অরোরা

মহাকাশ ও পৃথিবীর অপূর্ব আলোকখেলা

অনিক শুভ | বুধবার , ২২ জুলাই, ২০২৬ at ৭:২৭ পূর্বাহ্ণ

রাতের আকাশে হঠাৎ সবুজ, বেগুনি, গোলাপি কিংবা লাল আলোর ঢেউ দেখা গেলে অনেকেরই মনে হতে পারে এটি কোনো বিজ্ঞান কল্পকাহিনির দৃশ্য। কিন্তু বাস্তবে এটি প্রকৃতির এক অসাধারণ সৃষ্টি, যার নাম অরোরা। পৃথিবীর মেরু অঞ্চলের আকাশে দেখা যাওয়া এই আলোকচ্ছটা যুগ যুগ ধরে মানুষের কৌতূহল, বিস্ময় ও গবেষণার বিষয় হয়ে আছে। উত্তর গোলার্ধে এটি অরোরা বোরিয়ালিস বা নর্দার্ন লাইটস নামে পরিচিত, আর দক্ষিণ গোলার্ধে এর নাম অরোরা অস্ট্রালিস বা সাউদার্ন লাইটস।

অরোরা’ শব্দটি এসেছে রোমান পুরাণের ভোরের দেবী অরোরাএর নাম থেকে। ১৬১৯ সালে ইতালীয় বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলেই প্রথম এই নাম ব্যবহার করেন। যদিও সে সময় মানুষ অরোরার প্রকৃত কারণ জানত না, তবুও এর সৌন্দর্য সবাইকে মুগ্ধ করত।

অরোরার সৃষ্টি হয় সূর্য, মহাকাশ এবং পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের পারস্পরিক ক্রিয়ার ফলে। সূর্য থেকে প্রতিনিয়ত বিপুল পরিমাণ চার্জযুক্ত কণা বা সোলার উইন্ড মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। এসব কণা পৃথিবীর দিকে এলে আমাদের গ্রহের চৌম্বক ক্ষেত্র বা ম্যাগনেটোস্ফিয়ার অধিকাংশ কণাকে প্রতিহত করে। তবে কিছু কণা মেরু অঞ্চলের দিকে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়। সেখানে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে থাকা অক্সিজেন ও নাইট্রোজেন পরমাণুর সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে শক্তি নির্গত হয় এবং সৃষ্টি হয় রঙিন আলোর ঝলকানি।

অরোরার রঙ নির্ভর করে কোন গ্যাসের সঙ্গে সংঘর্ষ হচ্ছে এবং সেটি কত উচ্চতায় ঘটছে তার ওপর। প্রায় ১০০ থেকে ২৫০ কিলোমিটার উচ্চতায় অক্সিজেনের সঙ্গে সংঘর্ষে সাধারণত উজ্জ্বল সবুজ রঙ দেখা যায়, যা অরোরার সবচেয়ে পরিচিত রঙ। আরও বেশি উচ্চতায় অক্সিজেনের কারণে লাল আভা তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে নাইট্রোজেন থেকে নীল, বেগুনি কিংবা গোলাপি রঙের আলো সৃষ্টি হয়। এ কারণেই কখনো কখনো আকাশজুড়ে একাধিক রঙের সমন্বয়ে অসাধারণ দৃশ্য দেখা যায়।

অরোরা সবসময় দেখা যায় না। এর তীব্রতা অনেকাংশে নির্ভর করে সূর্যের কার্যকলাপের ওপর। সূর্যের প্রায় ১১ বছরের একটি চক্র রয়েছে, যাকে সোলার সাইকেল বলা হয়। এই চক্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে সূর্যে বেশি সংখ্যক সানস্পট, সৌর ঝড় এবং করোনাল মাস ইজেকশন দেখা যায়। তখন পৃথিবীতে অরোরার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়। শক্তিশালী সৌর ঝড়ের সময় কখনো কখনো অরোরা মেরু অঞ্চল ছাড়িয়ে তুলনামূলক নিম্ন অক্ষাংশ থেকেও দেখা যায়।

অরোরা দেখার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ পর্যটকদের কাছে বিশেষভাবে জনপ্রিয়। নরওয়ে, আইসল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, সুইডেন, কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা অঞ্চল নর্দার্ন লাইটস দেখার জন্য বিখ্যাত। অন্যদিকে দক্ষিণ গোলার্ধে অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়া, নিউজিল্যান্ডের দক্ষিণ দ্বীপ এবং অ্যান্টার্কটিকার কিছু অঞ্চল থেকে অরোরা অস্ট্রালিস দেখা যায়। তাসমানিয়ার দক্ষিণ উপকূল, বিশেষ করে পরিষ্কার ও অন্ধকার আকাশের এলাকাগুলো অরোরা পর্যবেক্ষণের জন্য বেশ জনপ্রিয়।

বিজ্ঞানীদের কাছে অরোরা শুধু সুন্দরের বিষয় নয়; এটি মহাকাশ আবহাওয়া সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও দেয়। সৌর ঝড়ের প্রভাব কখনো কখনো স্যাটেলাইট যোগাযোগ, জিপিএস ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং রেডিও যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটাতে পারে। তাই অরোরা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা সূর্যের কার্যকলাপ এবং পৃথিবীর প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা পান।

অরোরাকে ঘিরে বিভিন্ন সংস্কৃতিতে নানা বিশ্বাস ও কিংবদন্তি রয়েছে। নর্স পুরাণে এটি দেবতাদের জগতের প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হতো। কানাডা ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ার কিছু আদিবাসী জনগোষ্ঠী বিশ্বাস করত, আকাশে নাচতে থাকা এই আলোগুলো পূর্বপুরুষদের আত্মার উপস্থিতির চিহ্ন। যদিও আধুনিক বিজ্ঞান এর প্রকৃত ব্যাখ্যা দিয়েছে, তবুও অরোরার রহস্যময়তা এখনো মানুষের কল্পনাকে স্পর্শ করে।

অরোরা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা শুধু একটি গ্রহের বাসিন্দা নই; বরং একটি বিশাল মহাজাগতিক ব্যবস্থার অংশ। সূর্য থেকে শুরু হওয়া শক্তির যাত্রা পৃথিবীর আকাশে এসে রঙিন আলোর নৃত্যে পরিণত হয়। বিজ্ঞান, সৌন্দর্য এবং বিস্ময়ের এই অনন্য সমন্বয়ই অরোরাকে পৃথিবীর অন্যতম আকর্ষণীয় প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। জীবনে একবার হলেও নিজের চোখে অরোরা দেখার স্বপ্ন তাই আজও কোটি মানুষের হৃদয়ে জ্বলজ্বল করে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধঐ বুঝি এলো ঢল
পরবর্তী নিবন্ধকাপ্তাই রাস্তার মাথা এলাকায় ফুলেল ফুড প্রোডাক্টাসকে দেড় লাখ টাকা জরিমানা