প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যে সামপ্রতিক অস্থিরতার পরিপ্রেক্ষিতে বিকল্প শ্রম বাজারের সন্ধানে সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে নরসিংদী–৫ আসনের সংসদ সদস্য মো. আশরাফ উদ্দিনের তারকা চিহ্নিত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ যেমন সার্বিয়া, গ্রীস, নর্থ মেসিডোনিয়া, রোমানিয়া, পর্তুগাল, ব্রাজিল, রাশিয়া ইত্যাদি নতুন দেশসমূহে বিকল্প শ্রমবাজার সমপ্রসারণে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে উচ্চ পর্যায়ের সফরের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ দূতাবাসসমূহকে শ্রমবাজার অনুসন্ধান এবং বাংলাদেশী কর্মীদের পেশাভিত্তিক চাহিদা নিরূপণের জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এছাড়া বিদেশে বাংলাদেশ মিশনের সুপারিশ অনুযায়ী প্রয়োজন অনুসারে দেশভিত্তিক স্থানীয় লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ করা হচ্ছে। মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার উন্মুক্তকরণের কাজ চলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, থ্যাইল্যান্ডে শ্রমবাজার খোলার বিষয়ে সে দেশে কর্মী নিয়োগ সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। জাপানে বাংলাদেশী কর্মীদের ব্যাপক চাহিদা থাকায় সে দেশে কর্মী পাঠানোর হার বাড়াতে জাপানিজ ভাষা ও স্কিল ট্রেনিংয়ের পরিধি বাড়ানো হয়েছে। ৫৩টি টিটিসিতে জাপানিজ ভাষা প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। তাছাড়া, জাপানিজসহ রাশিয়া, আরবি, জার্মান, ইতালিয়ান ভাষার প্রশিক্ষক নিয়োগ কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন ভাষার ৪১ জন প্রশিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদেশ থেকে ফেরত আসা কর্মীদের আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী পুনঃপ্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে পুনরায় বিদেশে পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এছাড়া, পূর্ববর্তী শিক্ষা ও কাজের স্বীকৃতি এবং তার সনদ প্রদান করা হচ্ছে।
এদিকে, প্রয়োজন অনুযায়ী বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য পুনরায় শ্রম বাজার খোলার বিষয়ে রাজি হয়েছে মালয়েশিয়া। ৯ এপ্রিল পুত্রজায়ায় বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া সরকারের মধ্যে শ্রম অভিবাসন নিয়ে এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উভয় পক্ষ দ্রুত সময়ের মধ্যে শ্রম বাজার খোলার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। প্রতিনিধিদলের বৈঠকের পর মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় এক যৌথ বিবৃতিতে জানায়, উভয় পক্ষ একটি স্বচ্ছ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বাস্তবসম্মত কাঠামোর মাধ্যমে সহযোগিতা জোরদার করার বিষয়ে তাদের যৌথ অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন, যা বিদ্যমান নিয়োগ সংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতাগুলো মোকাবিলার পাশাপাশি নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও নিয়মিত অভিবাসন নিশ্চিত করবে। উভয় পক্ষ মালয়েশিয়ার খাতভিত্তিক চাহিদার ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য শ্রম বাজার পুনরায় খোলার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে এবং একটি ন্যায্য, নৈতিক ও স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে সম্মত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মধ্যস্থতাকারী ও অভিবাসন খরচ কমানোর জন্য কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করা, বিশ্বাসযোগ্য ও যোগ্য নিয়োগকারী সংস্থা ব্যবহার করা এবং অবশিষ্ট আটকে পড়া শ্রমিকদের নিয়োগ দ্রুত সহজতর করার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো রেমিটেন্স। বর্তমানে প্রায় ৭০ লক্ষ প্রবাসী শ্রমিকের হাড়ভাঙা খাটুনির টাকায় সচল রয়েছে দেশের অর্থনৈতিক চাকা। কিন্তু সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান সামরিক সংঘাত এই স্থিতিশীলতাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের অর্থনীতি বড় ধরনের বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে পারে। সংঘাতের জেরে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনসহ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দিয়েছে। ছুটিতে দেশে আসা হাজার হাজার প্রবাসী এখন কর্মস্থলে ফেরা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ পর্যায়ে থাকলেও কোম্পানি মেয়াদ বাড়াচ্ছে না, যা তাদের জীবিকাকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স ও তৈরি পোশাক শিল্পের রপ্তানি আয় বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান দুই চালিকাশক্তি। বৈশ্বিক মন্দা বা অর্থনৈতিক অস্থিরতার সময়ও দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে রেমিট্যান্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ২০২৫ সালে দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ৩২.৮ বিলিয়ন ডলার, যা অন্য যেকোনো বছরের চেয়ে বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলেন, যদি দীর্ঘমেয়াদি হয়, তাহলে শ্রমবাজারে বড় ধরনের বিরূপ প্রভাব পড়বে। আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা থাকবে, কাজও থাকবে না। তাই বিশেষজ্ঞরা নতুন শ্রমবাজারে মনোনিবেশ করতে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁরা বলেন, যাতে একটি অঞ্চল ঝুঁকিতে পড়লে দেশের শ্রমবাজারে কোনো প্রভাব না পড়ে। বিশেষ করে মালয়েশিয়া, জাপান, কোরিয়া ও ইউরোপের শ্রমবাজার কিভাবে ধরা যায়, সে ব্যাপারে সরকারকে কাজ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীও বিকল্প শ্রম বাজারের সন্ধানে সরকারের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। আশা করি, এক্ষেত্রে সফলতা আসবে।









