বিদ্যুৎ সঞ্চালনের মূল্যহার বা হুইলিং চার্জ বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে গণশুনানিতে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির প্রকল্প ব্যয়, সঞ্চালন লস এবং গ্রাহকের ওপর বাড়তি চাপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অংশীজনরা। গতকাল বুধবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে বিদ্যুতের মূল্যহার পরিবর্তনের গণশুনানির প্রথম দিনের দ্বিতীয় পর্বে পাওয়ার গ্রিডের সঞ্চালন মূল্যহার পরিবর্তনের প্রস্তাবের ওপর শুনানি হয়। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদের সভাপতিত্বে শুনানিতে পাওয়ার গ্রিডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুর রশিদ খান, পিডিবি, শিল্প গ্রাহক, ভোক্তা প্রতিনিধি এবং খাত সংশ্লিষ্টরা বক্তব্য দেন। পাওয়ার গ্রিড আগামী ১ জুন থেকে প্রতি ইউনিট সঞ্চালনের মূল্যহার গড়ে ৩০ দশমিক ৯৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৪৯ দশমিক ৫৫ পয়সা করার প্রস্তাব দিয়েছে।
ভোল্টেজ লেভেল অনুযায়ী ২৩০ কেভিতে প্রতি ইউনিট সঞ্চালন চার্জ ৩০ দশমিক ৫৭ পয়সা থেকে ৪৮ দশমিক ৩১ পয়সা, ১৩২ কেভিতে ৩০ দশমিক ৮৬ পয়সা থেকে ৪৮ দশমিক ৭৭ পয়সা এবং ৩৩ কেভিতে ৩১ দশমিক ৪৪ পয়সা থেকে ৪৯ দশমিক ৬৯ পয়সা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
পাওয়ার গ্রিডের হিসাবে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ১ লাখ ২ হাজার ৭৪০ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ সঞ্চালনে মোট ব্যয় দাঁড়াবে ৫ হাজার ৫১৩ কোটি টাকা। তবে বিইআরসির কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি বলছে, একই অর্থবছরে পাওয়ার গ্রিডের নিট সঞ্চালন ব্যয় বা নিট রাজস্ব চাহিদা হবে ৪ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা। তাতে প্রতি ইউনিটে সঞ্চালন ব্যয় দাঁড়ায় ৪৪ দশমিক ৮১ পয়সা। বিদ্যমান গড় সঞ্চালন মূল্যহার ৩০ দশমিক ৯৬ পয়সা ধরে প্রতি ইউনিটে ১৩ দশমিক ৮৫ পয়সা বাড়ানো প্রয়োজন বলে কমিটির প্রতিবেদনে মত দেওয়া হয়।
পাওয়ার গ্রিড সরকারের কাছ থেকে নেওয়া ঋণের সুদ ও আসলের কিস্তি পরিশোধ, বিদেশি মুদ্রার বিনিময় হার পরিবর্তন, সঞ্চালন নেটওয়ার্ক সমপ্রসারণ, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ সঞ্চালনের যুক্তি দেখিয়ে মূল্যহার বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে।
শুনানিতে লেখক ও জ্বালানি খাত পর্যবেক্ষক শুভ কিবরিয়া পাওয়ার গ্রিডের প্রকল্প গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, আপনারা যে উন্নয়ন প্রকল্প নেন, সেগুলো টেকসই কি না, তা নিশ্চিত করে কে? এটা কি আপনারা বলেন, নাকি কোনো রেগুলেটরি অথরিটি আছে?
পাওয়ার গ্রিডের প্রতিনিধি জবাবে বলেন, প্রত্যেক প্রকল্প নেওয়ার আগে আমরা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে বিস্তারিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করি। সাধারণত আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে বাইরের প্রতিষ্ঠান এ কাজ করে। শুভ কিবরিয়া বলেন, বড় প্রকল্পের ব্যয় শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ঘাড়ে যায়। তাই এসব প্রকল্প বিইআরসির পর্যালোচনায় আসা উচিত।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঞ্চালন অবকাঠামোর উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ডাবল সার্কিট লাইন হলে যদি কাজ চলত, তাহলে চার সার্কিট লাইন করার অনুমতি কে দিল? কারণ এর টাকা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই যাচ্ছে।
শিল্প গ্রাহকদের পক্ষে বক্তব্য দেন বিএসআরএমের উপদেষ্টা শিবু কুমার চৌধুরী। তিনি বলেন, উচ্চ ভোল্টেজের গ্রাহকরা উৎপাদন কেন্দ্রের কাছাকাছি থেকে বিদ্যুৎ নেন। সেখানে সঞ্চালন ও বিতরণ লস তুলনামূলক কম। তাই ২৩০ কেভি ও ১৩২ কেভি পর্যায়ের গ্রাহকদের হুইলিং চার্জ তুলনামূলক কম হওয়া উচিত। তিনি বলেন, বড় শিল্প গ্রাহকরা নিজেদের বিনিয়োগে অবকাঠামো তৈরি করে বিদ্যুৎ নেন। তাই তাদের জন্য ট্যারিফ কাঠামোয় যৌক্তিক পার্থক্য থাকা দরকার।
শিবু কুমার বলেন, চুক্তির সময় অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকের ওপর শর্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়। হুইলিং চার্জ ও ডিমান্ড চার্জ দেওয়ার পরও নতুন করে ইনফ্রাস্ট্রাকচার চার্জ দাবি করা হচ্ছে, যা পুনর্বিবেচনা দরকার।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ শুনানিতে পাওয়ার গ্রিডের প্রকল্প সংখ্যা ও বিনিয়োগ ব্যয় নিয়ে ব্যাখ্যা চান। তিনি বলেন, আপনার প্রকল্প সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় আপাতদৃষ্টিতে বেশি নেওয়া হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। সম্ভবত এ কারণেই আপনার চাহিদা বেশি। এটার ব্যাখ্যা দিন। জালাল আহমেদ বলেন, আপনারা উচ্চ চাহিদা বিবেচনা করে সঞ্চালন সক্ষমতা বাড়িয়েছেন, কিন্তু ওই পরিমাণ বিদ্যুৎ সঞ্চালন হচ্ছে না।
জবাবে পাওয়ার গ্রিডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুর রশিদ খান বলেন, বিতরণ সংস্থার চাহিদা, লোড ফোরকাস্টিং, মাস্টারপ্ল্যান এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের অবস্থান বিবেচনা করেই প্রকল্প নেওয়া হয়। তিনি বলেন, নিজেদের আগ্রহে আমরা কোনো লাইন বা প্রকল্প করি না। বিতরণ সংস্থার চাহিদা, পাওয়ার প্ল্যান্টের অবস্থান এবং মাস্টারপ্ল্যান বিবেচনায় প্রকল্প নেওয়া হয়।
প্রতিটি প্রকল্প আন্তর্জাতিক পরামর্শকের মাধ্যমে সমীক্ষা, দাতা সংস্থার যাচাই এবং সরকারি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায় বলে রশিদ খানের ভাষ্য। প্রকল্প ব্যয় বাড়ার বিষয়ে তিনি বলেন, মূল চুক্তিমূল্য সাধারণত বাড়ে না; ব্যয় বৃদ্ধির বড় কারণ ডলারের বিনিময় হার পরিবর্তন, ভূমি অধিগ্রহণে বিলম্ব, রাইট অব ওয়ে সমস্যা, মামলা এবং স্থানীয় জটিলতা। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ না থাকা বা ভোল্টেজের সমস্যা সমাধানের জন্য বিতরণ সংস্থাগুলো নতুন গ্রিড উপকেন্দ্র চায়। তবে সব ক্ষেত্রেই নতুন প্রকল্প নেওয়া হয় না; অনেক সময় রিকন্ডাক্টরিং, পিএফ ইকুইপমেন্ট বা ক্যাপাসিটর ব্যাংক বসানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।
সঞ্চালন লস নিয়ে পাওয়ার গ্রিডের এমডি বলেন, এটি পুরোপুরি তাদের হাতে নেই। কোন বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু আছে, কোন কেন্দ্র গ্যাসের অভাবে বন্ধ, কোন অঞ্চল থেকে কত দূরে বিদ্যুৎ আনতে হচ্ছে, তার ওপর লস নির্ভর করে। ঢাকার কাছের কেন্দ্র বন্ধ থাকলে পায়রা, রামপাল বা মাতারবাড়ী থেকে দীর্ঘ দূরত্বে বিদ্যুৎ আনতে হয়। এতে লাইন ওভারলোড হয়, লসও বাড়ে।
রশিদ খান বলেন, চট্টগ্রাম অঞ্চলের চাহিদা আগে যে মাত্রায় ধরা হয়েছিল, বাস্তবে তা কম হওয়ায় মাতারবাড়ি থেকে বিদ্যুৎ ঢাকার দিকে আনতে হচ্ছে। তাতে সঞ্চালন দূরত্ব বাড়ছে। পাওয়ার গ্রিড লাভজনক প্রতিষ্ঠান হতে চায় না; শুধু ব্যয় পুনরুদ্ধার করতে চায়। সরকারের ঋণের মেয়াদ ১৫ বছর থেকে ৩০ বছর করা গেলে এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওঠানামা সামলাতে সহায়তা পেলে সঞ্চালন ব্যয়ের চাপ কিছুটা কমতে পারে। শুনানি শেষে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, শুনানিতে অংশ নেওয়া সবার বক্তব্য লিপিবদ্ধ ও রেকর্ড করা হয়েছে। চাইলে অংশীজনরা ২৩ মে পর্যন্ত লিখিত বক্তব্য দিতে পারবেন।
বিদ্যুতের পাইকারি, সঞ্চালন ও খুচরা মূল্যহার পরিবর্তনের ওপর দুই দিনের এই গণশুনানি করছে বিইআরসি। প্রথম দিন সকালে পিডিবির পাইকারি মূল্যহার এবং বিকালে পাওয়ার গ্রিডের সঞ্চালন মূল্যহার নিয়ে শুনানি হয়।
আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে বিদ্যুতের খুচরা মূল্যহার পরিবর্তনের প্রস্তাবের ওপর শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে পিডিবি, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড, ডিপিডিসি, ডেসকো, ওজোপাডিকো ও নেসকোর প্রস্তাব শুনবে কমিশন।











