২০১২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। সিরিয়ার হোমস শহরের বাবা আমর এলাকায় সরকারি বাহিনীর গোলাবর্ষণ চলছে। শহরটি প্রায় অবরুদ্ধ। সেখানকার একটি অস্থায়ী মিডিয়া সেন্টার থেকে স্যাটেলাইট সংযোগে বিবিসি, সিএনএনসহ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে পরিস্থিতি জানাচ্ছেন একজন নারী সাংবাদিক। তিনি ম্যারি কোলভিন। তাঁর বর্ণনার কেন্দ্রে যুদ্ধের কৌশল বা কোন পক্ষ কতটা এগোল–এসবের চেয়ে বেশি ছিল আহত ও নিহত সাধারণ মানুষ। পরদিন, ২২ ফেব্রুয়ারি, সেই মিডিয়া সেন্টারে গোলাবর্ষণে নিহত হন তিনি এবং ফরাসি আলোকচিত্রী রেমি ওশলিক।
ম্যারি কোলভিনের সাংবাদিকতা বুঝতে এই শেষ দৃশ্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তাঁর জীবনকে শুধু ‘যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত সাহসী সাংবাদিক’–এর গল্পে আটকে দিলে তাঁর কাজের গভীরতা ধরা পড়ে না। তিন দশকের বেশি সময় ধরে তিনি যুদ্ধের সংবাদ করেছেন। মধ্যপ্রাচ্য, বলকান, চেচনিয়া, পূর্ব তিমুর, শ্রীলঙ্কা, ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া থেকে সিরিয়া–যুদ্ধের মানচিত্র বদলেছে, কিন্তু কোলভিনের আগ্রহের জায়গাটি প্রায় একই থেকেছে: যুদ্ধের মধ্যে আটকে পড়া সাধারণ মানুষ।
১৯৫৬ সালের ১২ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জন্ম কোলভিনের। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞান পড়েছিলেন। সাংবাদিকতায় তাঁর শুরু যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদ সংস্থা টচও–তে। ১৯৮৫ সালে তিনি ব্রিটিশ সংবাদপত্র ঞযব ঝঁহফধু ঞরসবং–এ যোগ দেন এবং পরবর্তী সময়ে পত্রিকাটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি সংবাদদাতা হয়ে ওঠেন। তাঁর প্রতিবেদনের বিশেষত্ব ছিল ঘটনাস্থলে পৌঁছানো। সংবাদ সম্মেলন কিংবা সামরিক বাহিনীর আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের বদলে তিনি জানতে চাইতেন, যুদ্ধ যাঁদের জীবনের ওপর দিয়ে যাচ্ছে তাঁরা কী দেখছেন।
এই নীতির সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণগুলোর একটি ১৯৯৯ সালের পূর্ব তিমুর। ইন্দোনেশিয়াপন্থী মিলিশিয়াদের সহিংসতার মধ্যে জাতিসংঘের একটি কম্পাউন্ডে প্রায় দেড় হাজার মানুষ আটকা পড়েছিলেন। নিরাপত্তার কারণে অধিকাংশ বিদেশি সাংবাদিক সরে গেলেও কোলভিন সেখানে থেকে যান এবং তাঁদের পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারাবাহিকভাবে সংবাদ পাঠান। পরে তিনি বলেছিলেন, এত মানুষের ভাগ্য যখন অনিশ্চিত, তখন তাঁদের রেখে চলে যাওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। শেষ পর্যন্ত আটকে পড়া মানুষগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়। ঘটনাটি কোলভিনের সাংবাদিকতার একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে–পর্যবেক্ষক হয়েও মানুষের দুর্দশা থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রাখতে তিনি পারতেন না।
কিন্তু এই সাংবাদিকতার মূল্য তাঁকে শরীর দিয়েও দিতে হয়েছে। ২০০১ সালে শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের সংবাদ সংগ্রহের সময় শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রিত এলাকা পার হওয়ার পথে গ্রেনেড বিস্ফোরণে তিনি বাঁ চোখের দৃষ্টিশক্তি হারান। এরপর তাঁর কালো আইপ্যাচ তাঁর পরিচিত চেহারার অংশ হয়ে ওঠে। আঘাতের পরও তিনি যুদ্ধের সংবাদ সংগ্রহ বন্ধ করেননি। তবে এই অভিজ্ঞতাগুলো তাঁকে অক্ষতও রাখেনি। নিজের লেখায় ও সাক্ষাৎকারে তিনি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে মানসিক অভিঘাত এবং পোস্ট–ট্রমাটিক স্ট্রেসের অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। ফলে তাঁর সাহসকে ভয়হীনতা হিসেবে দেখা ভুল; ভয় এবং ক্ষতির অভিজ্ঞতা নিয়েই তিনি বারবার কাজে ফিরেছিলেন।
নারী হিসেবে যুদ্ধসাংবাদিকতায় তাঁর অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধক্ষেত্র দীর্ঘদিন পুরুষ সাংবাদিকদের ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। কিন্তু কোলভিন নিজেকে ‘নারী যুদ্ধসাংবাদিক’ পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইতেন না। তাঁর কাছে মূল প্রশ্ন ছিল কাজটি ঠিকভাবে করা যাচ্ছে কি না। একই সঙ্গে নারী হওয়ার কারণে এমন কিছু জায়গায় তাঁর প্রবেশাধিকার তৈরি হয়েছিল, যেখানে পুরুষ সাংবাদিকদের পক্ষে পৌঁছানো কঠিন ছিল–বিশেষ করে যুদ্ধের মধ্যে থাকা নারী ও পরিবারের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায়।
তাঁর সাংবাদিকতার দর্শন সম্ভবত সবচেয়ে পরিষ্কারভাবে পাওয়া যায় ২০১০ সালে লন্ডনের সেন্ট ব্রাইডস চার্চে যুদ্ধসাংবাদিকদের স্মরণে দেওয়া বক্তৃতায়।
সেখানে তিনি যুদ্ধসংবাদকে দূর থেকে দেখা বিমূর্ত ঘটনা হিসেবে নয়, বাস্তব মানুষের অভিজ্ঞতা হিসেবে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। যুদ্ধের সত্য বোঝাতে সংখ্যার পেছনের মানুষকে দৃশ্যমান করা–এটাই ছিল তাঁর কাজের কেন্দ্র।
এই দর্শনই তাঁকে শেষ পর্যন্ত সিরিয়ার হোমসে নিয়ে যায়। ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিদেশি সাংবাদিকদের প্রবেশে কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যেও তিনি সীমান্ত পেরিয়ে হোমসে ঢোকেন। সেখান থেকে তাঁর শেষ প্রতিবেদনগুলোর একটিতে তিনি দুই বছরের একটি শিশুর মৃত্যুর বর্ণনা দেন। আন্তর্জাতিক সমপ্রচারেও তিনি বেসামরিক মানুষের ওপর গোলাবর্ষণের কথা বলেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি নিজেও নিহত হন।
তাঁর মৃত্যুর পর ঘটনাটি নতুন মাত্রা পায়। কোলভিনের পরিবার যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে সিরীয় সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করে। ২০১৯ সালে ওয়াশিংটন ডিসির একটি ফেডারেল আদালত প্রমাণ পর্যালোচনা করে রায় দেয় যে কোলভিনকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছিল এবং সিরীয় সরকারকে তাঁর মৃত্যুর জন্য দায়ী করে ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দেয়। সিরীয় সরকার এ অভিযোগ অস্বীকার করেছিল। তাই তাঁর মৃত্যু শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সাংবাদিকের ঝুঁকির উদাহরণ নয়; সাংবাদিককে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ ও সংবাদ সংগ্রহের স্বাধীনতার প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হয়ে আছে।
ম্যারি কোলভিনকে অনুসরণীয় করে তাঁর আইপ্যাচ কিংবা বিপদের মধ্যে ঢুকে পড়ার ক্ষমতা নয়। যুদ্ধসাংবাদিকতার শিক্ষা কখনোই অপ্রয়োজনে নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলা হতে পারে না। তাঁর উত্তরাধিকার অন্য জায়গায়–ক্ষমতাবানদের ভাষ্যের বিপরীতে ঘটনাস্থলের মানুষের অভিজ্ঞতাকে নথিবদ্ধ করার জেদে।
যুদ্ধ শেষ হয়, সরকার বদলায়, মানচিত্রও বদলে যায়। কিন্তু নিহত শিশুর নাম, আশ্রয়হীন পরিবারের অপেক্ষা কিংবা অবরুদ্ধ শহরের মানুষের ভয় ইতিহাসে থেকে যায় তখনই, যখন কেউ তা নথিবদ্ধ করেন। ম্যারি কোলভিন তাঁর কর্মজীবনের বড় অংশজুড়ে সেই সাক্ষী থাকার কাজটিই করেছিলেন।











