নেই। পরিবার, বিদ্যালয়, আত্মীয়স্বজন, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান, এমনকি জনপ্রিয় সংস্কৃতিও নানাভাবে এই প্রশিক্ষণে অংশ নেয়।
ভালো মানুষ হয়ে ওঠার শিক্ষা আর ভালো মেয়ে হয়ে ওঠার শিক্ষা এক বিষয় নয়। প্রথমটির সঙ্গে সততা, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ ও অন্যের প্রতি শ্রদ্ধার সম্পর্ক রয়েছে। দ্বিতীয়টির সঙ্গে প্রায়ই যুক্ত হয়ে যায় নির্দিষ্ট ধরনের আচরণ, পোশাক, কণ্ঠস্বর, চলাফেরা এবং অন্যের প্রত্যাশা পূরণের বাধ্যবাধকতা। একটি ছেলে নিজের মতামত জোরের সঙ্গে প্রকাশ করলে তাকে আত্মবিশ্বাসী বলা হতে পারে, অথচ একই আচরণের জন্য একটি মেয়েকে উদ্ধত বা অবাধ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ছেলের স্বাধীনতাকে বড় হয়ে ওঠার লক্ষণ মনে করা হলেও মেয়ের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে অনেক সময় পারিবারিক শৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখা হয়। অবশ্য সব পরিবার বা সামাজিক পরিসরে এই অভিজ্ঞতা এক রকম নয়। শ্রেণি, শিক্ষা, অঞ্চল ও পারিবারিক মূল্যবোধভেদে পার্থক্য রয়েছে। তবু নারী ও পুরুষের জন্য ভিন্ন আচরণবিধি নির্ধারণের প্রবণতা আমাদের সামাজিক জীবনে দীর্ঘদিনের। সমাজবিজ্ঞানে এই প্রক্রিয়াকে সামাজিকীকরণ বলা হয়। শিশুরা শুধু সরাসরি নির্দেশ শুনে নয়, চারপাশের মানুষের আচরণ পর্যবেক্ষণ করেও নিজেদের ভূমিকা সম্পর্কে ধারণা তৈরি করে। একটি মেয়ে যখন দেখে পরিবারের নারীরা সবার খাবারের ব্যবস্থা করার পর নিজেরা খেতে বসেন, অন্যের প্রয়োজনকে নিজের প্রয়োজনের আগে রাখেন কিংবা বিরোধ এড়াতে বারবার নীরব থাকেন, তখন এসব আচরণ তার কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হতে পারে। অন্যদিকে পরিবারের পুরুষেরা যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রধান দায়িত্বে থাকেন, শিশুর মনে ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের একটি লিঙ্গভিত্তিক ধারণা গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়। এখানে সমস্যা কোনো ব্যক্তির যত্নশীল হওয়া বা দায়িত্ব পালন করা নয়। সমস্যা তখনই, যখন এই গুণগুলোকে নারীর স্বাভাবিক কর্তব্য এবং পুরুষের ঐচ্ছিক সহযোগিতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ‘ভালো মেয়ে’ ধারণার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো সহনশীলতা। মেয়েদের প্রায়ই শেখানো হয়, সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হলে অনেক কিছু মেনে নিতে হয়। পারিবারিক শান্তি বজায় রাখা, অন্যের রাগ সামলানো, নিজের কষ্ট প্রকাশ না করা কিংবা বিরোধের সময় আগে আপস করা–এসব দায়িত্ব ধীরে ধীরে নারীর ওপর বেশি করে এসে পড়ে। অথচ সহনশীলতা তখনই ইতিবাচক গুণ, যখন তা ব্যক্তির স্বাধীন সিদ্ধান্ত থেকে আসে। সামাজিক চাপের কারণে অন্যায় বা অসম্মান সহ্য করতে বাধ্য হওয়া সহনশীলতার সমার্থক নয়। একইভাবে আপস একটি সম্পর্কের প্রয়োজনীয় উপাদান হতে পারে, কিন্তু আপসের দায়িত্ব যদি সব সময় একজনের ওপর বর্তায়, তাহলে সম্পর্কের ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হয়। এই প্রশিক্ষণের আরেকটি দিক নিজের ইচ্ছাকে অপরাধবোধের সঙ্গে যুক্ত করে ফেলা। একজন নারী নিজের জন্য সময় চাইলে, পেশাগত সুযোগ গ্রহণ করতে চাইলে কিংবা পরিবারের প্রচলিত কোনো সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত করলে তাঁকে স্বার্থপর বলে মনে করা হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে অন্য কেউ কিছু বলার আগেই তিনি নিজেকে প্রশ্ন করতে শুরু করেন–নিজের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া কি অন্যায়? দীর্ঘদিন অন্যের প্রত্যাশা পূরণ করতে করতে নিজের ইচ্ছার প্রতি এমন সংশয় তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে সব নারীর অভিজ্ঞতা এক নয়; ব্যক্তিত্ব, পারিবারিক সমর্থন, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও সামাজিক পরিবেশের কারণে এই চাপের প্রভাব ভিন্ন হতে পারে। মেয়েদের আবেগ প্রকাশের ক্ষেত্রেও সামাজিক প্রত্যাশার বৈপরীত্য রয়েছে। তাঁদের কোমল, সহানুভূতিশীল ও যত্নশীল হতে উৎসাহ দেওয়া হয়, কিন্তু রাগ, ক্ষোভ কিংবা বিরক্তি প্রকাশকে অনেক সময় অগ্রহণযোগ্য মনে করা হয়। অথচ রাগও মানুষের স্বাভাবিক আবেগ। অন্যায়, অবহেলা বা সীমালঙ্ঘনের প্রতিক্রিয়ায় ক্ষুব্ধ হওয়া সব সময় নেতিবাচক আচরণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই আবেগ কীভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে। কিন্তু নারীর রাগকে চরিত্রগত ত্রুটি হিসেবে বিচার করা হলে তাঁর আপত্তির বিষয়টি আড়ালে চলে যেতে পারে। তখন কোনো সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে আলোচনা করার পরিবর্তে প্রশ্ন ওঠে, তিনি এত রেগে গেলেন কেন।
বয়ঃসন্ধিকালে এই আচরণবিধির সঙ্গে যুক্ত হয় শরীর ও যৌনতা নিয়ে নানা বিধিনিষেধ। পোশাক, চলাফেরা, বন্ধুত্ব এবং জনপরিসরে উপস্থিতির ওপর বাড়তি নজরদারি শুরু হতে পারে। নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই রয়েছে, কিন্তু নিরাপত্তার নামে যদি মেয়েদের চলাচল ও অভিজ্ঞতার পরিসর ক্রমাগত সংকুচিত করা হয়, তাহলে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে আত্মবিশ্বাস ও স্বাধীনতার ওপর। ছেলেদের দায়িত্বশীল আচরণ শেখানোর পরিবর্তে মেয়েদের সতর্ক থাকার দায়িত্বকেই প্রধান করে তোলার প্রবণতা সমস্যাটিকে আরও জটিল করে। এতে নিরাপত্তা একটি সামষ্টিক সামাজিক দায়িত্ব না হয়ে মেয়েদের ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ন্ত্রণের যুক্তিতে পরিণত হতে পারে। শিক্ষা ও কর্মজীবনে প্রবেশের পরও এই প্রশিক্ষণ শেষ হয় না। একজন নারীকে দক্ষ, পরিশ্রমী ও আত্মবিশ্বাসী হওয়ার পাশাপাশি বিনয়ী, সহযোগিতাপরায়ণ এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য থাকার প্রত্যাশা পূরণ করতে হতে পারে। কর্মক্ষেত্রে নেতৃত্বের জন্য যে দৃঢ়তা প্রয়োজন, সেই একই দৃঢ়তা কখনো তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়। সিদ্ধান্তে অনড় থাকলে তাঁকে কঠোর বলা হতে পারে, আবার অতিরিক্ত আপস করলে নেতৃত্বের যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। সামাজিক মনোবিজ্ঞানে নারীর নেতৃত্ব ও প্রচলিত লিঙ্গভূমিকার মধ্যকার এই সংঘাত নিয়ে গবেষণা হয়েছে। অ্যালিস ইগলি ও স্টিভেন কারাউর ভূমিকা–সামঞ্জস্য তত্ত্ব দেখায়, নেতৃত্ব সম্পর্কে প্রচলিত প্রত্যাশা এবং নারীর কাছ থেকে প্রত্যাশিত আচরণের মধ্যে অসংগতি তৈরি হলে নারীর মূল্যায়নে পক্ষপাত দেখা দিতে পারে।
বিয়ের পর এই প্রত্যাশার আরেকটি রূপ সামনে আসে। সংসারের সবার সঙ্গে মানিয়ে চলা, সম্পর্কের জটিলতা সামলানো, পরিবারের আবেগগত পরিবেশ বজায় রাখা এবং যত্নের কাজের বড় অংশ বহন করা–এসব দায়িত্ব প্রায়ই নারীর ওপর বেশি করে বর্তায়। সমাজবিজ্ঞানী আর্লি হকশিল্ড কর্মজীবী দম্পতিদের গৃহস্থালি শ্রমের অসম বণ্টন বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ‘দ্বিতীয় পালা’র ধারণাটি জনপ্রিয় করেন। অর্থাৎ কর্মক্ষেত্রের কাজ শেষে ঘরে ফিরে আরেক দফা শ্রমের দায়িত্ব। এই অসমতা শুধু সময়ের নয়; কে কোন কাজ মনে রাখবেন, পরিকল্পনা করবেন এবং অন্যদের প্রয়োজন বুঝে ব্যবস্থা নেবেন, তার সঙ্গেও সম্পর্কিত। ফলে ‘ভালো স্ত্রী’ বা ‘ভালো মা’ হওয়ার প্রত্যাশা অনেক সময় নারীর ব্যক্তিগত অবসর ও আত্মবিকাশের সুযোগ সীমিত করে। তবে এই আলোচনার উদ্দেশ্য যত্ন, সহমর্মিতা, বিনয় কিংবা পারিবারিক দায়িত্বকে অস্বীকার করা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, এসব গুণ ও দায়িত্ব কেন প্রধানত নারীর জন্য নির্ধারিত থাকবে? একজন পুরুষেরও সহনশীল, যত্নশীল ও আপস করতে সক্ষম হওয়া প্রয়োজন। একইভাবে একজন নারীরও নিজের মতামত প্রকাশ, প্রত্যাখ্যান, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ব্যক্তিগত সীমা নির্ধারণের অধিকার রয়েছে। মানুষের গুণাবলিকে নারীসুলভ ও পুরুষসুলভ দুই ভাগে বিভক্ত করার পরিবর্তে সেগুলোকে সবার জন্য সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
পরিবর্তনের সূচনা পরিবার থেকেই হতে পারে। শিশুকে বয়স ও সামর্থ্য অনুযায়ী দায়িত্ব দেওয়া, ছেলে–মেয়ে নির্বিশেষে গৃহস্থালি কাজে অংশ নিতে শেখানো, মতামত প্রকাশের সুযোগ রাখা এবং অসম্মতি জানানোকে অবাধ্যতার সমার্থক না ভাবা–এসব ছোট অভ্যাস সামাজিকীকরণের ধরন বদলাতে পারে। বিদ্যালয়েও পাঠ্যবই, শিক্ষকের আচরণ এবং সহপাঠীদের পারস্পরিক সম্পর্কের মাধ্যমে সমতার চর্চা সম্ভব। মেয়েদের শুধু আত্মরক্ষার শিক্ষা নয়, ছেলেদেরও অন্যের স্বাধীনতা, সম্মতি ও ব্যক্তিগত সীমার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার শিক্ষা প্রয়োজন। ‘ভালো মেয়ে’ হয়ে ওঠার দীর্ঘ প্রশিক্ষণের সবচেয়ে গভীর প্রভাব সম্ভবত এখানেই যে, একসময় বাইরের নির্দেশগুলো মানুষের নিজের ভেতরের কণ্ঠে পরিণত হয়। তখন কেউ নিষেধ না করলেও একজন নারী নিজের ইচ্ছাকে সংযত করেন, কেউ দোষ না দিলেও অপরাধবোধে ভোগেন, কেউ প্রত্যাখ্যান না করলেও নিজের যোগ্যতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। এই অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের সবটুকু যে সামাজিক শিক্ষার ফল, তা বলা যায় না; ব্যক্তির অভিজ্ঞতা ও মনস্তত্ত্ব অনেক জটিল। কিন্তু সামাজিক প্রত্যাশা যে আত্মপরিচয় নির্মাণে ভূমিকা রাখে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তাই প্রশ্নটি শুধু মেয়েদের কী শেখানো হচ্ছে, তা নয়; সেই শিক্ষার মধ্য দিয়ে তারা নিজেদের সম্পর্কে কী বিশ্বাস করতে শিখছে।
একটি মেয়েকে ভালো মানুষ হতে শেখানো জরুরি, কিন্তু ভালো হওয়ার শর্ত হিসেবে নিজের ইচ্ছা, কণ্ঠস্বর ও স্বাধীনতাকে বিসর্জন দিতে শেখানো জরুরি নয়। যে সমাজ মেয়েদের সহমর্মিতা শেখায়, সেই সমাজের উচিত তাদের আত্মমর্যাদাও শেখানো। যে পরিবার মেয়ের দায়িত্ববোধ প্রত্যাশা করে, তার উচিত মেয়ের সিদ্ধান্তকেও সম্মান করা। কারণ ভালো মানুষ হওয়ার সঙ্গে নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়ার কোনো বিরোধ নেই। বরং অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং নিজের প্রতি শ্রদ্ধা–এই দুইয়ের সমন্বয়েই একটি স্বাধীন ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে।











