অবশেষে উন্মুক্ত করে দেওয়া হলো ঢেমুশিয়া বদ্ধ জলমহাল

‘জাল যার জলা তার’ নীতির বাস্তবায়ন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি কৃষক-মৎস্যজীবীসহ ৭ ইউনিয়নের মানুষের কৃতজ্ঞতা

ছোটন কান্তি নাথ, চকরিয়া | শনিবার , ২৯ আগস্ট, ২০২৬ at ৫:৪৪ পূর্বাহ্ণ

কক্সবাজারের মাতামুহুরী উপজেলার উপকূলীয় সাত ইউনিয়নের ওপর দিয়ে প্রবহমান প্রায় সাড়ে ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ ১২০ একর বিশিষ্ট ঢেমুশিয়া বদ্ধ জলমহালটি স্থানীয় মৎস্যজীবী, কৃষকসহ সকল জনগণের জন্য অবশেষে উন্মুক্ত করা হয়েছে। এতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ কর্তৃক নির্বাচনের আগে জনগণের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন সভায় দেওয়া প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হয়েছে। এই অবস্থায় উপজেলার উপকূলীয় সাতটি ইউনিয়নের লাখো মানুষের মুখে হাসি ফুটেছে। সরকারিভাবে আর এই বদ্ধ জলমহালকে লিজ না দেওয়ার মধ্য দিয়ে ‘জাল যার জলা তার’ নীতির বাস্তবায়ন হওয়ায় মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের মাঝে স্বস্তি দেখা দিয়েছে।

জানা গেছেবিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে একনাগাড়ে ১৭ বছর ধরে তিন বছর অন্তর সামান্য টাকায় লিজ দেওয়ায় বিশালায়তনের এই জলমহালে সর্বসাধারণের প্রবেশাধিকার ছিল কার্যত নিষিদ্ধ। এতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহকারী মৎস্যজীবী এবং দুই পাশের হাজার হাজার পরিবারের সদস্যরা গোসল করাসহ সংসারের প্রাত্যহিক কাজে এই জলমহালের পানিও ব্যবহার করতে পারতো না। এমনকি সরকারিভাবে লিজ নিয়ে স্লুইচ গেটের জলকপাট খুলে দিয়ে মিঠাপানির একমাত্র উৎস এই জলমহালের ভেতর লবণ পানি প্রবেশ করানো হতো। যার কারণে হাজারো কৃষক তাদের কৃষিজমিতে এই জলমহালের মিঠাপানির সেচ দেওয়া থেকেও বঞ্চিত হতেন। এতে বহুমাত্রিক সমস্যার সম্মুখীন হতেন উপজেলার উপকূলীয় সাতটি ইউনিয়নের এসব মানুষ।

মাতামুহুরী উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছেউপকূলীয় মাতামুহুরী উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন তথা সাহারবিল, পশ্চিম বড় ভেওলা, কোনাখালী, ঢেমুশিয়া, পূর্ব বড় ভেওলা, ভেওলা মানিকচর ও বদরখালী ইউনিয়নের সর্বস্তরের মানুষের প্রাণের দাবি ছিল, মিঠা পানির উৎস প্রায় সাড়ে ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ ১২০ একর বিশিষ্ট ঢেমুশিয়া বদ্ধ জলমহালটি সরকারিভাবে লিজ না দিতে। অবশেষে সেই দাবির প্রতি সাড়া দিয়ে এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নির্দেশে এবার আর নতুন করে বদ্ধ জলমহালটি কাউকে ইজারা দেওয়া হয়নি। এখন থেকেই ঢেমুশিয়া জলমহাল জনগণের জন্যই উন্মুক্ত থাকবে এবং জনগণ তাদের সংসারে প্রাত্যহিক কাজে জলমহালের পানির ব্যবহার, কৃষকেরা তাদের জমিতে মিঠাপানির সেচ দেওয়া ছাড়াও মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহকারী স্থানীয় মৎস্যজীবীরা উন্মুক্তভাবেই এর সুফল ভোগ করবেন।

ঢেমুশিয়া ইউনিয়নের খাসপাড়ার প্রবীণ বাসিন্দা ছিদ্দিক আহমদ (৮৫), মৎস্যজীবী মোহাম্মদ সুমনসহ বদ্ধ জলমহালের দুই পাশের বেশ কয়েকজন বাসিন্দা দৈনিক আজাদীকে বলেন, শত শত বছর ধরে এই ঢেমুশিয়া বদ্ধ জলমহালের পানি ব্যবহার করে আসছিলেন। এখানে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতে শত শত জেলে পরিবার। এমনকি এই জলমহালের মিঠা পানি দিয়েই উপকূলীয় এলাকার ফসলি জমিতে ধানসহ রকমারি সবজির আবাদ করে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া ছাড়াও দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতেন। কিন্তু বিগত ১৭ বছর সেই অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল সামান্য টাকায় লিজ দেওয়ার নামে।

ভুক্তভোগী এসব লোকজনের মুখে হাসি ফুটেছে দাবি করে তারা আরও বলেন, আমাদের দাবি ছিল এই জলমহাল কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে লিজ না দিতে। লিজ দিলে আমাদের বহুমুখী সমস্যা হওয়ার বিষয়টি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের কাছে তুলে ধরার পর বিগত সংসদ নির্বাচনে তিনি যখন এখানে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছেন, তখন আমাদের আশ্বাস দিয়েছিলেন এই জলমহাল জনগণের জন্যই উন্মুক্ত থাকবে। অবশেষে সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করায় আমরা তার প্রতি কৃতজ্ঞ।

কক্সবাজার জেলা জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির মৎস্যজীবী প্রতিনিধি জাফর আলম দৈনিক আজাদীকে বলেন, ঢেমুশিয়া বদ্ধ জলমহাল এখানকার কৃষক, স্থানীয় মৎস্যজীবী সম্প্রদায় এবং এখানকার খেটে খাওয়াসহ সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ায় এতদঞ্চলের কৃষকদের মাঝে চাষাবাদ নিয়ে আশার সঞ্চার হয়েছে। বিগত সময়ে কয়েকজনের সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি অবস্থা থেকে এখানকার সর্বস্তরের মানুষকে পরিত্রাণ দেওয়ায় কক্সবাজারের প্রাণপুরুষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই।

এ ব্যাপারে মাতামুহুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত চকরিয়ার ইউএনও শাহীন দেলোয়ার বলেন, এখানকার জনগণের দাবির প্রতি সাড়া দিয়ে নতুন করে ঢেমুশিয়া বদ্ধ জলমহালটি কাউকে ইজারা দেওয়া হয়নি। বর্তমানে বিশালায়তনের এই জলমহাল জনগণের জন্যই উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। যাতে জনগণ তাদের সংসারে প্রাত্যহিক কাজে জলমহালের পানির ব্যবহার, কৃষকেরা তাদের জমিতে মিঠাপানির সেচ দেওয়া ছাড়াও মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহকারী স্থানীয় মৎস্যজীবীরা উন্মুক্তভাবেই এর সুফল ভোগ করবেন। ইউএনও এই বিষয়ে সতর্ক করে বলেন, শোনা যাচ্ছে কেউ কেউ এই জলমহালের কোনো অংশ যে যার মতো করে দখলে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। এই ধরনের কর্মকাণ্ড যারাই করবেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচকরিয়ায় বিদ্যুতায়িত হয়ে যুবকের মৃত্যু