চকরিয়ায় বনভূমি দখল হয়ে যাচ্ছে। এরকম একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে দৈনিক আজাদীতে গত ২০ মে। এতে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়ক লাগোয়া কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগের চকরিয়ার ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জের কাছে ডুলাহাজারা বনবিটের নিয়ন্ত্রণাধীন মালুমঘাট হাসিনা পাড়ার সামনে সংরক্ষিত বনভূমি দখল করা হচ্ছে। নারী–পুরুষের সমন্বয়ে শতাধিক সশস্ত্র সন্ত্রাসীকে পাহারায় বসিয়ে সংরক্ষিত বনের বিপুল পরিমাণ জায়গা দখলে নেওয়ার পর সেখানে রাতারাতি গড়ে তোলা হচ্ছে অবৈধ স্থাপনা বা বসতি। শুধু তাই নয়, দখলে নেওয়া সংরক্ষিত বনভূমিতে আছে শতবর্ষী কয়েকশ মাদার ট্রি (গর্জন)। এসব গাছের গোড়ার ছাল অপসারণ করা হয়েছে, যাতে গাছগুলো ধীরে ধীরে মরে যায়। একসময় সেসব গাছ ভেঙে পড়লে সেই জায়গারও নিয়ন্ত্রণ নেবে ওরা। বনবিভাগ জানায়, একই স্থানে নির্মিত অন্তত ১০টি অবৈধ বসতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় সমপ্রতি উচ্ছেদ করতে গেলে বনবিভাগের কর্মকর্তা–কর্মচারীরা হামলার শিকার হন। স্থানীয়রা জানান, বনবিভাগ এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে চলে যাওয়ার পর আবারও বনভূমি দখলে নিয়ে সেখানে গড়ে তোলা হচ্ছে স্থাপনা।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি দলের রাজনীতিতে যুক্ত একটি সিন্ডিকেট এসব অপকর্ম করছে। সংরক্ষিত বনভূমি দখলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত এবং সাংগঠনিক কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয়রা।
পরিবেশবিদদের মতে, একটি দেশের মোট এলাকার ২৫ শতাংশ এলাকায় বনভূমি থাকা দরকার। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় কী পরিমাণ বনভূমি আছে সে বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের এক হিসাবে দেখা যায়, বাংলাদেশে ১১ শতাংশ, ভারতে ২৩ দশমিক ৭, পাকিস্তানে ২, নেপালে ২৫ দশমিক ৪ এবং শ্রীলংকায় ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ বনভূমি আছে। সারা বিশ্বেই জনসংখ্যার চাপে বনভূমির পরিমাণ ক্রমেই কমছে। তবে অনেকে মনে করেন, কাগজ ও কাঠের উৎস হিসেবে বনকে শিল্পের অঙ্গীভূতকরণই বন উজাড় হওয়ার প্রধান কারণ। এখন কোনো দেশের কোনো বনকে যতই সংরক্ষিত বলে চিহ্নিতকরণ করা হোক না কেন, ওই বন থেকে কী পরিমাণ কাঠ উৎপাদন হবে তার একটা লক্ষ্যমাত্রা থাকে এবং ওই লক্ষ্যে সরকারিভাবে গাছকাটা চলে; কিন্তু নতুন গাছ সেভাবে লাগানো হয় না। তবে বাংলাদেশে আরও যা হচ্ছে তা হলো সামাজিক বনায়নের নামে প্রাকৃতিক বন উজাড়করণ।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবকে গ্রহণ করেও গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়, বেসরকারি হিসাবে এখন দেশে বনভূমির পরিমাণ মাত্র ৭ থেকে ৮ শতাংশ। অবশ্য সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সংরক্ষিত বনভূমি, ব্যক্তি পর্যায়ে রোপণ করা গাছপালা, সামাজিক বনায়ন ও উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনীসহ নানা উদ্যোগ মিলিয়ে দেশে বনভূমির পরিমাণ এখন বেড়ে ১৬ থেকে ১৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০৩৫ সালের মধ্যেই দেশের মোট ভৌগোলিক এলাকার ২০ শতাংশ বনভূমি এবং সারাদেশের শতভাগ ভূমিকে বৃক্ষ আচ্ছাদিত করতে চেয়েছে সরকার। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম বন সার্কেলের কয়েকটি বিভাগীয় বন এলাকার কয়েক লাখ একর সংরক্ষিত বনভূমি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অবাধ বন ধ্বংস ও অব্যাহত বনজসম্পদ পাচার হয়ে যাওয়ার ফলে হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে সবুজ প্রকৃতি ঘেরা চট্টগ্রাম অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য। ইতোমধ্যে চট্টগ্রামের বনাঞ্চল থেকে হারিয়ে গেছে বহু প্রজাতির বন্যপ্রাণী। অভিযোগে প্রকাশ, গত ১২ বছরে চট্টগ্রাম বনাঞ্চল থেকে পাচার হয়ে গেছে হাজার কোটি টাকার কাঠ। ন্যাড়া হয়েছে অসংখ্য সবুজ পাহাড়। পরিবেশ হারাতে বসেছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য। ফলে চট্টগ্রাম ও পার্বত্যাঞ্চলে জলবায়ুু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আশংকা দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রাকৃতিক বন ছাড়াও শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে বিশাল এলাকাজুড়ে সৃজন করা হয়েছিল সরকারি বন বাগান ও সংরক্ষিত বনাঞ্চল। কিন্তু বন বিভাগের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা, কর্মচারী ও পাচারকারীরা এসব সমৃদ্ধ বনজ সম্পদ প্রকাশ্যে সাবাড় করে ফেলছে। এতে চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ বন এলাকা পরিণত হয়েছে বিরানভূমিতে। তাই পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্যকে হুমকির মুখ থেকে বাঁচাতে হলে অবশ্যই আমাদের বনভূমি রক্ষায় পদক্ষেপ নিতে হবে।







