রাসসুন্দরী দেবী: অন্দরমহল থেকে নিজের জীবনের ইতিহাস

পল্লবী বড়ুয়া | শনিবার , ৩১ অক্টোবর, ২০২৬ at ১১:০৩ পূর্বাহ্ণ

ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলায় একজন নারী গোপনে পড়তে শিখছেন। তাঁর সামনে কোনো বিদ্যালয় নেই, নিয়মিত শিক্ষক নেই, পড়াশোনার জন্য নির্ধারিত সময়ও নেই। আছে সংসারের অসংখ্য কাজ, সন্তান পালনের দায়িত্ব এবং নারীর শিক্ষাকে ঘিরে সামাজিক নিষেধ। সেই পরিবেশে রান্নাঘরের আড়ালে বইয়ের একটি পাতা লুকিয়ে অক্ষর চেনার চেষ্টা করছেন তিনি। তাঁর নাম রাসসুন্দরী দেবী। তাঁর আত্মজীবনী ‘আমার জীবন’ প্রকাশিত হয় ১৮৭৬ সালে। বাংলা ভাষায় নারীর লেখা প্রথম পূর্ণাঙ্গ আত্মজীবনী হিসেবে গ্রন্থটি স্বীকৃত।

রাসসুন্দরীর এই কাহিনিকে কেবল একজন নারীর শিক্ষালাভের সংগ্রাম হিসেবে দেখলে তাঁর রচনার বৃহত্তর তাৎপর্য আড়ালে থেকে যায়। আমার জীবন একই সঙ্গে ঊনবিংশ শতাব্দীর পূর্ববঙ্গের গৃহস্থালি জীবন, নারীর সামাজিক অবস্থান, ধর্মবিশ্বাস, মাতৃত্ব, শ্রম ও ব্যক্তিসত্তার এক দুর্লভ বিবরণ। যে জীবন সাধারণত ইতিহাসের মূল আলোচনায় অনুপস্থিত, সেই জীবনই এখানে ইতিহাসের বিষয় হয়ে উঠেছে। রাসসুন্দরী দেবীর জন্ম পাবনার পোতাজিয়া গ্রামে, আনুমানিক ১৮০৯–১৮১০ সালে। শৈশবে বাড়িতে ছেলেদের পাঠশালার পড়াশোনা দেখে ও শুনে কিছু অক্ষরের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে। কিন্তু এই পরিচয় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় রূপ নেয়নি। বারো বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয় ফরিদপুর অঞ্চলের রামদিয়া গ্রামের সীতানাথ সরকারের সঙ্গে। বিবাহের পর অপরিচিত সংসারে প্রবেশের অভিজ্ঞতা তাঁর মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল।

আমার জীবন–এ শৈশবের স্মৃতি, মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার বেদনা এবং বিবাহিত জীবনের অভিজ্ঞতা বারবার ফিরে এসেছে। বিশেষভাবে লক্ষণীয়, তিনি নিজের অবস্থাকে খাঁচায় বন্দী পাখির সঙ্গে তুলনা করেছেন। এই উপমা শুধু ব্যক্তিগত অসহায়তার প্রকাশ নয়; নারীর চলাফেরা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সীমাবদ্ধতারও ইঙ্গিত দেয়। তবে রাসসুন্দরীর জীবনকে আজকের স্বাধীনতার ধারণা দিয়ে সরলভাবে ব্যাখ্যা করা কঠিন। তিনি ছিলেন গভীরভাবে ধর্মবিশ্বাসী। তাঁর পড়তে শেখার আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রে ছিল বৈষ্ণব ধর্মগ্রন্থ চৈতন্যভাগবত পাঠের ইচ্ছা। অন্যের মুখে ধর্মগ্রন্থ শুনে সন্তুষ্ট না থেকে তিনি নিজেই তা পড়তে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য তাঁকে আশ্রয় নিতে হয়েছিল গোপনতার।

স্বামীর সংগ্রহে থাকা চৈতন্যভাগবত–এর একটি পাতা এবং সন্তানের অক্ষর শেখার উপকরণ কাজে লাগিয়ে তিনি পড়ার চেষ্টা শুরু করেন। রান্নাঘরে লুকিয়ে রাখা পাতাটি তাঁর শিক্ষার অন্যতম অবলম্বন হয়ে ওঠে। সংসারের কাজের ফাঁকে ফাঁকে অক্ষর মিলিয়ে পড়তে শেখার এই দীর্ঘ প্র্রক্রিয়া ছিল প্রায় সম্পূর্ণ স্বশিক্ষার ফল। এখানে সেসময়কার একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বাস্তবতা প্রকাশ পায়। একই পরিবারে ছেলের শিক্ষালাভ স্বাভাবিক ঘটনা, অথচ মায়ের শিক্ষালাভ গোপন করার বিষয়। শিক্ষার উপকরণ ঘরের মধ্যেই উপস্থিত, কিন্তু সেগুলো ব্যবহারের অধিকার নারী ও পুরুষের জন্য সমান নয়। রাসসুন্দরীর আত্মকথা এই বৈষম্যকে কোনো তাত্ত্বিক আলোচনার মাধ্যমে নয়, বরং দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান করেছে। তাঁর লেখার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক গৃহস্থালি শ্রমের বিবরণ। সংসারের কাজের চাপে নিজের জন্য সামান্য অবসরও পাওয়া কঠিন ছিল। সন্তানদের যত্ন, রান্না এবং পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর মধ্যেই কেটে যেত দিনের অধিকাংশ সময়। অথচ প্রচলিত ইতিহাসে এই শ্রমের পরিমাণ, অভিজ্ঞতা কিংবা তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নারীর মানসিক জগৎ খুব কমই আলোচিত হয়েছে। এবং এখনও এই অবস্থার খুব পরিবর্তন ঘটেছে বলা যায় না।

রাসসুন্দরী সেই অনালোচিত জীবনকে লিখিত রূপ দিয়েছেন। তাঁর আত্মজীবনীতে গৃহস্থালি কেবল পারিবারিক পরিসর নয়; এটি এমন একটি সামাজিক ব্যবস্থা, যেখানে দায়িত্বের বণ্টন, ক্ষমতার সম্পর্ক এবং ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার সীমা নির্ধারিত হয়। ফলে তাঁর রচনা থেকে শুধু একজন নারীর জীবন নয়, একটি নির্দিষ্ট শ্রেণি ও সামাজিক পরিসরের নারীদের অবস্থান সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যায়। অবশ্য তাঁর অভিজ্ঞতাকে ঊনবিংশ শতাব্দীর সব বাঙালি নারীর অভিজ্ঞতা হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। রাসসুন্দরী ছিলেন অপেক্ষাকৃত সচ্ছল, উচ্চবর্ণের হিন্দু পরিবারের সদস্য। শ্রেণি, ধর্ম, অঞ্চল ও সামাজিক অবস্থানভেদে নারীর জীবন ছিল ভিন্ন। আত্মজীবনীটি সেই বৃহত্তর ইতিহাসের একটি মূল্যবান উৎস, সম্পূর্ণ প্রতিনিধিত্ব নয়।

আমার জীবন–এর সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্যও বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। এটি কেবল ঘটনাক্রম অনুসরণ করে লেখা জীবনবৃত্তান্ত নয়। স্মৃতি, আত্মসমালোচনা, ধর্মীয় উপলব্ধি এবং ব্যক্তিগত অনুভূতি এর বয়ান নির্মাণ করেছে। রাসসুন্দরী নিজের জীবনের ঘটনাগুলোকে প্রায়ই ঈশ্বরের কৃপা ও ইচ্ছার আলোকে ব্যাখ্যা করেছেন। গবেষকেরা দেখিয়েছেন, এই ধর্মীয় বয়ানের মধ্য দিয়েই তাঁর ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও সামাজিক নিয়ম অতিক্রমের অভিজ্ঞতা প্রকাশ পেয়েছে।

এই দ্বৈততা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে তিনি প্রচলিত ধর্মবিশ্বাস ও পারিবারিক দায়িত্বকে অস্বীকার করেননি; অন্যদিকে নিজের শিক্ষালাভের ইচ্ছাও পরিত্যাগ করেননি। ফলে তাঁর আত্মকথায় প্রতিবাদ সব সময় প্রকাশ্য বিরোধিতার ভাষা পায়নি। কখনো তা আত্মগোপন, অধ্যবসায় এবং নিজের জন্য সামান্য সময় ও জ্ঞানের অধিকার অর্জনের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। আত্মজীবনী রচনার সিদ্ধান্তটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। দীর্ঘকাল অন্যের প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে জীবনযাপন করা একজন নারী একসময় নিজের জীবনকে লেখার বিষয় হিসেবে নির্বাচন করেছেন। তিনি কেবল অন্যদের সম্পর্কে লেখেননি; নিজের ভয়, দুঃখ, বিশ্বাস, ইচ্ছা এবং অভিজ্ঞতাকেও বিবরণের যোগ্য বলে বিবেচনা করেছেন। এখানেই তা ব্যক্তিগত স্মৃতির সীমানা অতিক্রম করে। ইতিহাসে কোনো ব্যক্তির উপস্থিতি আর সেই ব্যক্তির নিজের ভাষায় ইতিহাসে উপস্থিত হওয়া এক বিষয় নয়। রাসসুন্দরীর আগে নারীদের জীবন নিয়ে অন্যরা লিখেছেন; কিন্তু তাঁর আত্মজীবনীতে একজন নারী নিজের জীবনের ব্যাখ্যাকারী হয়ে উঠেছেন।

অবশ্য আত্মজীবনীকে সরাসরি নির্ভুল ঐতিহাসিক বিবরণ হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ নেই। স্মৃতি নির্বাচিত, সময়ের ব্যবধানে পুনর্গঠিত এবং লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিচালিত। রাসসুন্দরীর ক্ষেত্রেও সেই সীমাবদ্ধতা প্রযোজ্য। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতাই তাঁর রচনার ঐতিহাসিক মূল্য নষ্ট করে না। বরং একজন নারী নিজের অতীতকে কীভাবে স্মরণ করেছেন, কোন ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়েছেন এবং নিজের জীবনকে কীভাবে বুঝতে চেয়েছেন–সেসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সুযোগ তৈরি করে।

১৮৭৬ সালে ‘আমার জীবন’ প্রকাশের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার আত্মজীবনী সাহিত্যে যে স্বতন্ত্র কণ্ঠ যুক্ত হয়েছিল, তার গুরুত্ব শুধু সাহিত্যিক নয়। রাসসুন্দরী দেবী দেখিয়েছেন, ইতিহাসের উপাদান কেবল জনজীবনের বড় ঘটনা নয়; একটি রান্নাঘর, গোপনে পড়া বইয়ের পাতা, সন্তানের লেখার উপকরণ কিংবা নিজের জীবনের কথা লেখার আকাঙ্ক্ষাও ইতিহাসের গভীর তাৎপর্য বহন করতে পারে।

তাঁর আত্মজীবনী তাই কেবল এক নারীর শিক্ষালাভের কাহিনি নয়। এটি এমন এক সময়ের দলিল, যখন নারীর নিজের জীবন নিয়ে লেখার অধিকারও সহজে প্রতিষ্ঠিত ছিল না। রাসসুন্দরী সেই অধিকার অর্জন করেছিলেন নিজের অভিজ্ঞতাকে ভাষা দিয়ে। আর সেই ভাষার মধ্য দিয়েই ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলার অন্দরমহল আজও আমাদের সামনে কথা বলে।

তথ্যসূত্র: রাসসুন্দরী দেবী, আমার জীবন (১৮৭৬); তনিকা সরকার, Words to win: The Making of Amar Jiban, a Modern Autobiography

পূর্ববর্তী নিবন্ধএতিম ও প্রতিবন্ধী শিশুরাও হবে দেশের উন্নয়নের অংশীদার : সমাজকল্যাণমন্ত্রী
পরবর্তী নিবন্ধনারীর গান, নারীর খেলা : জনপরিসরে নারীর উপস্থিতি নিয়ে আপত্তি কেন?