দুদকের গণশুনানির কার্যক্রম যেন আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত না হয়

| শনিবার , ৬ আগস্ট, ২০২২ at ৫:২১ পূর্বাহ্ণ

দেশের দুর্নীতি দমনের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন নানা রকম পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে। এর মধ্যে জনগণকে সচেতন করার লক্ষ্যে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে গণশুনানির আয়োজন করে আসছে। গণশুনানির মাধ্যমে সরকারি দপ্তর ভিত্তিক পরিসেবার স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দপ্তরের দুর্বলতা চিহ্নিত করা সম্ভব হয়। গণশুনানি মূলত একটি ত্রিপক্ষীয় বৈঠক। এখানে সবশ্রেণির সম্মানিত নাগরিক, সংশ্লিষ্ট সরকারি অফিসে দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের ঊর্ধতন কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকেন।
গত ৩ আগস্ট চট্টগ্রামে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উন্মুক্ত গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, এতে ২২ সরকারি দপ্তরের বিরুদ্ধে আনিত ৪৭ ব্যক্তির অভিযোগের মধ্য থেকে ৩০টির তাৎক্ষণিক সমাধান করা হয়েছে। তিনটি অভিযোগ বিষয়ে নেয়া হয় অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত। ১৪ জন অভিযোগকারী শুনানিতে অংশগ্রহণ করেননি। এ ১৪ জনের অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়। গত বুধবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের (চমেক) শাহ আলম বীর উত্তম অডিটোরিয়ামে দুদকের এ গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। উন্মুক্ত এ গণশুনানিতে অংশগ্রহণ করতে দুইশ’র অধিক ব্যক্তি দুদকের বসানো অভিযোগ বক্সে অভিযোগ ফেলেন। সেখান থেকে ৪৭ ব্যক্তির অভিযোগকে প্রাধান্য দেয়া হয়। অভিযোগগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি অভিযোগ চসিক, সিডিএ, ওয়াসা, পিডিবি প্রভৃতি সেবা সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধেই। সবচেয়ে বেশি অভিযোগ চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের বিরুদ্ধে। তাদের বিরুদ্ধে ৭টি অভিযোগ করেন সেবাপ্রার্থীরা। এরপর রয়েছে জেলা প্রশাসন, ভূমি অফিস ও এলএ শাখা মিলে তাদের বিরুদ্ধে মোট দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৬টি অভিযোগ করেন সেবাপ্রার্থীরা।
গণশুনানি শেষে দুদক কমিশনার বলেন, সরকারি সব সংস্থাকে দুর্নীতিমুক্ত করতে নিজেদেরই সচেতন হতে হবে। অসৎ উদ্দেশ্যে কোনো সহজ কাজকে দীর্ঘসূত্রতার অজুহাতে আটকে রাখার সুযোগ নেই। আর যেসব অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়েছে তার সঠিক প্রতিফলন যাতে হয় সেদিকে নজর দিতে হবে।
আমরা দেখতে পাচ্ছি, গণশুনানির মাধ্যমে অনেক সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান হচ্ছে। এছাড়াও দুর্নীতি ও অনিয়মের উৎস শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট অফিসের দুর্নীতি ও অনিয়মের ব্যাপকতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের সেবা সম্পর্কে জনগণ কতটুকু সচেতন সে বিষয়েও ধারণা পাওয়া যায়। সামগ্রিক বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে দুর্নীতি দমনের কার্যকর কৌশল নির্ধারণ করা সম্ভব হচ্ছে। ৪৭ ব্যক্তির অভিযোগের মধ্যে তাৎক্ষণিকভাবে ৩০টি অভিযোগের সমাধানের বিষয়টি প্রশংসাযোগ্য কাজ। সংবাদটি জনমনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে এবং তাতে সমাজে ইতিবাচক সাড়া পড়েছে। সুনির্দিষ্টভাবে হয়রানিবিহীন ও দুর্নীতিমুক্ত সেবাপ্রদানের ক্ষেত্রে গণশুনানির ভূমিকা অপরিসীম। বিশেষজ্ঞদের মতে, গণশুনানির মাধ্যমে সেবাপ্রদানকারী ও সেবাগ্রহণকারীদের সংযুক্ত করার মাধ্যমে জনসাধারণকে ক্ষমতায়িত করার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি দুর্নীতি প্রতিরোধ ও সুশাসনের ঘাটতিসমূহ দূর করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ ধরনের গণশুনানি যত বেশি করা যায়, তত বেশি মঙ্গল।
দুর্নীতিকে দমনের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের এই পদক্ষেপ অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। কমিশনের ভাবনার ভেতর একটা বিষয় আছে যে কখনো একটি নির্দিষ্ট কৌশল দিয়ে অথবা শুধু মাত্র আইন দিয়ে দুর্নীতিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। এ জন্য সময়ের সাথে সাথে কৌশল পরিবর্তন করতে হবে। জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে। দুর্নীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। গণশুনানিতে সাধারণ মানুষ এতোটাই সম্পৃক্ত হয়েছে, তাতে তারা সন্তোষ প্রকাশ করছে ফলাফলে। তবে গণশুনানি পরবর্তী ফলোআপের ক্ষেত্রে যেন কোনো ঘাটতি না থাকে, সে বিষয়ে তদারকির ব্যবস্থা থাকতে হবে। পুনরায় সেবা নিতে গিয়ে অভিযোগকারী যেন অনিয়মের শিকার হন, সেজন্য শুনানি পরবর্তীকালে অভিযোগকারীদের প্রতিশ্রুতি মোতাবেক সমাধান দেওয়া হচ্ছে কিনা তা ফলোআপে রাখতে হবে। বিষয়টি গণশুনানির সাফল্যের ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। দুদকের এ ধরনের শুনানির কারণে প্রায় সব প্রতিষ্ঠান সেবার মান উন্নয়নে কাজ করতে বাধ্য। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে সেবাপ্রদানে পেশাদারি মনোভাব তৈরি হবে নিঃসন্দেহে। পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনকেও খেয়াল রাখতে হবে যেন গণশুনানির এই কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত না হয়।