ওমানে ৪ সহোদরের মৃত্যুর ঘটনায় উদ্বিগ্ন রেমিট্যান্স যোদ্ধারা

এম আনোয়ার হোসেন | বৃহস্পতিবার , ২১ মে, ২০২৬ at ৫:৫৫ পূর্বাহ্ণ

গাড়ির ভেতর হঠাৎ মৃত্যু। একজনের নয়। চার সহোদরের এক সঙ্গে মৃত্যু। মেনে নেয়া যায় না। মেনে নেয়ার কথাও না। স্বাভাবিকভাবেই বড় জন থেকে ছোটদের পর্যায়ক্রমে মৃত্যু ঘটে। যদিও জীবনমৃত্যুর ফায়সালা পৃথিবীতে নয়, আসমানে হয়। মহা প্রভুর লীলাখেলা। সমপ্রতি চট্টগ্রামের রাংগুনিয়া উপজেলার লালানগর ইউনিয়নের বন্দারাজ পাড়ার প্রবাসী ৪ সহোদরের মৃত্যু ঘটে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমানে।

নিহতরা হলেন যথাক্রমে রাসেদুল ইসলাম, শাহেদুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম ও শহিদুল ইসলাম। ওমানে একটি গাড়ি থেকে তাদের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তারা সবাই ওমানে কর্মরত ছিলেন। তাদের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে সর্বত্র শোকের ছায়া নেমে আসে। দেশে আসার লক্ষ্যে বাজার করতে গিয়ে গাড়ির মধ্যে এক সঙ্গে ৪ ভাইয়ের মৃত্যু ঘটেছে। দেশের নিউজ পোর্টাল ও মিডিয়ায় বহুল প্রচারিত এ মৃত্যু সংবাদ প্রচারিত হলে সারা দেশে শোকের ছায়া নেমে আসে।

কী কারণে ৪ ভাইয়ের এমন মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে তা নির্নয় করা সম্ভব হয়নি। যেহেতু গাড়িতে ৪ জনেরই মৃত্যু হয়। এমন মৃত্যুর খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে প্রবাসীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। যেহেতু আধুনিক ডিজিটালাইজেশনের যুগে খবর চাউর হতে কয়েক মিনিট সময় লাগে না। কনটেন্ট ক্রিয়েটর তা লুফে নেয়। ইউটিউব, ফেইসবুক, ইন্সটগ্রামে মনিটাইজেশন থাকায় সবাই যেন কনটেন্ট ক্রিয়েটর। এতে করে সবাই ক্রিয়েটর হতে মরিয়া। ফলে খবরের আগে খবর চাউর হয়ে যায়। এতে সুফলের পাশাপাশি কুফল রয়েছে। অবশ্য এতে করে রেমিট্যান্সের মত হাজার হাজার ডলার দেশের মানুষের আয় হয়। প্রবাসে থেকেও অনেকেই এ খাত থেকে বিপুল পরিমাণ আয় করছে। এতে অনেকের সচ্ছলতা দারুণ প্রাণ পেয়েছে। অনেকের আয় সীমাহীন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের সার্বিক উন্নয়নে এ খাত একটি আশার সঞ্চার করতে পারে। প্রসঙ্গত লালা নগরের ৪ ভাইয়ের মৃত্যুতে একটি পরিবারের আশাআকাঙ্ক্ষা নস্যাৎ হয়ে যায়। তেমনি রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের হৃদয়ে নিদারুণ আঘাত করেছে। এতে করে রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের মনে হতাশার সৃষ্টি করে। একটি গাড়িতে চড়ে যাবার সময় ৪ ভাইয়ের ঠিক কী কারণে তাদের মৃত্যু ঘটে সেটা নিয়ে প্রবাসীদের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক পরিবারের এমন ঘটনায় প্রবাসীদের আতঙ্কিত করেছে। জীবনের ঝুঁকি ও নিরাপত্তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে। এতে করে আমাদের প্রবাসী ভাইবোনদের জীবনের প্রতি অনীহা তৈরি হতে পারে। যদি তাই হয় তবে দেশের রেমিট্যান্সের ওপর আগামীতে নিদারুণ প্রভাব পড়তে পারে। যা কোনো ভাবেই কাম্য নয়।

এদিকে ‘৪ ভাগিনা হারানো সৌদি প্রবাসী মামা অভিযোগ করেছেন, আমাদের দেশের মিডিয়া গুজব ছড়ায়।’ আমি তাতে পুরোপুরি একমত না হলেও বলতে পারি, উক্ত ঘটনায় মিডিয়া একটা মৃত্যুর সংবাদ প্রচারের পাশাপাশি মৃত্যুর কারণটি ধারণামূলক প্রচার করে। যাতে করে প্রকৃত ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যেতে পারে। মিডিয়ার উচিৎ সব সময় ভীকটিমের বক্তব্য গ্রহণ করা। বক্তব্য পাওয়া না গেলে বিষয়টিও খতিয়ে দেখার কথা নানাভাবে উল্লেখ করা। তাতে করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কিংবা প্রশাসন আঁধারে না থাকে। ব্যবস্থা নিতে তৎপর হয়। কিন্তু আমরা অনেক সময় সেটা করি না। যেমন রাংগুনিয়ায় শিশু মনি ধর্ষণের ঘটনায় ঠিক একইভআবে মিডিয়া ফলোআপ করে। যদিও দৈনিক দ্যা ইন্ডেপেন্ডেট পত্রিকা ভিন্ন ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। ভিকটিমের পরিবার ও পার্শ্ববর্তী লোকজনের বক্তব্য তুলে ধরে। বাকি সমস্ত মিডিয়ার গতানুগতিক রিপোর্টের ফলে ভাইবোনকে আদালত হেফাজতে নিলে জামিন করানো মুশকিল হয়ে যায়। অথচ তারা ভীকটিম। তাদের কারামুক্ত করতে আমাদের মাথার ঘাম পায়ে পড়ে। বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার মাধ্যমে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে মুক্ত আলোচনার আয়োজন করা হয়। এতে বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার চেয়ারপার্সন আইনজীবী মরহুম সিগমা হুদা, সাবেক বিচারপতি কৃঞ্চা দেবনাথ, জুডিশিয়ারির স্থানীয় বিচারকগণ, প্রশাসন ও পুলিশের উর্ধতন কর্মকর্তাবৃন্দ। ফলে পরের দিন ধর্ষিতা শিশু মনির ছোট ভাইকে জামিন দেয়া হয়। অন্যদিকে চট্টগ্রামে এসপি বাবুল আক্তারের সহধর্মিণীর মৃত্যুর ঘটনার মোড় ঘুরে গিয়েছিল।

এদিকে ৪ ভাই যদি হত্যার শিকার হয় তবে একটি নাটকীয় ঘটনা ঘটতেও পারে। যদি পূর্বপরিকল্পিত হয় তাতে আরো লোমহর্ষক পরিকল্পনা ও ঘটনার কথা বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা থাকে। এমনও হতে পারে, সংশ্লিষ্ট পাকিস্তানি নাগরিক নিরপরাধ। তার সফরে যাবার কথা প্রকাশ হলে বাঙালির মধ্য থেকে কেউ পলাশীর আম্রকাননের মত ঘটনা সাজিয়েছে। বাঙলালিদের দ্বারা অনেক কিছু সম্ভব। এতে দেশের মিডিয়ার কোনো গ্রুপকে সম্পৃক্তও করতে পার। একটা নিউজ দেশের সমস্ত মিডিয়ায় কপি হয়েছে। আমরা বিগত প্রায় এক দশক ধরে দেখে আসছি অনেক ক্ষেত্রে আমাদের মিডিয়া কপি, কাট, পেস্ট নকলবাজিতে নিমজ্জিত। নকল বন্ধের জন্য আমাদের শিক্ষামন্ত্রীকে একটু বাড়িয়ে কাজ করা দরকার। তথ্য মন্ত্রণালয়ে একটা নকল বিরোধী অভিযান পরিচালনা করলে আশা করি দেশ স্বাভাবিক হয়ে যেতে পারে। আমরা যেন একটা নকলের যুগে বাস করছি। মিডিয়াতে চলছে নকলবাজির মহোৎসব। উল্লেখ্য, নদীর পানিতে ডুবন্ত রোহিঙ্গাদের তাৎক্ষণিক উদ্ধারের লক্ষ্যে আমি দেশের ও জাতিসংঘ সহ বিভিন্ন জায়গায় আবেদন করি। যেন রোহিঙ্গাদের জন্যে সীমান্ত খুলে দিয়ে নাফ নদীতে ডুবন্ত রোহিঙ্গা নারী, শিশুকে উদ্ধার করা যায়। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে জাতিসংঘ বাংলাদেশেকে সীমান্ত দ্রুত খুলে দেয়ার আহবান জানায়। তাতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নমনীয় হয়। কিন্তু অল্প কিছু দিন না যেতেই তিনি এ বিষয়ে নিজেকে মানবতার মা হিসেবে পরিচিত পান। কিন্তু সঠিক বিচার হলে কী দাঁড়ায়? অথচ তাঁর দলের কেউ কেউ রোহিঙ্গাদের নিয়ে বিশাল অংকের চাঁদাবাজিতে নিমজ্জিত হলে তাতে আমি যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করি। পাশাপাশি বিভাগীয় কমিশনার মহোদয়কে অবহিত করি। এতে করে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে বিভাগীয় ডিসি সম্মেলনে তিনি রোহিঙ্গা ত্রাণ সহায়তার নিয়ম নিয়ে মৌখিক নির্দেশনা জারি করেন এবং কড়া ভাষায় চাঁদাবাজি বন্ধ ঘোষণা করেন। যেই নিউজ আমি নিজের হাতে লিখে দ্রুত সংশ্লিষ্ট সব জায়গায় মেইল করি। বিভাগীয় কমিশনার আছেন অবসরে। এ সব দেশের ক্রান্তিকালে দেশের মিডিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকার কথা। কিন্তু সেটা অনেক সময় দেখা যায় না। তাই বলছি, আমাদের মিডিয়া দুর্বল হয়েছে সে অনেক আগে। এরা সাগর রুনির বিচার পর্যন্ত করাতে পারেনি। কারণ সগোত্রীয়রা হয়তো অপরাধী। প্রসঙ্গত, পাকিস্তানী নাগরিক ঘটনার সাথে সম্পৃক্ততা থাকতে পারে। আবার নাও থাকতে পারে। তাই ওমানে একটা তদন্ত প্রয়োজন। এটা সরকার ওমান সরকারকে অনুরোধ করলে তারা ব্যবস্থা নেবে। তাতে আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধারা শান্তি ও প্রশান্তি লাভ করবে। যেহেতু দেশের সকল রেমিট্যান্স যোদ্ধারা এখন উদ্বিগ্ন। সরকার যদি এ বিষয়ে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ না করে তবে রেমিট্যান্সের ওপর একটা প্রভাব পড়তে পারে। এ জন্য সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। দ্রুত সঠিক ঘটনা সরকারের হাতে আসতে হবে। সেই অনুযায়ী উদ্বিগ্ন প্রবাসীদের সান্ত্বনা দিতে হবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট ও মানবাধিকার কর্মী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকবিতাকুঁড়ি
পরবর্তী নিবন্ধফলাফল মুখ্য নয়, জ্ঞান অর্জন জরুরি