চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়ককে চার লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। ইতোমধ্যে প্রকল্পের একটি অংশের ডিপিপি অনুমোদন হয়েছে এবং কাজ শিগগিরই শুরু হবে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তব্যে মন্ত্রী এই তথ্য জানান।
সড়ক পরিবহন মন্ত্রী বলেন, চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়ক একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। হাইওয়ে ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট (ফেজ–১) এর আওতায় প্রায় ২৬.২১ কিলোমিটার সড়ক চার লেনে উন্নীত করার প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি ২০২৯ সালের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২.৬৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ছয় লেনের ফ্লাইওভারও নির্মাণ করা হবে। মন্ত্রী আরও বলেন, মহাসড়কের অবশিষ্ট প্রায় ৪৮ কিলোমিটার অংশের জন্য ফিজিবিলিটি স্টাডি চলছে। এ অংশের উন্নয়নে অর্থায়ন নিশ্চিত করতে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। চট্টগ্রাম–কক্সবাজার সড়কটি দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। ইতোমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো শনাক্ত করে সড়ক ও জনপথ বিভাগ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যা বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে।
সড়ক অবকাঠামো নিয়ে কথা বলতে গিয়ে শেখ রবিউল আলম বলেন, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রায় ২৩ হাজার কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। তবে দেশের মোট সড়ক নেটওয়ার্ক চার লাখ কিলোমিটারের বেশি, যার বড় অংশ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন। অনেক সময় সংসদ সদস্যরা সব ধরনের সড়ক উন্নয়নের প্রস্তাব সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিয়ে আসেন, ফলে জবাবদিহিতার চাপও বাড়ে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, একটি উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা জাতীয় উন্নয়নের চাবিকাঠি। উন্নতির অন্যতম প্রধান সোপান পর্যাপ্ত ও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা এগিয়ে চললেও প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ না হলে, রক্ষণা–বেক্ষণে গুরুত্ব না পেলে তা গতি হারাবে। তাই অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও শিল্পায়নের জন্য সারাদেশে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। সারাদেশে সড়ক ও সেতু নির্মাণের মাধ্যমে একটি যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। এছাড়া নদীগুলো ড্রেজিং ও পুনরুজ্জীবিত করা হচ্ছে। রেল সেবা পুনরুজ্জীবিত করা হচ্ছে (বিভিন্ন রুটে) এবং নতুন রেল লাইন নির্মাণ করার পরিকল্পনা চলছে। একটি শক্তিশালী যোগাযোগ নেটওয়ার্ক উন্নয়নের গতি, শিল্পায়ন ও ব্যবসা ত্বরান্বিত করার বিশাল সুযোগ তৈরি করে। সেই লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। কোনো দেশের উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা সে দেশের অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব বিস্তর করে। পিছিয়ে থাকা অঞ্চল বলতে সাধারণত সেসব অঞ্চলকে বোঝানো হয় যেসব অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো নয়। সুবিধামতো সময়ে পণ্য পরিবহন করা যায় না, শিল্প কারখানা গড়ে ওঠার অনুকূূূূূল পরিবেশ থাকে না এবং এসব কারণে বেকারত্বের হারও থাকে বেশি। এসব কারণে সেই পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলোকে দেশের অগ্রসরমান অঞ্চলের সাথে যুক্তকরণ আবশ্যক হয়।
সওজ অধিদপ্তরের সামপ্রতিক তথ্য মতে, দেশের ১১০ জাতীয় মহাসড়কের মোট দৈর্ঘ্য ৩,৯৯০ কিলোমিটার। তন্মধ্যে ৯৩.০২% ভালো ও চলনসই অবস্থায় রয়েছে। বাকীগুলো খারাপ ও দুর্দশাগ্রস্ত, যার পরিমাণ প্রায় ২৭৪ কিলোমিটার। ছোট সড়কের অবস্থাও খারাপ। খোদ রাজধানীর রাস্তার অবস্থাও ভঙ্গুর। সড়কে চলাচলের নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ৫০ লাখের অধিক। বিআরটিএ’র সামপ্রতিক তথ্য মতে, বর্তমানে সড়কে চলাচল করা বৈধ যানবাহনের ৪০.৬৬% বাস ধ্বংস যোগ্য। এছাড়া,অসংখ্য অবৈধ যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক যান চলাচল করছে সব সড়কেই।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, সার্বিকভাবে দেশের যোগাযোগ খাত পর্যাপ্ত নয়। যা আছে, তার বিরাট অংশ ভঙ্গুর। প্রায়ই যেনতেন অজুহাতে ধর্মঘট হয়। পরিবহন ব্যয়ও অত্যধিক। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যুরো অব লেবার স্ট্যাটিস্টিকসের তথ্য মতে, গত এক দশকে বাংলাদেশে ভোক্তা মূল্য সূচকের পরিবহন ও যোগাযোগ উপখাতে ব্যয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বিশ্বের ১৯৬টি দেশের মধ্যে শীর্ষে বাংলাদেশ। দেশের যোগাযোগ খাতের নানা দুরবস্থা উন্নয়নের অন্তরায়। যোগাযোগ খাতের সার্বিক উন্নতি করতে হবে। সহজলভ্য, সাশ্রয়ী, পরিবেশ বান্ধব ও অধিক নিরাপত্তাজনক অতীতের নৌপথ পুনরুদ্ধার করার দিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়ককে চার লেনে উন্নীত করার যে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, তা খুবই জরুরি ছিল। এই পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়িত হোক–সেটাই আমরা প্রত্যাশা করছি।









