প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধিতে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে। বলা চলে, দেশে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহে ঢল নেমেছে। এই প্রবাসী আয় নিয়ে আমাদের অর্থনীতিবিদরাও আশাবাদী। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসের ৮ দিনে দেশে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স এসেছে ৯০ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় ১১ হাজার ১১৯ কোটি ২০ হাজার টাকা (প্রতি ডলার ১২৩ টাকা হিসাবে)। ৯ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ তথ্য জানিয়েছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম ৮ দিনে রেমিট্যান্স এসেছিল ৮৮ কোটি ১০ লাখ ডলার। সেই তুলনায় চলতি বছরের একই সময়ে রেমিট্যান্স বেড়েছে দুই দশমিক ৭০ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ৬৭৩ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে ৫৭৮ কোটি ডলার প্রবাসী আয় এসেছিল। সেই তুলনায় চলতি বছরের একই সময়ে রেমিট্যান্স বেড়েছে ১৬ দশমিক ৪০ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ শুধু একটি পরিবারের আয় নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি রেমিট্যান্সই বৈদেশিক মুদ্রার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎসগুলোর একটি। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রেমিট্যান্স গ্রহণকারী দেশের কাতারে রয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, কোভিড–পরবর্তী সংকট কিংবা ডলারের চাপের সময়ও এই অর্থ দেশের অর্থনীতিকে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দিয়েছে।
বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকাংশই নিম্ন ও মধ্যম দক্ষতার পেশায় নিয়োজিত। নির্মাণ, গৃহপরিচর্যা, কৃষি কিংবা স্বল্প মজুরির শিল্পখাতে তাঁদের কর্মসংস্থান বেশি। ফলে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে সামান্য পরিবর্তন, ভিসানীতির কড়াকড়ি, তেলের দামের পতন বা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা সরাসরি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থাৎ রেমিট্যান্স আমাদের শক্তি, আবার একই সঙ্গে এটি একটি কৌশলগত ঝুঁকিও। অর্থনীতির আরেকটি বাস্তবতা হলো, রেমিট্যান্সের বড় অংশ ভোগব্যয়ে ব্যবহৃত হয়। নতুন বাড়ি নির্মাণ, জমি কেনা কিংবা দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে এই অর্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও উৎপাদনশীল বিনিয়োগের হার এখনো সন্তোষজনক নয়। অথচ এই অর্থের একটি অংশ যদি ক্ষুদ্র শিল্প, কৃষি–প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ কিংবা স্টার্টআপে বিনিয়োগ হতো, তাহলে তা কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও টেকসই করতে পারত।
প্রবাসী আয়ের আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো, এটি দারিদ্র্য কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের বহু জেলায় এমন পরিবার রয়েছে, যাদের শিক্ষার সুযোগ, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা সামাজিক অবস্থানের পরিবর্তনের পেছনে প্রধান অবদান একজন প্রবাসী সদস্যের। কিন্তু এই অর্জনের বিপরীতে রয়েছে হাজারো না–বলা গল্প– অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, দালালের প্রতারণা, বিদেশে শ্রম অধিকার লঙ্ঘন এবং দেশে ফিরে পুনর্বাসনের অনিশ্চয়তা। অর্থনীতির হিসাবের খাতায় এই মানবিক মূল্য খুব কমই দৃশ্যমান হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘জনশক্তি রফতানি ও প্রবাসী আয় বাড়াতে সবার আগে দক্ষ কর্মী গড়ে তুলতে হবে। এরপর মাইগ্রেশন ডিপ্লমেসি বাড়ানোর মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি করতে হবে। একই সঙ্গে আমরা এখনও ইউরোপের শ্রমবাজারে পিছিয়ে আছি, ওই বড় বাজারটি ধরার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া দরকার। ইউরোপের দেশগুলোতে এখনও অবৈধ পথে বা ভিন্ন কোনো দেশে আগে গিয়ে তার পর ইতালি, স্পেন বা ফ্রান্সের মতো দেশগুলোতে যাচ্ছে। এভাবে না গিয়ে বৈধপথে ইউরোপের বাজারে দক্ষ কর্মী পাঠাতে হবে। অল্প শ্রমে বেশি অর্থ উপার্জন করা যাবেু এমন কর্মী পাঠাতে হবে। মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের দেশগুলোতে অনেক চিকিৎসকের চাহিদা রয়েছে, নার্সের চাহিদা রয়েছে। এর বাইরেও কারিগরিভাবে দক্ষ কর্মীরও ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এ ধরনের কর্মী বেশি বেশি যাতে পাঠানো যায় সে ব্যবস্থা করতে হবে।’
তাঁদের মতে, আমাদের অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে জনসংখ্যা রফতানি নিশ্চিত বিনিয়োগ হিসাবে বিবেচিত। শুধু নিশ্চিত বিনিয়োগ নয়, নিরাপদ বিনিয়োগ হিসাবেও জনসংখ্যা রফতানিকে বিবেচনা করা যায়। রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোর ক্ষেত্রে জনসংখ্যা রফতানির যেমন প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে, তেমনি বিদেশে কর্মরত জনশক্তির পারিশ্রমিক যাতে কাজ ও দক্ষতা অনুযায়ী নির্ধারিত হয়, সেজন্যেও সরকারকে উদ্যোগী ভূমিকা রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, জনসংখ্যা রফতানি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সরকার যদি কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি করে, তাহলে জনসংখ্যা রফতানির সুফল ও রেমিট্যান্স প্রবাহ আমাদের অর্থনীতির ইতিবাচক খাতের সঙ্গে একই ধারায় প্রবাহিত হবে।







