কয়েক মাস ধরে করোনার সংক্রমণ অনেকটা নিয়ন্ত্রণে। চট্টগ্রামেও বেশ কিছুদিন ধরে সংক্রমণের হার ৫ শতাংশের নিচে। কখনো কখনো ১ শতাংশেরও কম। সংক্রমণের নিম্নহারে সবকিছুই এখন স্বাভাবিক। মানুষের চলাফেরা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ, বিয়ে, সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান সবই চলছে জাঁকজমকভাবে। এসব সভা-সমাবেশ ও অনুষ্ঠানে মানুষের ভিড়ও হচ্ছে প্রচুর। কিন্তু আগের মতো সে-ই সচেতনতা যেন আর নেই। স্বাস্থ্যবিধি বা শারীরিক দূরত্ব মেনে চলা তো অনেকটা কিতাবের বিষয়, অধিকাংশের মুখে মাস্কও দেখা যায় না।
কিন্তু এখন সহনীয় থাকলেও মানুষের অসচেতনতার কারণে করোনা সংক্রমণ ফের বেড়ে যেতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্টরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একে তো সংক্রমণ অনেকটা সহনীয়। তার ওপর অনেকে দুই ডোজ টিকা নিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে বিশেষ করে টিকা গ্রহীতাদের মাঝে এক ধরনের বেপরোয়া ভাব দৃশ্যমান। তারা মনে করছেন, টিকা গ্রহণের কারণে তারা শতভাগ নিরাপদ। যার কারণে মাস্ক পরায় তাদের যত অনীহা। পাশাপাশি স্বাস্থ্য বিধি প্রতিপালনেও অনাগ্রহ। মানুষের এমন বেপরোয়া ভাব ও অসচেতনতার কারণে করোনা সংক্রমণ ফের বেড়ে যেতে পারে।
প্রতিবেশী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে পূজার পর সংক্রমণ দ্বিগুণ বেড়েছে জানিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ডা. মো. ইসমাইল খান বলেন, ইংল্যান্ডেও সংক্রমণ বাড়ছে। আর অতিমারির একটি বৈশিষ্ট্য হলো বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে সংক্রমণ বাড়লে তা অন্য প্রান্তেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। আমাদের এখানেও কাছাকাছি সময়ে দুর্গাপূজা, ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.), প্রবারণা পূর্ণিমার মতো ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয়েছে। এসব অনুষ্ঠানে হাজার হাজার মানুষের ভিড় হয়েছে। কিন্তু স্বাস্থ্যবিধি কাউকে মানতে দেখা যায়নি। অনেকের মুখে মাস্কও চোখে পড়েনি। এর প্রভাব হয়তো ১০-১৫ দিনের মধ্যে দৃশ্যমান হতে পারে। এছাড়া রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ, বিয়ে ও সামাজিক অনুষ্ঠান তো আছেই। কোথাও শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা বা স্বাস্থ্যবিধি মানতে দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু সংক্রমণ থেকে বাঁচতে ঘন ঘন সাবান-পানি দিয়ে হাত ধোয়া ও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার পাশাপাশি মুখে মাস্ক পরার বিকল্প নেই। তিনি এসব বিষয়ে সকলকে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা ও চিকিৎসকরা বলছেন, টিকাদান শুরুর পর করোনা নিয়ে মানুষের উদাসীনতা আরো বেড়েছে। যেন এক ধরনের অবহেলা কাজ করছে মানুষের মাঝে। আর সংক্রমণ কমে আসায় বেপরোয়া ভাব আরো বেড়েছে। যার কারণে স্বাস্থ্যবিধি মানা তো দূরের কথা, অধিকাংশের মুখে মাস্কটিও দেখা যাচ্ছে না। অনেকে মাস্ক পরলেও তা হয় থুতনিতে নয়তো গলায় ঝুলতে দেখা যায়। তাছাড়া বিয়ে, গায়ে হলুদ, উৎসব, মেজবানসহ সব ধরনের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান হচ্ছে হরহামেশা। এসব অনুষ্ঠানে শারীরিক দূরত্ব বা স্বাস্থ্যবিধি মানছে না কেউ।
এতে করে সংক্রমণ আবারো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করেন চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. সেখ ফজলে রাব্বি। মানুষের উদাসীনতা ও অবহেলার কারণে করোনার সংক্রমণ আবারো বাড়তে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, সংক্রমণ এখন নিয়ন্ত্রণে থাকায় কিছুটা হলেও স্বস্তি এসেছে। তবে স্বস্তি এলেও তৃপ্ত হওয়ার সুযোগ আছে বলে আমরা মনে করি না। কারণ, ইদানীং উৎসব, মেজবানসহ সামাজিক-সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান বেড়ে গেছে। এসব অনুষ্ঠানে প্রচুর জনসমাগম হচ্ছে। বিনোদন কেন্দ্রগুলোতেও উপচে পড়া ভিড় দেখা যাচ্ছে। যেখানে স্বাস্থ্যবিধি মানার উদাহরণ নেই বললেই চলে। বেশিরভাগের মুখে মাস্কও চোখে পড়ে না। এসব অনুষ্ঠান ও বিনোদন কেন্দ্র থেকে করোনা সংক্রমণ আবারো ছড়িয়ে পড়তে বলে আশঙ্কা করছি।
অন্যদিকে, করোনার টিকা আসার পর মানুষের মাঝে করোনা নিয়ে গাফিলতি বেড়েছে বলে মনে করেন চট্টগ্রাম ফিল্ড হাসপাতালের উদ্যোক্তা ও প্রধান নির্বাহী ডা. বিদ্যুৎ বড়ুয়া। তিনি আজাদীকে বলেন, করোনার টিকা নিলেও মুখে মাস্ক পরা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিকল্প নেই। এটাতে কোনো রকম গাফিলতি করা যাবে না। কারণ, দুই ডোজ টিকা নেয়ার পরও শরীরে অ্যান্টিবডি (প্রতিরোধ ক্ষমতা) তৈরিতে আরো সময় লাগে। নিজে সুরক্ষিত থাকার পাশাপাশি পরিবারকে সুস্থ ও সুরক্ষিত রাখতে মাস্ক পরার পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।













