বর্তমান সরকার শিক্ষাকে জাতির শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করে এবং একটি গুণগত, জীবনমুখী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ৮ এপ্রিল জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সংসদ সদস্য মো. সেলিম রেজার এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার শিক্ষাকে জাতির শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করে এবং একটি গুণগত, জীবনমুখী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ পর্যায়ক্রমে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা ব্যক্ত করেছে। সে আলোকে শিক্ষা খাতে ৪৩টি ক্ষেত্র চিহ্নিত করে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ইশতেহারে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সে লক্ষ্যে চলতি অর্থবছরেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২ লাখ শিক্ষার্থীর মাঝে বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস বিতরণ করা হবে। সকল উপজেলায় পর্যায়ক্রমে এ কার্যক্রম সমপ্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পুষ্টি চাহিদা পূরণে পর্যায়ক্রমে সকল উপজেলায় স্কুল ফিডিং/মিড–ডে মিল চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী নতুন প্রজন্মকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার উপযোগী করতে প্রাথমিক, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও সমমানের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করা হবে। ডিজিটাল বৈষম্য কমাতে দেড় হাজার প্রতিষ্ঠানে (মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়) ফ্রি ওয়াই–ফাই সংযোগ এবং প্রতিটি শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের জন্য অনন্য ডিজিটাল পরিচয় বা ‘এডু–আইডি’ প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, মাধ্যমিক পর্যায়ে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি সবার জন্য কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার অঙ্গীকার করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে দেশের সব উপজেলায় টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ এবং সব জেলায় পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
বলা যায়, সরকার শিক্ষাখাতে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণসহ নানারকম প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের ধারণা, শিক্ষা কাঠামো অর্থাৎ শিক্ষকদের নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের গুণগত মান নিশ্চিত, অবকাঠামোগত মূল্যায়ন এবং পেশার মর্যাদা বাড়াতে টেকসই বিনিয়োগের অভাব রয়ে গেছে। ফলে দেশে এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে যেখানে সনদ আছে, দক্ষতা নেই। সরকারি উদ্যোগে শ্রেণীকক্ষে উপস্থিতি বেড়েছে, বেড়েছে পাসের হার। কিন্তু বিভিন্ন শিক্ষার্থী মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বারবার উঠে এসেছে যে অধিকাংশ শিক্ষার্থী প্রত্যাশিত দক্ষতা অর্জন করছে না। এসব ব্যর্থতার পেছনে পাঠ্যক্রম ও প্রযুক্তি উপকরণের অভাবকে একটি কারণ বলা হলেও মূল সমস্যা শ্রেণীকক্ষের সংস্কৃতিতে। শ্রেণীকক্ষগুলো বহুলাংশে দক্ষ শিক্ষকের অপেক্ষায়। ইউনেস্কোর সামপ্রতিক বিশ্ব শিক্ষা পরিসংখ্যান সেই সত্যটিকে সংখ্যার ভাষায় হাজির করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার সাতটি দেশের মধ্যে ন্যূনতম দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষকের হারে বাংলাদেশ সবার পেছনে। এক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় তুলনামূলক অনগ্রসর দেশগুলোর বিচারেও বাংলাদেশ পিছিয়ে। বিষয়টি মাধ্যমিক পর্যায়ের জন্য উদ্বেগজনক, কারণ এ স্তর উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীদের অভিগম্যতার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের দেশে একদিকে যেমন পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, অন্যদিকে যে শিক্ষকরা আছেন তাদের অনেকের মধ্যেও বাস্তব অভিজ্ঞতার ঘাটতি দেখা যায়। আরো পরিষ্কার করে বলা যায়, শিক্ষকদের দক্ষতা, আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিজিটাল জ্ঞানের ঘাটতি রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে একটি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে, সেটি হলো– শিক্ষকদের আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ নিশ্চিতে দেশী প্রশিক্ষকদের পাশাপাশি বিদেশী প্রশিক্ষকদের দেশে এনে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। বিশেষজ্ঞরা বলেন, শিক্ষা অবকাঠামোয় শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন স্তরে নানা ধরনের প্রশিক্ষণ চলমান রয়েছে। কিন্তু এসব প্রশিক্ষণের গুণগত মান আজও প্রশ্নবিদ্ধ। শিক্ষকদের অনেকেই আধুনিক পাঠদানের কৌশল, প্রযুক্তি উপকরণ ব্যবহারে পর্যাপ্ত দক্ষ এবং বিষয়ভিত্তিক দক্ষতায় পরিপূর্ণভাবে পারদর্শী হচ্ছেন না। মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ গ্রহণ না করায় শিক্ষকদের অনেকেই প্রশিক্ষণ শেষে শ্রেণীকক্ষে নতুন পদ্ধতি প্রয়োগ করতে পারেন না। প্রশিক্ষণ এখন অনেক ক্ষেত্রেই পেশাগত দক্ষতা অর্জনের পরিবর্তে একটি আনুষ্ঠানিক সনদ অর্জনের প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। তাই বিষয়ভিত্তিক, চলমান এবং শ্রেণীকক্ষে প্রয়োগযোগ্য প্রশিক্ষণ চালু করতে হবে। সরকারি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়ানো এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা প্রয়োজন। যেসব প্রতিষ্ঠান নামমাত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে সনদ প্রদান করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।










