পহেলা বৈশাখ : বাঙালি সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত সর্বজনীন উৎসব

| মঙ্গলবার , ১৪ এপ্রিল, ২০২৬ at ৫:৪২ পূর্বাহ্ণ

আজ পহেলা বৈশাখ। ১৪৩২ সনকে বিদায় জানিয়ে বাংলা বর্ষপঞ্জিতে আজ যুক্ত হচ্ছে নতুন একটি বছর ১৪৩৩। বাঙালি সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত এক সর্বজনীন প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। সামাজিক ও লোক উৎসবের এই দিনটি বর্তমানে একটি সাংস্কৃতিক দিবসে রূপ নিয়েছে। নববর্ষ বাঙালির মননের প্রতীক, বাঙালির চৈতন্যলোকে অনিন্দ্য সত্তার বাতিঘর।

মনকে রাঙিয়ে দিতে পারে নতুন দিনের নতুন স্বপ্ন। এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে আমাদের প্রত্যাশা আর সম্ভাবনাকে। স্বাভাবিকভাবেই আমাদের প্রথম স্বপ্ন হলো অসামপ্রদায়িক চেতনায় গড়ে ওঠা নতুন বিশ্বসোনার বাংলাদেশ। আমাদের আরো উৎসব আছে। এর মধ্যে কিছু ধর্মীয় উৎসব আর কিছু ঋতু উৎসব। কিন্তু বাংলা নববর্ষ উৎসব বাংলাদেশের সব ধর্ম ও সমপ্রদায়ের মানুষের মহান উৎসব। সর্বজনীন উৎসব। বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ আমাদের জাতীয় উৎসব।

ইতিহাস পর্যালোচনা করে জানা যায়, কৃষিকাজ ও খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য বাংলা সন গণনার শুরু মোঘল সম্রাট আকবরের সময়ে। হিজরি চন্দ্র সন ও বাংলা সৌর সনের ওপর ভিত্তি করে প্রবর্তিত হয় নতুন এই বাংলা সন। ১৫৫৬ সালে কার্যকর হওয়া বাংলা সন প্রথমদিকে পরিচিত ছিল ফসলি সন নামে, পরে তা পরিচিত হয় বঙ্গাব্দ নামে। কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সমাজের সঙ্গে বাংলাবর্ষের ইতিহাস জড়িয়ে থাকলেও এর সঙ্গে রাজনৈতিক ইতিহাসেরও সংযোগ ঘটেছে। পাকিস্তান শাসনামলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয় বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের। পূর্ব বাংলায় আধুনিক ধারার নববর্ষ চালু হয়েছে ১৯৫০এর দশকের প্রথম দিকে। যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার আমলে পূর্ববাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক বাংলা নববর্ষে ছুটি ঘোষণা করেন। সেই সময় থেকে ঢাকাসহ পূর্ববাংলার বিভিন্ন শহরে নববর্ষ উৎসব চালু হয়। আর ষাটের দশকের শেষে তা বিশেষ মাত্রা পায় রমনা বটমূলে ছায়ানটের আয়োজনের মাধ্যমে। কিন্তু পাকিস্তানী শাসকের কাছে এটি রোষাণলে পড়ে। তখন পহেলা বৈশাখ উদযাপন নিষিদ্ধ করা হয়। সরকারি ছুটি বাতিল করা হয়। বাঙালির অমিত শক্তির সামনে সেই অবদমন ধোপে টেকেনি। বাঙালির স্বাধীনতা অর্জন তার অমিত শক্তির বিশেষ দিক। এই দিক বাঙালির সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যে আন্তর্জাতিক বিশ্বের সীমান্ত অতিক্রম করেছে। বৃহত্তর সামাজিক পাটাতনের পরিসর বাড়িয়েছে। সৃষ্টি করেছে উদ্যম ও ব্যাপ্তিতে জাতিসত্তার বলয়।

দেশ স্বাধীনের পর বাঙালির অসামপ্রদায়িক চেতনার প্রতীকে পরিণত হয় বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। স্বাধীনতার পর আমাদের জনজীবনে বাংলা নববর্ষ নবতর জাতীয় চেতনার সঞ্চার করে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতার মধ্যেও বিশেষ উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে উদযাপিত হয় বাংলা নববর্ষ। উৎসবের পাশাপাশি স্বৈরাচারঅপশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদও এসেছে পহেলা বৈশাখের আয়োজনে। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে বের হয় প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা। ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর ইউনেস্কো এ শোভাযাত্রাকে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মর্যাদা দেয়। বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে নববর্ষ উদযাপন পরিণত হয়েছে বাংলাদেশের সর্বজনীন উৎসবে।

পহেলা বৈশাখ বাঙালি সংস্কৃতির প্রধান উৎসব। লোকসাহিত্য বিজ্ঞানী অধ্যাপক শামসুজ্জামান খানের মতে, ‘বাংলা নববর্ষে মহামিলনের আনন্দ উৎসব থেকেই বাঙালি ধর্মান্ধ অপশক্তির কূট ষড়যন্ত্রের জাল ভেদ করবার আর কুসংস্কার ও কূপমণ্ডুকতার বিরুদ্ধে লড়াই করবার অনুপ্রেরণা পায় এবং জাতি হয় ঐক্যবদ্ধ।’

বাঙালির ঘরে ঘরে এ দিন উৎসবের ছোঁয়া লাগে। পরস্পরের মঙ্গল কামনা এ দিনের সামাজিকতার অঙ্গ। দোকানি ও ব্যবসায়ীরা খোলে হালখাতা। নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়ে পহেলা বৈশাখের ভোর থেকে শহরাঞ্চলে শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এ দিনের প্রধান আকর্ষণ বৈশাখী মেলা, যা বাঙালির লোকজ সংস্কৃতির ধারক। সর্বোপরি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র ও আঞ্চলিকতার ক্ষুদ্র সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে শুভ ও মঙ্গল কামনার মধ্য দিয়ে মানব স্বীকৃতিই পহেলা বৈশাখের মূল কথা। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বাঙালির নববর্ষ ভিন্নমাত্রা লাভ করেছে। বিশ্বের অনেক দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ এই উৎসব সম্পর্কে জানে এবং আগ্রহ ভরে অংশ নেয়। এর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও অসামপ্রদায়িক চেতনা মানুষকে আকৃষ্ট করে। বাঙালির প্রাণের এই উৎসব মূলত বাঙালির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও জাতিসত্তার প্রতীকী উপস্থাপনা। অতীতের ভুলত্রুটি ও ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে নতুন করে সুখশান্তি ও সমৃদ্ধি কামনায় উদযাপিত হোক বছরের প্রথম দিন। শুভ নববর্ষ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে