টানা তৃতীয় নারী সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জয়ের অভিযানে নেপালকে কাঁদিয়ে ফাইনালে উঠেছে বাংলাদেশ। গোয়ার জওহরলাল নেহেরু স্টেডিয়ামে গতকাল বুধবার নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম সেমি ফাইনালে বাংলাদেশ ২–১ গোলে নেপালকে পরাজিত করে। যোগ করা সময়ে দারুণ নৈপুণ্যে এগিয়ে যাওয়া শামসুন্নাহার জুনিয়র বল বাড়ান গোলমুখে। সে বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে উল্টো নিজেদের জালে বল জড়িয়ে দেন নেপালের মিডফিল্ডার প্রীতি রায়। আর তাতেই উল্লাসে মেতে উঠে বাংলাদেশ দল। সাফের গত দুই ফাইনালে নেপালকে তাদের মাঠে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল বাংলাদেশ। ২০২৪ সালের ফাইনালের স্কোর লাইনের পুনরাবৃত্তি হয় গোয়ার সেমি ফাইনালে।
গতকাল তিন পরিবর্তন এনে একাদশ সাজান বাংলাদেশ কোচ বাটলার। ভারত ম্যাচে খেলা মনিকা চাকমা, শামসুন্নাহার জুনিয়র ও সুরমা জান্নাতের বদলে খেলান আফঈদা খন্দকার, উমহেলা মারমা ও সুরভি আকন্দ প্রীতি। আগের দিন মা হারানো অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার শিউলি আজমিকেও রাখেন বেঞ্চে। শুরু থেকেই অগোছালো ফুটবল খেলতে থাকে বাংলাদেশ। মারিয়ার পাসগুলো নিখুঁত হচ্ছিল না। রক্ষণও ছিল না জমাট। গতবারের রানার্সআপ নেপাল তাই আধিপত্য বিস্তার করতে থাকে। ২২তম মিনিটে এগিয়েও যায় তারা। নেপালের কর্নারের পর কিপার মিলি আক্তার দুর্বল ফিস্টে ক্লিয়ার করতে পারেননি পুরোপুরি। বক্সে জটলার ভেতরে বল পেয়ে গীতা রানী চিপ শটে লক্ষ্যভেদ করেন।
পরের মিনিটেই পাল্টা আক্রমণে নেপালের রক্ষণে ভীতি ছড়ায় বাংলাদেশ, কিন্তু প্রতিপক্ষ গোলরক্ষকের পরীক্ষা নিতে পারেনি তারা। ৩৪তম মিনিটে রাসি কুমারি ঘিসিংয়ের হেড আটকে ব্যবধান দ্বিগুণ হতে দেননি মিলি আক্তার। একটু পর প্রীতি রায়ের শটে লাফিয়ে কোনোমতে বলে হাত ছোঁয়ান মিলি, তার গ্লাভস ছুঁয়ে বল ক্রসবারে লাগে। কখনও এলোমেলো, কখনও তাড়াহুড়ো করে পাস বাড়ানোয় ম্যাচের লাগাম মুঠোয় নিতে পারছিল না বাংলাদেশ। রাইট ব্যাক কোহাতি কিসকু প্রায়ই তালগোল পাকিয়ে নেপালের জন্য খুলে দিচ্ছিলেন আক্রমণের দুয়ার।
খেলায় ধার ফেরাতে বাটলার দুটি পরিবর্তন আনেন ৩৮তম মিনিটে। তরুণ উমহেলা ও প্রীতিকে তুলে দুটি নারী সাফ জয়ী শামসুন্নাহার জুনিয়র ও তহুরা খাতুনকে নামান কোচ। এরপর বাংলাদেশের খেলায় গতি ফিরে। ৪৫তম মিনিটে দৃষ্টিনন্দন গোলে দলে স্বস্তি ফেরান সবশেষ ফাইনালে জয়সূচক গোল করা ঋতুপর্ণা। ডান দিক থেকে এই ফরোয়ার্ডের কর্নারে বল বাতাসে ভেসে লাফিয়ে ওঠা গোলকিপার আঞ্জিলা সুব্বাকে ফাঁকি দিয়ে সরাসরি দূরের পোস্ট লেগে জালে জড়ায়।
মোমিতা খাতুনের জায়গায় মনিকাকে নামিয়ে দ্বিতীয়ার্ধ শুরু করে বাংলাদেশ। শুরুতেই পোস্টের বাধায় বেঁচে যায় দল। রেখা পাডৌলের শট পোস্ট ছেড়ে বেরিয়ে আসা মিলিকে ফাঁকি দিলেও পোস্টে লেগে ফিরে। একটু পর রাশমি কুমারির শট যায় ক্রসবারের ওপর দিয়ে। ৫৪তম মিনিটে শামসুন্নাহার জুনিয়র ডান দিক দিয়ে বক্সে ঢুকে যখন বাইরে শট নেন, তখন দূরের পোস্টে ফাঁকায় দাঁড়িয়েছিলেন গত সাফে দলের হয়ে সর্বোচ্চ পাঁচ গোল করা তহুরা। একটু পর ছোট বক্সের একটু ওপর থেকে মনিকার হেড যায় ক্রসবারের অনেক উপর দিয়ে। ৬৮তম মিনিটে সারু লিম্বুর শট লাফিয়ে ওঠা মিলিকে পেরিয়ে ওপরের জাল কাঁপায়। একটু পর আনিকা রানিয়া সিদ্দিকীকে তুলে সাগরিকাকে নামান বাংলাদেশ কোচ।
নির্ধারিত সময়ের দুই মিনিট বাকি থাকতে আফঈদা ইশারায় পানি চাইলেন। তাতে খেলা বন্ধ করতে বাধ্য হলেন রেফারি। এই সুযোগে পানি পান করে নেন দুই দলের আরও অনেকে। এরপরই আক্রমণে ওঠা নেপালের আক্রমণ কর্নারের বিনিময়ে ক্লিয়ার করেন কোহাতি। ছয় মিনিটের যোগ করা সময়ের শুরুতে বাম দিক থেকে সতীর্থের বাড়ানো বল ধরে শামসুন্নাহার জুনিয়র বক্সে ঢুকে পড়েন দারুণ ক্ষিপ্রতায়। ঠাণ্ডা মাথায় তিনি বল বাড়ান গোলমুখে। ওখানে ছিলেন সাগরিকা, তবে বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে তা জালে পাঠিয়ে দেন প্রীতি। প্রথমবারের মতো এগিয়ে যাওয়ার উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠে বাংলাদেশ।
প্রথম দেখায় সাগরিকাই গোল করেছেন বলে মনে হলেও পরে সাফের অফিশিয়াল ম্যাচ রিপোর্টে তা প্রীতি রাইয়ের আত্মঘাতী দেখানো হয়েছে। এ গোলের একটু পরই মাঠে শুয়ে পড়েন কোহাতি। স্ট্রেচারে করে মাঠ ছাড়েন বাংলাদেশের এই ডিফেন্ডার। খেলা শুরু হলে নেপালের নিশা থোকারের শট গ্লাভসে জমান মিলি। একটু পর শেষের বাঁশি বাজলে ফাইনালে ওঠার আনন্দে মেতে ওঠে মেয়েরা। এ নিয়ে চতুর্থবারের মতো ফাইনালে উঠে বাংলাদেশ। সর্বোচ্চ ছয়বার ফাইনাল খেলেও শিরোপা স্বাদ না পাওয়া নেপালের অপেক্ষা বাড়ল আরও।
দুই দলের মুখোমুখিতে নেপালের সমান ৬টি জয় পেল বাংলাদেশ। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ১৪ ম্যাচে দুই দলের বাকি ২টি ম্যাচ ড্র হয়েছে। গতকালের সেমিফাইনালে ম্যাচ সেরা হয়েছেন ঋতুপর্ণা। ৬ জুনের ফাইনালে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ হবে ভারত–ভুটান দ্বিতীয় সেমি ফাইনালের জয়ী দল।











