প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা আরো উন্নত, সহজলভ্য ও কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের আরো আন্তরিক হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তিনি। ২০ জুলাই বিকেলে সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি এসব নির্দেশনা দেন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, এই প্রথম কোনো প্রধানমন্ত্রী নিজে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অডিটরিয়ামে গিয়ে এ ধরনের বৈঠক করলেন। বৈঠকের শুরুতে বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর গত পাঁচ মাসে স্বাস্থ্য খাতের অর্জন সম্পর্কে জানতে চান প্রধানমন্ত্রী। এ সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এবং প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত বিভিন্ন বিষয় উপস্থাপন করেন। কর্মকর্তারা জানান, বিগত সরকারগুলো স্বাস্থ্য খাতকে একেবারে খাদের কিনারে নিয়ে গিয়েছিল। ফলে প্রান্তিক মানুষের যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল। সেই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য তারা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসকদের দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগের বিষয়টি বৈঠকে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসক থাকা সত্ত্বেও রোগীরা সন্তোষজনক চিকিৎসাসেবা পান না–এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দায়িত্বে অবহেলার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি। তারেক রহমান বলেন, ‘যেভাবেই হোক গ্রামের মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা সহজ করতে হবে। তাদের জন্য সন্তোষজনক চিকিৎসাসেবা এবং পর্যাপ্ত ওষুধ নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি হাসপাতালে গিয়ে যেন মানুষ বিনা ভোগান্তিতে সহজেই চিকিৎসাসেবা পায়। চিকিৎসার জন্য তাদের অন্য কোথাও যেতে না হয়। সরকারি হাসপাতালই যেন রোগীদের একমাত্র ভরসার জায়গা হয়।’
গ্রামীণ জনগণের দোরগোড়ায় উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে প্রধানমন্ত্রীর এ আহ্বান ও নির্দেশনা প্রশংসনীয়। বাংলাদেশে সবার জন্য সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সংস্কারে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও অঙ্গীকার প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্ব স্বাস্থ্যের তথ্য অনুসারে বাংলাদেশের ৪২ শতাংশ মানুষ এখনো সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার বাইরে, যা ২০৩০ সালে ১৮–২২ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব বলে পূর্বাভাস দিয়েছে ডব্লিউএইচও। সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে ভারত। দেশটির প্রায় ৬৮ শতাংশ মানুষ সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় এসেছে। এছাড়া পাকিস্তানের ৫১, নেপালের ৫৯, মালদ্বীপ ও ভুটানের ৬৫ শতাংশ মানুষ এ সেবা পাচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এসব দেশের মানুষ ৭৫–৯৫ শতাংশ পর্যন্ত সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা পেতে পারে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। দেশের সব মানুষের জন্য সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে সরকারকে যথাযথ উদ্যোগ ও কর্মপরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তাঁরা।
তবে সামপ্রতিক এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, বর্তমান স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা কেবল চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতায় থেমে নেই; এটি সরাসরি দারিদ্র্য, বৈষম্য ও সামাজিক অনিশ্চয়তাকে গভীর করছে। স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় যখন সরাসরি মানুষের পকেট থেকে আসে, তখন সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা বাস্তবে অর্থহীন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে ব্যক্তিগত ব্যয়ের হার দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগজনকভাবে বেশি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সেবা প্রতিষ্ঠানের সীমিত প্রস্তুতি, মানবসম্পদের ঘাটতি ও সেবার মান নিয়ে অনিশ্চয়তা। দেশের প্রায় অর্ধেক স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় সেবা দিতে প্রস্তুত নয়–এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যর্থতা নয়, বরং দীর্ঘদিনের ব্যবস্থাগত অবহেলার ফল। স্বাস্থ্যকর্মীর সংকটই এ সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্বমান অনুযায়ী, প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য যেখানে ৪৪ জনের বেশি স্বাস্থ্যকর্মী প্রয়োজন, সেখানে বাংলাদেশে আছে মাত্র ৮ জনের কিছু বেশি। এই ঘাটতি কেবল সংখ্যার নয়; দক্ষতা, প্রশিক্ষণ ও সুষম বণ্টনের অভাবও এতে যুক্ত। গ্রাম ও শহরের বৈষম্য, সরকারি ও বেসরকারি খাতের অসামঞ্জস্য এবং শূন্য পদের দীর্ঘদিনের অবহেলা মিলিয়ে স্বাস্থ্য খাত কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, উন্নতির পরিসংখ্যান তখনই অর্থবহ, যখন তা বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় এবং নাগরিকের আস্থাকে শক্তিশালী করে। সবর্জনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা এবং প্রতিষ্ঠানকেও এগিয়ে আসতে হবে।








