‘আল্লাহ মেঘ দে, পানি দে, ছায়া দে রে তুই’। লোককবি আবদুল হাই মাশরেকীর এ প্রার্থনায় যেন এখন তীব্র গরমে অতিষ্ঠ দেশবাসীর মনের চাওয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক্ষেত্রে চট্টগ্রাম শহরের বাসিন্দাদের এ চাওয়টা একটু বেশিই। কারণ বৃষ্টির অভাবে দুই সমস্যায় আছেন তারা। প্রথমত, তাপপ্রবাহের ফলে তীব্র গরমে অস্বস্তিতে আছেন নগরবাসী। দ্বিতীয়ত, ওয়াসার সরবরাহকৃত পানিতে দেখা দিয়েছে লবণ। মুষলধারে বৃষ্টি না হলে এ সমস্যার পুরোপুরি সমাধানও সম্ভব হবে না। অর্থাৎ নগরের বিভিন্ন জায়গায় ওয়াসার সরবরাহকৃত পানিতে যে লবণাক্ততা তার জন্যও দায়ী বৃষ্টি না হওয়া।
এ অবস্থায় কালো মেঘের আশায় ঘন ঘন আকাশের দিকে তাকাচ্ছে ক্লান্ত পথচারী। লবণপানিতে বিরক্ত লোকজন বৃষ্টির পূর্বাভাসের প্রত্যাশায় চেয়ে আছে আবহাওয়া অধিদপ্তরের দিকে। কিন্তু কোনো সু–সংবাদ দেয়নি সংস্থাটি। বরং গতকালের ন্যায় আজ বৃহষ্পতিবারও ‘মৃদু তাপপ্রবাহ’ বয়ে যেতে পারে বলে জানিয়েছে পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস।
আবহাওয়াবিদগণের সঙ্গে আলাপকালে তারা বলছেন, এপ্রিল মাসে চট্টগ্রামের স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১৪৭ দশমিক ৪ মিলিমিটার। অথচ গত ২৬ দিনে মাত্র ৭৯ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস। এছাড়া অতীতে বৈশাখ মাসেও বৃষ্টি হত। কিন্তু ১৩ দিন পেরুলেও কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি হয়নি নগরে। বৃষ্টি না হওয়ায় তাপমাত্রা কমছে না বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদগণ। এতে বাড়ছে গরমের অনুভূতিও।
আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ এপ্রিল থেকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত কোনো বৃষ্টিপাত হয়নি নগরে। এ সময় তাপমাত্রাও ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। মৃদু তাপপ্রবাহও বয়ে গিয়েছিল। ফলে এ সময় গরমে হাঁসফাঁস করে নগরবাসী। এরপর ২১ এপ্রিল বিকেল ৩টা পর্যন্ত সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় মাত্র ১ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয় নগরে। এতে কিছুটা স্বস্তি নেমে আসে জনমনে। ওইদিন তাপমাত্রাও কমেছিল অনেকটা। পরদিন ২২ এপ্রিল বিকেল ৩টা পর্যন্ত সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আবহাওয়া অফিস রেকর্ড করে আরো ৭ দশমিক ৮ মিলিমটার বৃষ্টিপাত। এরপর থেকে গতকাল পর্যন্ত নগরে কোনো বৃষ্টিপাত হয়নি। ফলে আবারও বাড়তে থাকে তাপমাত্রা। সর্বশেষ গতকাল বুধবার নগরে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে। এদিন নগরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৬ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তাকে মৃদু তাপপ্রবাহ বলা হয়। এছাড়া গতকাল রেকর্ডকৃত তাপমাত্রা ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে ৪ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি।
এদিকে গত দুই দিন দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগের কঙবাজার ও বান্দরবানে। এর মধ্যে গতকাল বুধবার কঙবাজারে ৩৮ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং আগের দিন মঙ্গলবার বান্দরবানে রেকর্ড হয়েছে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৭ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড হয়।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস কর্মকর্তা মেঘনাথ তঞ্চাঙ্গ্যা দৈনিক আজাদীকে জানান, আজ নগরে আংশিক মেঘলাসহ আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে। চট্টগ্রামে যে মৃদু তাপ প্রবাহ বয়ে যাচ্ছে তা আজও অব্যাহত থাকতে পারে। এছাড়া রাতের তাপমাত্রা সমান্য বৃদ্ধি পেতে পারে এবং দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে।
রাজধানীর আগারগাঁও আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. আবদুল হামিদ মিয়া জানান, আজ সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ সারা দেশের আবহওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে। তবে রাজশাহী, ঢাকা এবং খুলনা বিভাগের দু’এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি অথবা বজ্রবৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং খুলনা বিভাগসহ রাজশাহী, পাবনা, পটুয়াখালী ও ভোলা জেলাসমূহের উপর দিয়ে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে। সারা দেশে দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে এবং রাতের তাপমাত্রা সামান্য বৃদ্ধি পেতে পারে।
আবহাওয়াবিদগণ বলছেন, এই সময়ে যে উত্তাপটা থাকে, বৃষ্টি হলে কমে যায় সেটা। কিন্তু বৃষ্টি না হওয়ায় তাপমাত্রা কমছে না। দেশজুড়ে মুষলধারে বৃষ্টি হলে তাপমাত্রাটা কমে যেত। এ বিষয়ে রাজধানীর আগারগাঁও আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. আবদুল হামিদ মিয়া সাংবাদিকদের বলেন, কিছুদিন আগে যে তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে, তার কারণ ছিল আকাশে মেঘ না থাকা, দেশের কোথাও বৃষ্টি না হওয়া। কিন্তু মাঝে আকাশে মেঘ জমে দেশের কোথাও কোথাও বৃষ্টি হওয়াতে তাপমাত্রা কমে আসে। কিন্তু এখন আবার আকাশে মেঘ নেই, যে কারণে তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে।
ন্যাশনাল ওশানোগ্রাফিক অ্যান্ড ম্যারিটাইম ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক মোহন কুমার দাশ সাংবাদিকদের জানান, দেশের পশ্চিমাঞ্চলে মেঘ জমলেও দক্ষিণ–পূর্বাঞ্চলে মেঘ জমছে না, এ কারণে কঙবাজারে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা পাওয়া যাচ্ছে। তবে এটা সামনের দিনে ঝড়ের আভাস কি না বা এর কারণে আবহাওয়ার মোড় পরিবর্তন হবে কি না, তা আর ও দুই–তিনদিন দেখার পর বোঝা যাবে।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, নগরে চলতি মাসের ১ তারিখ ২৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এরপর ২ এপ্রিল ৭ মিলিমিটার, ৩ এপ্রিল ৩৫ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃৃষ্টিপাত হয়েছে। এছাড়া ৬ এপ্রিল পতেঙ্গা আবহাওয়া বৃষ্টিপাতের পরিমাণ দেখায় ‘ট্রেস’। উল্লেখ্য, ট্রেস হচ্ছে পরিমাণে এত কম বৃষ্টি হওয়া যা পরিমাপযোগ্য না।














