ঢাকার পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় বিচার চেয়ে ক্ষোভ–বিক্ষোভের মধ্যে সারা দেশে শিশু সুরক্ষায় প্রতিরোধ ব্যবস্থা আরো জোরদারের তাগিদ এসেছে ইউনিসেফের তরফে। বাংলাদেশে জাতিসংঘ শিশু তহবিল–ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বলেছেন, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত শিশুদের বিরুদ্ধে নির্মম ও যৌন সহিংসতার ঘটনা যে হারে বেড়েছে তাতে সারা দেশে শিশু সুরক্ষায় প্রতিরোধ ব্যবস্থা আরো জোরদার করা অতি জরুরি হয়ে পড়েছে। গত ২৩ মে ‘শিশুদের ওপর বর্বরতা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে’ এমন আহ্বান জানিয়ে এক বিবৃতিতে তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, ২০২৬ সালে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে নির্মম ও যৌন সহিংসতার ঘটনা যে হারে বাড়ছে তাতে সারা দেশে দ্রুত শিশু সুরক্ষা ও জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ ব্যবস্থা আরো জোরদার করা অতি জরুরি হয়ে পড়েছে। অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। শিশুদের প্রতি যৌন সহিংসতার মতো অপরাধ বন্ধে ইউনিসেফের প্রতিনিধি বলেন, একই সঙ্গে প্রতিরোধ, অপরাধের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের, প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা, শিশুবান্ধব পুলিশ ও বিচারব্যবস্থা, কমিউনিটি সুরক্ষা এবং সামাজিক সেবাসমূহের মধ্যে বিদ্যমান ঘাটতিগুলো দূর করতে হবে। নারী ও শিশুদের জন্য মনোসামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্কুল, মাদ্রাসা, কর্মক্ষেত্র, পাড়ামহল্লা ও শিশুযত্ন কেন্দ্রগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আরো বাড়াতে হবে।
সমপ্রতি প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে জানা যায়, গত চার মাসে দেশে অন্তত ১১৮ জন কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং ১৭ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এটা খুবই উদ্বেগজনক তথ্য। অন্য একটি তথ্যে দেখা যাচ্ছে, গত পাঁচ বছরে দেশে দুই হাজারের বেশি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। শুধু ২০২৫ সালেই শত শত শিশুর ধর্ষণের তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে। গবেষক ও অধিকারকর্মীরা মনে করেন, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি; কারণ সামাজিক লজ্জা, ভয়, আপস–মীমাংসা এবং বিচারহীনতার কারণে বহু ঘটনা প্রকাশই পায় না। বিশ্লেষকদের কাছে প্রশ্ন হলো, কেন বাড়ছে এই ধরনের পাশবিকতা? এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গেলে অনেক কারণই আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়, যার বিশদ বিবরণ লিপিবদ্ধ করা এই স্বল্প পরিসরে সম্ভব নয়। তবে দেশব্যাপী শিশু ধর্ষণ এবং হত্যার পেছনে কতগুলো কারণকে সামগ্রিকভাবে দায়ী করা যায় বলে তাঁরা উল্লেখ করেছেন। এদের একটি হলো বিচারহীনতার দীর্ঘ ছায়া। তাঁরা বলেন, বাংলাদেশে বহু আলোচিত শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় বিচার দীর্ঘসূত্রতায় আটকে থাকে। কোনো কোনো ঘটনায় জনমতের চাপ না থাকলে তদন্তও শ্লথ হয়ে পড়ে। অপরাধীরা যখন দেখে যে প্রভাব, অর্থ কিংবা সামাজিক অথবা রাজনৈতিক ক্ষমতার কারণে পার পেয়ে যাওয়া সম্ভব, তখন ভয় কমে যায়। আইনের ভয় হারিয়ে গেলে অপরাধী আরও সাহসী হয়, আরও নির্মম হয়ে ওঠে। দ্বিতীয়ত, শিশুর নিরাপত্তা সম্পর্কে পারিবারিক ও সামাজিক অজ্ঞতা– আমাদের সমাজে এখনও শিশুদের ‘ভালো স্পর্শ’ ও ‘খারাপ স্পর্শ’ সম্পর্কে ধারণা দেওয়াটাকে অস্বস্তিকর বিষয় মনে করা হয়। ফলে শিশুরা বিপদ চিহ্নিত করতে পারে না, আবার নির্যাতনের শিকার হলেও ভয়ে বা লজ্জায় বলতে পারে না।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ধর্ষণেচ্ছা আর নেশা করা প্রায়শই পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত হলেও অর্থনৈতিকভাবে বিরাট পার্থক্য আছে। ধর্ষণেচ্ছার পেছনে টাকার হিসাব না থাকলেও, মাদক–প্রণোদিত ধর্ষণেচ্ছার সঙ্গে টাকার সম্পর্ক আছে। মাদক শুধু ব্যক্তিমানুষের নেশা জাগায় সেটা নয়, এটি কোটি কোটি টাকার ব্যবসা। এই ব্যবসার যারা অধিপতি, যারা এটির রক্ষাকর্তা, যারা এটাতে লগ্নি করে তারা আমাদের সমাজেরই লোক, কিন্তু তাদের গায়ে হাত দেওয়া যায় না। কারণ সবাই টাকার বশ। মাদক ব্যবসা তাই সমাজের দ্বিচারিতা প্রকাশ করে। আমরা বলি, মাদক বন্ধ হোক, কিন্তু কোটি কোটি টাকার যারা জিম্মাদারি নিয়েছে তাদের কথা হলো মাদক ব্যবসা চলুক। এ কারণে অনেক সময় টাকা ঢাললে প্রতিবিধানের রাস্তা পাখির পালকের মতো নম্র হয়ে যায়। এ কারণে এই কথাটি রামিসার বাবা হঠাৎ করে মেয়েকে হারানোর পর অন্তর্দৃষ্টি লাভ করে বলেছেন যে, ‘আপনারা বিচার করতে পারবেন না।’
বিশেষজ্ঞরা বলেন, এতো ঘটনা ঘটছে কিন্তু রাষ্ট্র দোষীদের আইনের আওতায় এনে দ্রুত বিচার করে সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করতে পারছে না। রাষ্ট্রকে শিশু ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের বিচার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মাত্র ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নিষ্পত্তি সুনিশ্চিত করতে হবে। সমাজের এই অবক্ষয় আর দুষ্ট ক্ষত নির্মূলে এবং মুলোৎপাঠনে এখনই মানবিকতা নৈতিকতা আইনের শাসন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠিত করা খুবই জরুরি।








