কিশোর গ্যাং সমাজের জন্য ব্যাধি হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। চট্টগ্রাম বিভাগে ব্র্যাকের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখার সময় মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন এই মন্তব্য করেন। নগরের স্টেশন রোডস্থ মোটেল সৈকত মিলনায়তনে সোমবার অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। মেয়র জানান, এখন বড় চ্যালেঞ্জ মাদক সন্ত্রাস ও কিশোর গ্যাং। এজন্য ট্রিটমেন্ট দরকার। শিশু কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ দরকার। সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে আমরা তা করছি। খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকলে তারা বিপথগামী হবে না। ব্র্যাকের মতো বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো কিশোরদের সচেতনতামূলক কর্মসূচি নিতে পারে।
বাংলাদেশে কিশোর অপরাধের ক্রমবর্ধমান হার নিয়ে সামপ্রতিক এক গবেষণায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত এক প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ, বন্ধুদের প্রভাব, গণমাধ্যমে প্রচারিত সহিংস বিষয়বস্তু এবং স্থানীয় নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের নেতিবাচক ভূমিকা কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির মূল কারণ। এতে কিশোর অপরাধকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে ১৮ বছরের কম বয়সী অপ্রাপ্তবয়স্কদের দ্বারা সংঘটিত অপরাধমূলক কার্যক্রম হিসেবে। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে কিশোর অপরাধ এমন একটি স্তরে পৌঁছেছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, একটি শিশুর মানসিক ও শারীরিক বিকাশ তার পারিবারিক সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু আধুনিক কর্মজীবী বাবা–মায়ের ব্যস্ততার কারণে শিশুরা পরিবার থেকে পর্যাপ্ত মনোযোগ পাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশের বেশিরভাগ পরিবারে শিশুরা পারিবারিক সংযোগের অভাবে স্মার্টফোন, কম্পিউটার এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত ডিভাইসের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এসব অভ্যাস তাদের মানসিক স্বাস্থ্যে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে এবং অপরাধের দিকে ধাবিত করছে। সামাজিক পরিবেশও কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির আরেকটি বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের সামাজিক অস্থিরতা, রাজনৈতিক সহিংসতা, মাদকের সহজলভ্যতা, এবং দুর্নীতিগ্রস্ত শিক্ষা ব্যবস্থা কিশোরদের অপরাধমূলক কার্যক্রমে উদ্বুদ্ধ করছে। রাজনৈতিক প্রভাব এবং ক্ষমতার অপব্যবহার সমাজে একটি নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করছে, যা শিশুদের মানসিকতায় প্রভাব ফেলছে। গবেষণায় বন্ধুবান্ধব বা সহপাঠীদের প্রভাবকে কিশোর অপরাধের আরেকটি প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বন্ধুরা একটি শিশু বা কিশোরের মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বন্ধুর নেতিবাচক আচরণ বা অভ্যাস একজন কিশোরকে সহজেই অপরাধের পথে নিয়ে যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, একটি কিশোর বন্ধুদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ধূমপানের মতো অভ্যাস শুরু করতে পারে, যা পরে বড় ধরনের অপরাধের দিকে নিয়ে যেতে পারে। গণমাধ্যমে প্রচারিত সহিংস বিষয়বস্তু কিশোরদের অপরাধে উদ্বুদ্ধ করার আরেকটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমানে জনপ্রিয় অনেক অ্যাকশন ফিল্ম বা সিরিজ সহিংসতা, মাদকসেবন এবং ধূমপানের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে তুলে ধরে। এলাকাভিত্তিক গ্রুপিংয়ের মাধ্যমে কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার কারণ হিসেবে যুগের পরিবর্তনকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলেন, ‘আমরা মূলত একটা সময়ের ট্রানজেকশনে আছি। সব দেশেই এমন সময় যায়। যখন কিশোর অপরাধ বেড়ে যায়।’ বর্তমান সময়ের কিশোররা উন্নত প্রযু্ক্তির মাধ্যমে পশ্চিমা সংস্কৃতিতে আকৃষ্ট হচ্ছে উল্লেখ করে তাঁরা বলেন, ‘আমাদের দেশের কিশোররা বর্তমানে অনেক উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। তারা এর মাধ্যমে পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে এবং সেই সব সংস্কৃতি নিজেদের মধ্যে ধারণ করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এই জায়গায় তারা ব্যর্থ হচ্ছে। যে সংস্কৃতি তারা গ্রহণ করতে চাচ্ছে সেটা পুরোপুরি নিতে পারছে না। অন্যদিকে যারা নিচ্ছে তারাও এটার সদ্ব্যবহার করতে পারছে না। যার ফলে সমাজে এর একটা কুপ্রভাব পড়ছে। বাড়ছে কিশোর অপরাধ।’
অপরাধবিজ্ঞানীরা বলেন, মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতা ও আইনের দুর্বল শাসন কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির কারণ। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আশ্রয়–প্রশ্রয়ে গড়ে উঠছে কিশোর গ্যাং। যদিও জানি, পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কিশোর অপরাধ দমনে তৎপর রয়েছেন। রয়েছে গোয়েন্দা পুলিশের নজরদারি। তবে কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে তেমন কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ে না বললেই চলে। কিশোর অপরাধীদের তৎপরতা রোধে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপশি কিশোরদের সুস্থপথে পরিচালিত করার জন্য সচেতনতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।








