শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গবেষণা বাড়াতে হবে

| বুধবার , ২০ মে, ২০২৬ at ৬:০৯ পূর্বাহ্ণ

সমপ্রতি আইসিডিডিআরবির গবেষণা বলছে, ঢাকার অনেক শিশু মোবাইল, টিভি, ট্যাব বা কম্পিউটারে অতিরিক্ত সময় কাটাচ্ছে। ফলে তাদের ঘুম কমে যাচ্ছে, ওজন বাড়ছে, মাথাব্যথা ও চোখের সমস্যা হচ্ছে এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ঢাকার ছয়টি স্কুলের (তিনটি বাংলা মাধ্যম ও তিনটি ইংরেজি মাধ্যম) ৬ বছর থেকে ১৪ বছর বয়সী ৪২০ জন শিশুর ওপর এই গবেষণাটি করা হয়। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পাঁচজন শিশুর মধ্যে চার শিশু (৮৩ শতাংশ) প্রতিদিন ২ ঘণ্টার বেশি সময় স্ক্রিন ব্যবহার করে, যা শিশুদের বিনোদনমূলক স্ক্রিন ব্যবহারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রায় ২ ঘণ্টার সীমাকে ছাড়িয়ে গেছে। গড়ে শিশুরা স্মার্টফোন, টেলিভিশন, ট্যাবলেট, কম্পিউটার এবং গেমিং ডিভাইসে দিনে প্রায় ৪.৬ ঘণ্টা সময় কাটায়।

গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে দেশে একতৃতীয়াংশেরও বেশি শিশু চোখের সমস্যায় এবং ৮০ শতাংশ শিশু প্রায়ই মাথাব্যথায় ভুগছে। যারা দিনে ২ ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন ব্যবহার করে, তারা গড়ে মাত্র ৭.৩ ঘণ্টা ঘুমায়, যা এ বয়সের শিশুদের সুস্থ বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুমের তুলনায় অনেক কম। এ ছাড়া প্রায় ১৪ শতাংশ শিশু অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতার শিকার এবং যারা বেশি স্ক্রিন ব্যবহার করে, তাদের মধ্যে এ হার বেশি। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শৈশবে দীর্ঘমেয়াদি ঘুমের অভাব স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ, শেখার ক্ষমতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, শারীরিক বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক মানসিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকায় শারীরিক পরিশ্রম ও খেলাধুলা কমে গিয়ে স্থূলতার ঝুঁকি বাড়ায়।

ঢাকার শিশুদের স্ক্রিন টাইম ও এর প্রভাবে তাদের স্বাস্থ্য ও সামগ্রিক সুস্থতা নিয়ে আইসিডিডিআরবির সামপ্রতিক গবেষণার ফলাফল বেশ উদ্বেগজনক। উদ্বেগের বিষয় হলো, অধিকাংশ পরিবার এখনও এই ঝুঁকিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুকে চুপ করিয়ে রাখতে বা ব্যস্ত রাখতে মোবাইল ফোন যেন সহজ ‘ডিজিটাল খেলনা’ হয়ে উঠেছে। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা শিশুদের বয়সভেদে সীমিত স্ক্রিন টাইমের পরামর্শ দিয়ে আসছেন। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রসব পক্ষকেই দায়িত্ব নিতে হবে। অভিভাবকদের উচিত শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট স্ক্রিন সময় নির্ধারণ করা এবং বিকল্প বিনোদন যেমন বই পড়া, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে উৎসাহ দেওয়া। স্কুলগুলোতে সীমাতিরিক্ত সময় ডিজিটাল ব্যবহারের কুফল সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে বিশেষ কার্যক্রম চালু করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকার বিশেষত স্বাস্থ্য দপ্তরকে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় জাতীয় পর্যায়ে প্রচার ও গবেষণা বাড়াতে হবে।

তাঁরা বলেন, ‘ডিজিটাল স্ক্রিনে শিশুদের আসক্তি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। বাংলাদেশে এই প্রথম বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা থেকে এই সমস্যার গভীরতা ও ব্যাপ্তি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেল। ঢাকার স্কুলের শিশুদের মধ্যে গবেষণা হলেও সারা দেশের শিশুদের, বিশেষ করে শহরাঞ্চলের শিশুদের ক্ষেত্রে এ চিত্রের খুব বেশি ব্যতিক্রম হবে বলে আমরা মনে করি না। করোনা মহামারির সময়ে বিশ্বে যেসব দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বেশি দিন বন্ধ ছিল, তার মধ্যে বাংলাদেশ সামনের কাতারের একটি দেশ। এ সময় অনেক শিশুর মধ্যে মুঠোফোনসহ যে ডিজিটাল আসক্তি গড়ে ওঠে, সেখান থেকে অনেক ক্ষেত্রেই বেরিয়ে আসা সম্ভব হয়নি। ইরান যুদ্ধের কারণে যে জ্বালানিসংকট দেখা দিয়েছে, সেখানেও ঢাকার কিছু স্কুলে অনলাইন ও সশরীরমিশ্র পদ্ধতির ক্লাস চালু করা হয়। বিশ্বের অনেক দেশে যেখানে শিশুদের ডিজিটাল আসক্তির ক্ষতিকর প্রভাবের কথা চিন্তা করে শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, বাংলাদেশে সেখানে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে।’

গবেষকরা বলেছেন, প্রযুক্তি পুরোপুরি বন্ধ করা সমাধান নয়, বরং শিশুদের বাড়িতে ও স্কুলে স্বাস্থ্যকর এবং ভারসাম্যপূর্ণ ডিজিটাল অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এজন্য শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের জন্য সহজ নির্দেশিকা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালু করা প্রয়োজন। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই অদৃশ্য মহামারী নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপমূলক গবেষণা এবং জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম শুরু করার এখনই উপযুক্ত সময়। শিশুদের বিতর্ক, দলবদ্ধভাবে পড়াশোনা, লাইব্রেরিতে যাওয়া এবং টবের গাছের যত্ন নেওয়ার মতো ভালো ও সৃজনশীল কাজে অংশ নিতে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। শিশুদের হাতে শুধু স্ক্রিন নয়, সুন্দর ও সুস্থ শৈশব তুলে দিতে হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে