রোগীর ভারে কাহিল চমেক হাসপাতাল

৫শ শয্যার জনবলে সাড়ে ৩ হাজার রোগীর চিকিৎসা ওয়াড গুলোতে দালালের দৌরাত্ম্য অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের কাছে জিন্মি রোগীর স্বজনেরা মেঝেতেও রোগীর যন্ত্রপাতির সংকট

জাহেদুল কবির | শনিবার , ৬ জুন, ২০২৬ at ৯:৫১ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপতাল প্রতিষ্ঠা হয়েছে আজ থেকে ৬৯ বছর আগে। সে সময় মাত্র ১২০ শয্যা নিয়ে চট্টগ্রাম বিভাগের বৃহত্তম হাসপাতালটির যাত্রা শুরু হয়। পরে চার ধাপে শয্যা সংখ্যা বাড়ানো হয়। সর্বশেষ গত ২০২২ সালের জুনে শয্যা সংখ্যা ২ হাজার ২০০ তে উন্নীত করা হয়। যদিও বর্তমানে হাসপাতালে গড়ে সাড়ে ৩ হাজার রোগী ভর্তি থাকছে। শয্যা বাড়লেও হাসপাতালের সামগ্রিক সুযোগ সুবিধা বাড়েনি। বিশেষ করে জনবল সংকট রয়েছে। হাসপাতালটি এখনো চলছে পাঁচশত শয্যার জনবল দিয়ে। শয্যার অতিরিক্ত রোগী ভর্তি থাকায় অনেক ওয়ার্ডে রোগীদের বারান্দার মেঝেতে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। বিশেষ করে স্ট্রোককিডনিসহ অনেক মুমূর্ষু রোগীকে সরবরাহ লাইন না থাকায় জরুরি প্রয়োজনে অক্সিজেন সেবাও দেয়া যায় না। এছাড়া মেঝেতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের হাঁটু গেঁড়ে বসে চিকিৎসা দিতে বেগ পেতে হয়। অন্যদিকে রাতের বেলায় রোগীর সাথে থাকা মহিলা ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন সময়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রাম ও আশপাশের বিভিন্ন জেলা মিলে অন্তত ৪ কোটি মানুষের একমাত্র চিকিৎসা সেবা কেন্দ্র চমেক হাসপাতাল। অথচ এই হাসপাতালে জেলা উপজেলা থেকে জটিল ও রেফার করা রোগীরাই আসার কথা। কিন্তু আশপাশের জেলা উপজেলায় সরকারি পর্যায়ে উন্নত সুযোগ সুবিধাসহ হাসপাতাল গড়ে না উঠার কারণে চমেক হাসপাতালের ওপর চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে যদি রোগীরা সেবা পায় তবে চমেক হাসপাতালের ওপর চাপ কমবে। চমেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, চমেক হাসপাতালে দিন দিন রোগীর চাপ বাড়ছে। তবে সেই চাপ বাড়ার মধ্যেও চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ সেবা দিচ্ছেন। এদিকে চমেক হাসপাতালের পাশে নির্মাণাধীন ১৫ তলা বিশিষ্ট ক্যান্সার ভবনের নির্মাণ শেষ হলে ক্যান্সার ইউনিটের পাশাপাশি কিডনি ও হৃদরোগ বিভাগ সেখানে চলে যাবে। তখন হাসপাতালের স্থান সংকুলানের যে ঘাটতি রয়েছে সেটি কিছুটা হলেও লাঘব হবে।

জানা গেছে, চমেক হাসপাতালে রোগীদের সেবা দেয়ার জন্য চিকিৎসকের ঘাটতি না থাকলেও পর্যাপ্ত সংখ্যক নার্সের ঘাটতি রয়েছে। বর্তমানে চাহিদার তুলনায় অন্তত ৩০০ থেকে ৪০০ জনের নার্সের ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া এনেস্থেসিয়ার চিকিৎসকেরও ঘাটতি রয়েছে। হাসপাতালে অপারেশনে থিয়েটারে এনেস্থেসিয়ার চিকিৎসকের প্রয়োজন হয়। এছাড়া আইসিইউ বিভাগেও রয়েছে এনেস্থেসিয়ার চিকিৎসকের সংকট। এনেস্থেসিয়ার বিষয়ে অনেক চিকিৎসক পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন করতে অনাগ্রহী। ফলে নতুন বিশেষজ্ঞ এনেস্থেসিয়ালজিস্ট তৈরি হচ্ছে না বলছেন সংশ্লিষ্টরা। অপরদিকে হাসপাতালে পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতিরও সংকট রয়েছে। বিশেষ করে হাসপাতালের চাহিদা বিবেচনায় একাধিক এমআরআই মেশিন দরকার। বর্তমানে একটি এমআরআই মেশিন দিয়ে চলছে কার্যক্রম। সেই মেশিনটিও দীর্ঘ সময় অচল ছিল। এছাড়া বর্তমানে সচল রয়েছে দুটি সিটি স্ক্যান মেশিন। এরমধ্যে একটি ওয়ান স্টপ ইমারজেন্সি সেন্টার (ওসেক) এবং অপরটি রয়েছে রেডিওলজি বিভাগে। তবে দীর্ঘ সময় বন্ধ রয়েছে নারীদের স্তনের রোগ নির্ণয়ের ম্যামোগ্রাফি মেশিন। এছাড়া চক্ষু বিভাগের ল্যাসিক মেশিন নষ্ট পড়ে আছে দীর্ঘ সময় ধরে। রেডিওথেরাপি বিভাগে কোবাল্টসিটি সিমুলেশনসহ বেশ কিছু মেশিন চালু রয়েছে। সেখানে রোগীরা নিয়মিত সেবা পাচ্ছেন। অপরদিকে চমেক হাসপাতালের ল্যাবে অনেক প্রয়োজনীয় প্যাথলজি (রক্ত ও হরমোন) পরীক্ষা করা যায় না। গরীব রোগীদের তাই বাধ্য হয়ে বেসরকারি ল্যাবের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এই সুযোগে প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে আসা রোগীদের দালাল চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন অখ্যাত নাম সর্বস্ব ল্যাবে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। একই ধরণের ঘটনা ঘটছে ওষুধ কেনার ক্ষেত্রেও। কম টাকায় ওষুধ কিনে দেয়ার কথা বলে রোগীদের টাকা হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে। এছাড়া আরেক শ্রেণীর দালাল ভর্তি রোগীদের বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে। চমেক হাসপাতাল কর্র্র্তৃপক্ষ মাঝে মাঝে এসব দালালদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে আটক করে আইনশৃৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে সোপর্দও করে। তারপরেও এদের দৌরাত্ম্য খুব একটা কমছে না। অপরদিকে হাসপাতালের রোগী ও লাশ পরিবহনে গড়ে উঠা অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের কাছে অসহায় রোগী ও স্বজনেরা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দূরত্ব অনুযায়ী ভাড়া নির্ধারণ করে দিলেও এসব অ্যাম্বুলেন্স চালকরা তা মানেন না। শুধু তাই নয়, বাইরে থেকে কোনো অ্যাম্বুলেন্স এসে হাসপাতালের রোগী বা লাশ পরিবহন করতে পারে না। সমিতির দোহাই দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের সদস্যরা রোগীর স্বজনদের একপ্রকার জিম্মি করে রেখেছেন। বর্তমানে অ্যাম্বুলেন্স সমিতির নেতারা বিএনপির স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের নাম বিক্রি করে এসব অপকর্ম করছে।

জানতে চাইলে চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন দৈনিক আজাদীকে বলেন, আসলে হাসপাতালে জনবলের সংকট রয়েছে। বিশেষ করে নার্সের সংকট প্রকট। চিকিৎসকের সংকট নাই। হাসপাতালে বর্তমানে সাড়ে ৩ হাজার রোগী ভর্তি থাকছে। কিন্তু আমাদের তো ওই পরিমাণ বেড নাই। তারপরেও আমরা কোনো রোগীকে ভর্তি না দিতে পারি না। আমাদের চিকিৎসকরাও সর্বোচ্চ সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। হাসপাতালের দালালদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে। অ্যাম্বুলেন্স সমিতিকে আমরা ভাড়া নির্ধারণ করে দিয়েছি। তারা যদি সেটি না মানে তবে আমরা ব্যবস্থা নিবো। মনগড়া ভাড়া নেয়ার সুযোগ নাই।

পূর্ববর্তী নিবন্ধনিয়মিত পৌরকর পরিশোধ করছে না সরকারি প্রতিষ্ঠান
পরবর্তী নিবন্ধখড়ের গাদায় আগুন, ঘরে ঢুকে লুটপাট বাঁশখালীতে