পাহাড়ের সম্ভাবনাময় কৃষিপণ্য কাজু বাদাম। এক গাছে দুই ধরনের ফল হয়। একটির নাম কাজু আপেল, অন্যটির নাম কাজু বাদাম। দুটি ফলই খেতে সুস্বাদু। বান্দরবানে সাতটি উপজেলায় ২ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে কাজু বাদামের চাষ হয়েছে। এই অঞ্চলে উৎপাদিত কাজু বাদাম রপ্তানি হচ্ছে বিদেশেও। তবে খরা ও অসময়ের বৃষ্টিতে এবার কমেছে উৎপাদন এবং পাচ্ছে না ন্যায্য দামও। গতবছর প্রতিটি টন কাজু বাদাম সর্বোচ্চ ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হলেও এবার ৫ হাজার টাকায়ও বিক্রি করতে পারছে না বলে অভিযোগ চাষিদের।
কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় চাষিদের মতে, লাভজনক হওয়ায় জেলার সাতটি উপজেলায় কাজু বাদামের চাষ বাড়ছে। জুম চাষের পরিবর্তে এই অঞ্চলের চাষিরা এখন সম্ভাবনাময় কৃষিপণ্য কাজু বাদাম চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। তবে রুমা, থানচি, রোয়াংছড়ি, নাইক্ষ্যংছড়ি এবং সদর উপজেলার কাজু বাদামের চাষ সবচেয়ে বেশি। এ বছর বান্দরবানে দুই হাজার সাতশত হেক্টর জমিতে কাজু বাদামের চাষ হয়েছে। হেক্টর প্রতি এক থেকে দেড় টনের মত কাজু বাদাম উৎপাদন হলেও এবার খরা ও অসময়ের বৃষ্টিতে কমেছে ফলন। কৃষি বিভাগ দুই হাজার মেট্রিক টনের মত কাজু বাদাম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, ২০২৩–২৪ অর্থবছরে বান্দরবান জেলায় কাজু বাদামের চাষ হয়েছিল ২,৬১৯ হেক্টর জমিতে। উৎপাদন হয়েছিল ১.৫২০ মেট্রিক টন। ফলন্ত গাছের সংখ্যা ছিল ৬ লাখ ৫৭ হাজার ২৫৯টি। গতবছর ২০২৪–২৫ অর্থবছরে জেলায় কাজু বাদামের চাষ বেড়ে হয়েছিল ২,৭১১ হেক্টর। উৎপাদন হয়েছিল ১.৭৮২ মেট্রিক টন। ফলন্ত গাছের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭ লাখ ৩১ হাজার ১২৮টি। এবার ২০২৫–২৬ অর্থ বছরের কাজু বাদামের চাষ বেড়েছে ৮৯ হেক্টর জমিতে। ফলন্ত গাছের সংখ্যাও বেড়েছে ৫০ হাজারের বেশি। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কাজু বাদাম রপ্তানি হচ্ছে বিদেশে। কাজু বাদাম চাষ করে পাহাড়িদের অনেকে এখন অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী।
স্থানীয় রুমা উপজেলার মুনলাই পাড়ার চাষি গোলডেন বম ও লাললিয়ান খোপ বম বলেন, গতবছরের তুলনায় এবছর ফলন কম হয়েছে। খরা ও অসময়ের বৃষ্টিতে ঝরে পড়েছে গাছের ফুল। উৎপাদনের সঙ্গে দামও কমে গেছে এবছর। গতবছর প্রতি টন কাজু বাদাম সর্বোচ্চ ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হলেও এবার ৫ হাজার টাকাও বিক্রি করতে পারছি না। নায্য দামও পাচ্ছি না এমন অভিযোগ চাষিদের।
স্থানীয় উদ্যোক্তা সনুমং মারমা বলেন, পাহাড়ের সম্ভাবনাময় কৃষিপণ্য হচ্ছে কাজু বাদাম। এক গাছে দু’ধরনের ফল হয়। একটির নাম কাজু আপেল, অন্যটির নাম কাজু বাদাম। গাছে প্রথমে নরম তুলতুলে কাজু আপেল জন্মে। এই আপেলের গোড়ায় জন্মানো বাঁকা ফলই হচ্ছে কাজু বাদাম। বাদামের ওপরে মোটা সহজ রঙের খোসা থাকে। বিশেষ পদ্ধতির প্রয়োগের মাধ্যমে খোসা ছাড়িয়ে সংগ্রহ করতে হয় কাজু বাদাম। কাজু বাদাম খুবই স্বাস্থ্যকর একটি ফল। গাছের চারা লাগানোর পর গাছের বয়স চার থেকে পাঁচ বছরের মাথায় প্রথম ফুল এবং ফল আসে। নভেম্বর থেকে জানুয়ারি মাস হচ্ছে ফুল ফোটার সময়। আর মে থেকে জুলাই মাস হচ্ছে কাজু বাদাম সংগ্রহের সময়।
স্থানীয় চাষি লাললম জোয়াল বম বলেন, আমাদের গ্রামের চুয়াত্তর পরিবারের মধ্যে দুই–তৃতীয়াংশ পরিবার কাজু বাদাম চাষের সঙ্গে জড়িত। লাভজনক হওয়ায় কাজু বাদাম চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছে চাষিরা। তবে এবার মার্চ এপ্রিল মাসের মুকুল আসার সময়ে বৃষ্টি হওয়ায় গাছের সব মুকুল পচে ঝরে যায়। এতে ফলন খুবই কম হয়েছে। যা হয়েছে সেটিরও নায্য দাম পাচ্ছি না আমরা।
এদিকে উৎপাদনের পাশাপাশি কাজু বাদাম এখন বান্দরবান জেলায় প্রক্রিয়াজাতও হচ্ছে। ফলে স্থানীয় উৎপাদক চাষিদের যেমন বাজার নিশ্চিত হচ্ছে, তেমনি ভোক্তারাও কম দামে দেশীয় কাজু বাদাম হাতের নাগালে পাচ্ছেন। তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি, সরকারি–বেসরকারিভাবে ব্যাংক ঋণ সুবিধা না পাওয়ায় প্রক্রিয়াজাত কারখানা এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থা ঠিকঠাক গড়ে উঠছে না।
জেলা কৃষিপণ্য বিপণন কর্মকর্তা মোরশেদ কাদের বলেন, কৃষকেরা দাম পাচ্ছে না, এ ধরনের কোনো অভিযোগ আসেনি। প্রতিবেদকের কাছেই প্রথম শুনেছেন দাবি করে তিনি বলেন, উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়ার সমন্বয়ে কাজটি তারা করেন। কিন্তু জনবল সংকটে কৃষকের ঘরে ঘরে পৌঁছানো তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। স্থানীয়ভাবে কাজু বাদাম সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান কিষাণ ঘরসহ কয়েকটি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি যাতে চাষিরা উপকৃত হতে পারেন।
এ বিষয়ে বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ আবু নঈম মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন বলেন, কাজু বাদাম পাহাড়ের সম্ভাবনায় একটি কৃষিপণ্য। সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্পে রয়েছে কফি ও কাজু বাদাম চাষ সম্প্রসারণের। এবছর খরা ও অসময়ের বৃষ্টিতে ফলনে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটেছে। তবে খুব বেশি সমস্যা হবে না আশা করছি। তিনি বলেন, স্থানীয় চাষিদের উন্নত প্রশিক্ষণ এবং পরামর্শ দিয়ে সার্বক্ষণিক পাশে রয়েছে কৃষি বিভাগ।











