চট্টগ্রামে পছন্দের শীর্ষে লাল বিরিষ

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, সাতকানিয়া | শনিবার , ২৩ মে, ২০২৬ at ১০:১৬ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রামের মানুষের কাছে কোরবানিতে প্রথম পছন্দ রেড চিটাগাং ক্যাটেল। এই গরুকে চট্টগ্রামের বিশেষ জাতের লাল বিরিষও বলা হয়। কেউ কেউ অষ্টমুখী লাল গরু বলে থাকে। আকারে ছোট হলেও দেখতে সুন্দর ও সতেজ হওয়ায় পছন্দের তালিকায় সবসময় শীর্ষে থাকে আদি জাতের গরু রেড চিটাগাং ক্যাটেল। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত এবং উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের লোকজনের নিকট এ জাতের গরু সবচেয়ে প্রিয়। যারা লাল গরু পছন্দ করেন তাদের ক্ষেত্রে তো কথায় নেই। কারণ রেড চিটাগাং ক্যাটেলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো দেখতে লাল বর্ণের। তবে সবার পছন্দের এই গরু বাজারে মিলছে কম। দেশিবিদেশি নানা জাতের গরুর ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রামের একমাত্র জাত রেড চিটাগাং ক্যাটেল। খামারি ও গৃহস্থদের অসচেতনতার ফলে রেড চিটাগাং ক্যাটেলের সাথে দেশিবিদেশি জাতের বীজের সংকরায়নের কারণে ক্রমেই হারিয়ে যেতে বসেছে অষ্টমুখী এই লাল বিরিষ। কিছু কিছু খামারি ও কৃষক এখনো রেড চিটাগাং ক্যাটেল মোটাতাজা করে থাকে। এবারেও সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশের কিছু খামারি এবং কৃষক রেড চিটাগাং মোটাতাজা করেছে বলে জানা গেছে। পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় আইডিএফ এবং মমতার মাধ্যমে সাতকানিয়া ও চন্দনাইশসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় রেড চিটাগাং ক্যাটেলের প্রদর্শনী খামার করেছেন। এসব খামারের মাধ্যমে রেড চিটাগাং ক্যাটেলের বিশুদ্ধ প্রজনন এবং জাতকে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য কাজ করছেন। এছাড়া সরকারের নানামুখী পদক্ষেপের কারণে বিগত কয়েক বছরে রেড চিটাগাং ক্যাটেল জাতটি সম্প্রসারণ হয়েছে।

সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশে বিভিন্ন হাটবাজার এবং খামার পরিদর্শন করে দেখা যায়, এখনো কেউ কেউ রেড চিটাগাং ক্যাটেল লালন পালন করছেন। গ্রামের কৃষক এবং কিছু সৌখিন খামারি দেশিবিদেশি অন্যান্য জাতের গরুর সাথে রেড চিটাগাং ক্যাটেলও মোটাতাজা করেছেন। সংখ্যায় কম হলেও হাটবাজারে এই জাতের গরু আসতে দেখা যাচ্ছে। কোরবানির বাজারে লোকজনের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে রেড চিটাগাং ক্যাটেল। ফলে এ জাতের গরু মোটাতাজাকারীরা দামও পাচ্ছেন ভালো।

সাতকানিয়ার জনার কেঁওচিয়া মাইজপাড়ার বাসিন্দা মো. সেলিম জানান, রেড চিটাগাং ক্যাটেল নামের লাল রঙের গরুগুলো দেখতে খুব সুন্দর এবং মাঝারি আকৃতির হয়। এই জাতের গরুর মাংসে চর্বিও তুলনামুলক কম। মাংস সুস্বাদু হওয়ায় সবাই খেতেও চাই। ফলে কোরবানিতে আমার প্রথম পছন্দ রেড চিটাগাং। কোরবানির সময় বাজারে আমি প্রথমে এই জাতের গরু খুঁজি। বাজারে পাওয়া গেলে দাম কিছুটা বেশি হলেও নিয়ে নিই। এবারেও রেড চিটাগাং ক্যাটেল জাতের লাল বিরিষ নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বাজারে পছন্দমতো রেড চিটাগাং ক্যাটেল পেলে অবশ্যই নেব।

সাতকানিয়ার হরিণতোয়া এলাকার আবদুর রহিম বাদশা জানান, আমাদের রেড চিটাগাং ক্যাটেল জাতের একটি গাভী ছিল। ওই গাভী বিক্রির আগে ৩টি বাচ্চা দিয়েছে। তৃতীয় বাচ্চাটির বয়স এখন ৩ বছর। এটি এবারের কোরবানির জন্য মোটাতাজা করেছি। দেখতে বেশ সুন্দর হয়েছে। এটি এলাকার এক লোক দেড় লক্ষ টাকা চেয়েছে। ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা হলে বিক্রি করবো বলে দিয়েছি।

সাতকানিয়া সদর ইউনিয়নের দুর্লভের পাড়ায় পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় আইডিএফ কর্তৃক পরিচালিত রেড চিটাগাং ক্যাটেল প্রদর্শনী খামারের ব্যবস্থাপক রোকন উদ্দিন জানান, আমাদের খামারে রেড চিটাগাং ক্যাটেল জাতের বেশ কিছু গরু রয়েছে। কোরবানির জন্য ৩টি আলাদাভাবে মোটাতাজা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ২০ হাজার ও ১ লাখ ২২ হাজার টাকা করে দুইটি গরু বিক্রি করেছি। বিক্রির উপযোগী আরো একটি আছে। সেটি ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা যাবে।

সাতকানিয়ার কেরানীহাটের ইজারাদার মোরশেদ আলম জানান, রেড চিটাগাং ক্যাটেল বা লাল বিরিষের চাহিদা বাজারে সবসময় বেশি। তবে কোরবানি দাতাদের মধ্যে এ জাতের গরুর চাহিদা সবার শীর্ষে। কেরানীহাটে মাঝে মধ্যে রেড চিটাগাং জাতের গরু দেখা যায়। এ জাতের গরু দেখতে সুন্দর ও সতেজ হওয়ায় দাম কিছুটা বেশি হলেও ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি থাকে। বাজারে লাল বিরিষের চাহিদা দিন দিন বাড়তে থাকলেও পাওয়া যায় কম।

সাতকানিয়া উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. মিজানুর রহমান জানান, রেড চিটাগাং ক্যাটেল হলো চট্টগ্রামের আদি এবং একমাত্র জাত। এ জাতের গরু মাঝারি আকৃতির হয়। গরুর রং, চোখ, চোখের ভ্রু, নাক, শিং, ক্ষুর, লেজ ও প্রজননঅঙ্গ লাল রঙের হয়। এ জাতের গরু দেখতে খুব সুন্দর ও শক্তিশালী হওয়ায় পছন্দের তালিকায় সবার শীর্ষে। এ জাতের গরুর মাংসের গুণগতমান খুব ভাল এবং সুস্বাদু। ফলে কোরবানির বাজারে ব্যাপক চাহিদা থাকে। বাজারে চাহিদার শীর্ষে থাকলেও রেড চিটাগাং জাতের গরু বাজারে খুব কম পাওয়া যায়। সাতকানিয়ার বিভিন্ন হাটে রেড চিটাগাং জাতের কিছু গরু দেখা যায়। দেখতে লাল হওয়ায় ক্রেতাদের নজরও রেড চিটাগাং ক্যাটেলের উপর বেশি থাকে। সাতকানিয়ায় রেড চিটাগাং ক্যাটেল জাতের ২ শতাধিক গরু মোটাতাজা করা হয়েছে। দক্ষিণ চট্টগ্রামের মধ্যে পটিয়া ও বোয়ালখালী এলাকায় এ জাতের গরু বেশি পাওয়া যায়।

চন্দনাইশ উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডা. ফেরদৌসী আক্তার জানান, পুরো চন্দনাইশের কৃষক ও খামারিদের মাঝে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০টি রেড চিটাগাং ক্যাটেল রয়েছে। এরমধ্যে বেশির ভাগই হাশিমপুর এলাকায়। কোরবান উপলক্ষে কেউ কেউ মোটাতাজাও করেছে। রেড চিটাগাং ক্যাটেল দেখতে সুন্দর হওয়ায় বাজারে সবার পছন্দের শীর্ষে থাকে। কোরবানি ছাড়াও এ জাতের গরুর চাহিদা সবসময় সব এলাকায় রয়েছে। রেড চিটাগাং ক্যাটেল পালনে অনেক সুবিধার দিক রয়েছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোরোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি, মাংসে চর্বি কম হওয়ায় সবাই খেতে পারে, অনান্য জাতের গরুর তুলনায় মাংসের স্বাদ বেশি, লালন পালনে খরচ কম, শারীরিকভাবে বেশ শক্তিশালী, সহজে পোষ মানানো যায়, রোগ বালাই কম, আবহাওয়ার সাথে সমঞ্জস্যপূর্ণ, বাড়িতে কোনো যত্ন নিতে হয় না। ফলে এ জাতের গরু লালন পালনে অধিক লাভবান হওয়া যায়। তিনি আরো জানান, এ জাতের গাভীর দুধে চর্বি অনেক বেশি। ফলে দুধ ঘন ও সুস্বাদু হয়।

লোহাগাড়া উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা সেতুভূষণ দাশ জানান, কোরবানি দাতাদের মধ্যে রেড চিটাগাং ক্যাটেল বা লাল বিরিষের বিশেষ চাহিদা রয়েছে। লোহাগাড়ায় কোরবানি উপলক্ষে কৃষক ও খামারিরা যেসব গরু মোটাতাজা করেছে এর মধ্যে রেড চিটাগাং এবং শাহিওয়াল বেশি। রেড চিটাগাং এটি আমাদের নিজস্ব জাত। এ জাতের গরুর দুধ ও মাংসের স্বাদ উৎকৃষ্ট। সরকার এ জাত সংরক্ষণের জন্য ইতিমধ্যে প্রকল্প প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে। প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তর ও বিএলআরআই রেড চিটাগাং জাতের গরুর জার্মপ্লাজম সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধহবিগঞ্জে ৪ বছরের শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা, গ্রেপ্তার যুবক
পরবর্তী নিবন্ধচট্টগ্রাম বন্দরে সম্পূর্ণ অনলাইন রেভিনিউ কালেকশন ব্যবস্থা চালু