দূরের টানে বাহির পানে

হাসান আকবর | বুধবার , ২৯ জুলাই, ২০২৬ at ৪:৩১ পূর্বাহ্ণ

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

সিডনি ছেড়ে চলে যাচ্ছি। জানি না জীবনে আর কখনো সিডনিতে আসা হবে কিনা! তবে আমার মন বলছে, আবারো দেখা হবে সিডনি। কারণ, জীবনে শুধুমাত্র একবার গিয়ে আর যাইনি এমন দেশের সংখ্যা মাত্র দুইটি। ভূটান এবং মেক্সিকো। এছাড়া পৃথিবীর আর যতগুলো দেশ আমি ঘুরেছি, সবগুলোতেই দুই তিনবার করে গিয়েছি। ভূটানে হয়তো আর কখনো যাবো না, মেক্সিকোও মনে হয় যাওয়া হবে না। তবে অন্যান্য দেশগুলোতে হুটহাট চলে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

অস্ট্রেলিয়ার প্রতি কেমন যেনো একটি মায়া জন্মে গেছে। অস্ট্রেলিয়ার একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে ঘুরতে গিয়ে কত মানুষের সাথে যে পরিচয় হলো, কত ঘরে কত পাতে যে রিজিক ছিল সবই মনে পড়ছিল। প্রবাসী মানুষগুলোর মায়া কেমন যেনো পিছু টানছিল!

ক্যাথে প্যাসিফিকের বিশাল ফ্লাইটটি যখন নির্ধারিত উচ্চতায় ওঠে গেলো। সিট বেল্ট খোলার সংকেত দেয়া হলো। আমরা বেল্ট খুলে কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে বসলাম। ইকোনমি ক্লাসের যাত্রী, স্বাভাবিক হতে চাইলেও হওয়া যায় না। এর থেকে ট্রাকে চড়া আমার কাছে বেশি আরামের মনে হয়। বরাবরই উইন্ডো সিট পছন্দ করি, এয়ারলাইন্সের কাউন্টারে চেক ইন করার সময় বিনয়ী হাসি হেসে উইন্ডো সিট চেয়ে নিই। কিন্তু ইকোনমি ক্লাসে উইন্ডো সিটের যাত্রীকে ভয়ংকর এক চাপে থাকতে হয়। মোটা মানুষের জন্য বিষয়টি একটু বেশি কষ্টকর। তবুও আকাশজুড়ে রঙের খেলা দেখার জন্য উইন্ডো সিটই পছন্দ করি, নিই।

লায়ন ফজলে করিম ভাই ডালিয়া ভাবীকে নিয়ে বসেছেন আমাদের সামনের রোতে, পেছনের রোতে আমি এবং লায়ন বিজয় শেখর দাশ। মনে হচ্ছে বিমানটি স্থির হয়ে আছে, তবে আমি জানি যে, বিশাল এই দানব ঘন্টায় এক হাজার কি.মি’র বেশি বেগে ছুটছে।

সিডনিহংকং দীর্ঘ আকাশযাত্রা। প্রায় নয় ঘণ্টার এই সফর একঘেয়ে হওয়ার কথা হলেও আধুনিক বিমানের নানা সুবিধা যাত্রাকে আরামদায়ক করে তুলেছে। প্রত্যেক যাত্রীর সামনে ব্যক্তিগত বিনোদন ব্যবস্থা। শত শত সিনেমা, তথ্যচিত্র, সংগীত, টেলিভিশন অনুষ্ঠান এবং রিয়েলটাইম ফ্লাইট ম্যাপ।

এই ধরনের লম্বা জার্নিতে সিনেমা দেখে দারুণ সময় কাটে। ফাঁকে ফাঁকে রিয়েল টাইম ফ্লাইট ম্যাপ দেখতে বেশ ভালো লাগে। কোন কোন দেশের উপর দিয়ে উড়ছি সেটা দেখতে আসলেই ভালো লাগে। আমাদের বিমানটি অস্ট্রেলিয়ার উপকূল ছেড়ে প্রশান্ত মহাসাগরের আকাশে প্রবেশ করছে। হাজার হাজার কিলোমিটার বিস্তৃত নীল জলরাশি নিচে, আর ওপরে সাদা মেঘের রাজ্য। কখনও তুলোর মতো মেঘ, কখনও আবার বিশাল পর্বতের মতো মেঘমালা। কখনো হাতির মতো, কখনো ঘোড়ার মতো, কখনো এলো চুলের নারীর মতো! মেঘের যে কত রঙ, কত ঢং!!

অল্পক্ষণের মধ্যে কেবিন ক্রুদের ব্যস্ততা শুরু হলো। তারা যাত্রীদের খাবার পরিবেশন করতে শুরু করেছেন। আমাদের সিট বিমানের মাঝামাঝিতে। তাই যেদিক থেকেই দেয়া শুরু করুক না কেন আমাদের পর্যন্ত আসতে কিছুটা সময় লাগবে। কিন্তু কিছুটা আশ্চর্য হয়ে দেখলাম যে, করিম ভাই, ডালিয়া ভাবী এবং আমিসহ কয়েকজনকে ওরা আগেই আলাদা খাবার দিয়ে গেলো। গরম ভাত, চিকেন, সবজি, সালাদ, রুটি, মাখন, ফল এবং ডেজার্ট। সঙ্গে চা কিংবা কফির সুযোগ। আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলো যাত্রীদের খাদ্যাভ্যাসের কথা মাথায় রেখে নিরামিষ, হালাল, ভেগানসহ বিভিন্ন ধরনের খাবারের ব্যবস্থা রাখে। টিকেট করবার সময় খাবারের ব্যাপারে বিশেষ অর্ডার দিয়ে রাখা যায়। তখন এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ যাত্রীর চাহিদামতো খাবার পরিবেশন করে। ক্যাথে প্যাসিফিক হংকংভিত্তিক এয়ারলাইন্স। তাই টিকেট করবার সময় আমি মুসলিম ফুড অর্ডার দিয়ে রেখেছিলাম। এখন সবার সাথে না মিশিয়ে আমাদেরকে আগেই মুসলিম ফুড দিয়ে গেলো।

খাওয়া শেষে জানালার পাশে বসে প্রকৃতি দেখতে দেখতে সময় কেটে যাচ্ছিল। আকাশের প্রায় ৩৫ হাজার ফুট ওপর থেকে সূর্যের আলো একেবারেই ভিন্নরকম লাগে। সাদা মেঘের ওপর পড়া সোনালি আলো যেন স্বর্গীয় এক দৃশ্যের জন্ম দেয়। আমি মুগ্ধ হয়ে আকাশে খেলা করা আলোর রকমারি শোভা দেখছিলাম।

আমাদের বিমানটি মাঝে মধ্যে হালকা দুলছিল। ককপিট থেকে ক্যাপ্টেন জানালেন, কিছু এলাকায় বাতাসের কারণে সামান্য টার্বুলেন্স রয়েছে। তবে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। সিটবেল্ট বেঁধে রাখার অনুরোধ করলেন তিনি। অবশ্য মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিমান আবার পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে গেলো।

নয় ঘন্টা দীর্ঘ সময়। এতো দীর্ঘ সময় এক জায়গায় বসে থাকা জেলে থাকার মতো। তবুও কখনও সিনেমা দেখলাম, কৌতুক দেখলাম, আবার কখনও ঘুমিয়ে নিলাম। মাঝে প্রচুর খাবার দাবারও দেয়া হয়েছে। নানা ধরনের পানীয়ের সমাহারের মাঝে আমার চা কফি নিরন্তরভাবে চলছিল। রিয়েল টাইম ম্যাপে কতটুকু এসেছি বুঝার চেষ্টা করছিলাম। সেখানে প্রশান্ত মহাসাগরই যেনো শেষ হচ্ছিলো না!

একসময় ম্যাপে দেখা গেল, আমাদের বিমানটি দক্ষিণ চীন সাগরের আকাশে প্রবেশ করেছে। জানালার বাইরে ছোট ছোট দ্বীপ, সমুদ্রপথে চলাচলরত অসংখ্য জাহাজ এবং দূরে উপকূলীয় শহরের আভাস চোখে পড়ছিল।

কিছুক্ষণ পর কেবিন ক্রুরা অবতরণের প্রস্তুতি নিতে বললেন। সবাইকে সিটবেল্ট বাঁধতে, আসন সোজা করতে এবং জানালাগুলো খুলে দেয়ার অনুরোধ করা হলো। বিমান ধীরে ধীরে নিচে নামতে শুরু করল। বিমান নিচে নামার সময় বেশ টের পাওয়া যায়, কখনো কখনো ভয়ও লাগে!

মেঘ ভেদ করে নিচে নামতেই চোখে পড়ল অসংখ্য দ্বীপে গড়ে ওঠা হংকং। সমুদ্রের বুক চিরে ছুটে চলেছে ফেরি, কন্টেনার জাহাজ আর স্পিডবোট। পাহাড়, সমুদ্র আর সুউচ্চ ভবনের অনন্য সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই নগরী আমাকে আগেও মুগ্ধ করেছে। আমি নিশ্চিত, এবারও করবে।

এরপর চোখে পড়ল বিশ্বের অন্যতম প্রকৌশল বিস্ময় হংকংঝুহাইম্যাকাও সেতু। সমুদ্রের ওপর ৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সেতু পৃথিবীর নির্মাণশিল্পের বড় বিস্ময় হয়ে রয়েছে। আকাশ থেকে সেতুটিকে রূপালি ফিতার মতো দেখাচ্ছিল।

সেতুটি আমার দেখা হয়নি, সময় হয়নি বলে এটির উপর দিয়ে যাওয়া হয়নি। তবে এটির ব্যাপারে গতবার ইউছুপ আলী ভাই বেশ গল্প করেছিলেন। আমিও ইন্টারনেট থেকে বেশ কিছু তথ্য যোগাড় করে পড়েছিলাম। সেতুটি সমুদ্রের ওপর নির্মিত বিশ্বের দীর্ঘতম সেতু ও টানেল ব্যবস্থা। চীনের পার্ল রিভার ডেল্টার ওপর নির্মিত সেতুটি হংকং, ঝুহাই ও ম্যাকাওকে সড়কপথে যুক্ত করেছে। এটিকে শুধু সেতু বললে ভুল হবে। এটি একটি ব্রিজটানেল সিস্টেম। এতে তিনটি প্রধান কেবলস্টেইড ব্রিজ, প্রায় ৬.৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্রের নিচে টানেল এবং দুটি কৃত্রিম দ্বীপ রয়েছে। যেখান দিয়ে সেতু থেকে সুড়ঙ্গে এবং আবার সুড়ঙ্গ থেকে সেতুতে ওঠানামা করা যায়। সেতুটির বিশেষ এই ডিজাইনের ফলে বড় বড় কন্টেনার জাহাজ ও তেলবাহী জাহাজ নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে।

২০০৯ সালে সেতুটির নির্মাণ কাজ শুরু করা হয়, সাগরের বুকে ৫৫ কিলোমিটারের সেতু এবং টানেলের নির্মাণ সম্পন্ন হয় ২০১৮ সালে। ছয় লেনের এক্সপ্রেসওয়ের সেতু ও টানেলটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছিল ১২৭ বিলিয়ন চীনা মুদ্রা, ডলারে প্রায় ১৯ বিলিয়ন। এটিকে বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল সেতুও বলা হয়। বলে রাখা ভালো যে, চীনই এই সেতুটি নিজস্ব প্রকৌশলী ও লোকবল দিয়ে নির্মাণ সম্পন্ন করেছিল। যারা চট্টগ্রামে টানেল নির্মাণ করেছে সেই চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন কোম্পানির (সিসিসিসি) নের্তৃত্বাধীন একটি কনসোটিয়াম সেতুটি নির্মাণের বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালনা করে। এই সেতু চালু হওয়ার আগে হংকং থেকে ঝুহাই কিংবা ম্যাকাও যেতে সড়কপথে ৩ ঘণ্টার বেশি সময় লাগতো, এখন নাকি ৪০ মিনিট লাগে! বিমান ধীরে ধীরে হংকং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ের দিকে এগিয়ে গেল। সমুদ্র ভরাট করে নির্মিত চেক ল্যাপ কক দ্বীপের ওপর অবস্থিত এই বিমানবন্দর পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ও ব্যস্ত বিমানবন্দর। অবতরণের মুহূর্তে বিমানের চাকা রানওয়েতে স্পর্শ করতেই হালকা ধাক্কা অনুভূত হলো, বিমানটি মনে হয় একটু লাফিয়েও উঠলো। এর পরই সেটি রানওয়ে ধরে তীব্র বেগে ছুটতে লাগলো। যাত্রীদের ফোনগুলো ক্রমাগত বাজছিল। আমার মনে হলো, কতজনের কত অপেক্ষার যেনো অবসান হলো! (চলবে)

লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধগুরুশিষ্য সম্পর্কের অবক্ষয় ও শিক্ষা বাণিজ্য
পরবর্তী নিবন্ধসংস্কৃতির শহর প্রিয় চট্টগ্রাম