পর্যটন ও উপকূল সুরক্ষা একই সুতোয় গেঁথে পারকি সৈকতের জন্য বড় প্রকল্প গ্রহণ করে অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। পারকি সমুদ্র সৈকত ও উপকূলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ৫৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে যুগান্তকারী প্রকল্পটি অনুমোদনের পর যথাসময়ে বাস্তবায়ন করা গেলে দীর্ঘ দিনের অবহেলিত পারকি সমুদ্র সৈকতের দুর্নাম মুছে আধুনিক সৈকতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট বিভাগের। শুধু তাই নয় আগামীতে এ প্রকল্প প্রস্তাবিত মেরিন ড্রাইভ প্রকল্পে সংযুক্ত হয়ে কক্সবাজারের সাথে এই সৈকতের সরাসরি যোগাযোগের পথ সুগম হবে বলেও জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
জানা গেছে, এই প্রকল্পে সৈকতের ঝাউবন রক্ষা, সাগর তীর সংরক্ষণ, টেকসই সুপার ডাইক বেড়িবাঁধ, খাল খনন, পানি নিষ্কাষণ অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সড়ক নির্মাণসহ পারকি সৈকতকে আধুনিকায়নের জন্য নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করার পর পারকি সমুদ্র সৈকত পর্যটন খাতে দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা পালন করবে। এলাকার সচেতন মহল, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের দাবি, অতি দ্রুত যেন প্রকল্পটি অনুমোদনপূর্বক বাস্তবায়নে কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।
জানা যায়, ১৯৯৩–৯৪ এবং ২০০২ সালে পারকি সৈকত এলাকায় বনবিভাগ প্রায় ৮০ হেক্টর জায়গা জুড়ে ঝাউ গাছ রোপণ করার পর ঝাউগাছগুলো বড় হয়ে পারকি সৈকতের সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও পর্যটকদের মূল আকর্ষণে পরিণত হয়। সারি সারি ঝাউ বাগান ঘিরে পারকি পরিণত হয় পিকনিক স্পটে। কিন্তু গত এক যুগের বেশি সময় ধরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বঙ্গোপসাগরের তীব্র স্রোতের কারণে মনমুগ্ধকর সৈকতটির শত শত ঝাউ গাছ বিলুপ্ত হলে পর্যটক হারাতে শুরু করে এ সৈকত। দীর্ঘদিন ধরে ঝাউ গাছগুলো বাঁচাতে এলাকাবাসী দাবি জানালেও বিগত সময়ে কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। অবশেষে পারকি সৈকতকে বাঁচাতে এক যুগান্তকারী প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে এসেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড এমন খবরে স্থানীয় ব্যবসায়ী এবং পর্যটকদের মাঝে খুশির আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, প্রতিবছর সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসের কারণে ঝাউবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বেড়িবাঁধ ভেঙে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সৈকতের জীববৈচিত্র্য বিলুপ্ত হতে থাকে। গত কয়েক বছর ধরে সৈকতের ঝাউবন ধ্বংস হচ্ছে। ফলে পর্যটকরা দিন দিন আগ্রহ হারাচ্ছে সৈকতে। এরই মাঝে স্বস্তির খবর হচ্ছে পারকির সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। সৈকত ঘিরে পর্যটনশিল্পের বিকাশে একগুচ্ছ অবকাঠামোগত উন্নয়নের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পটির মাধ্যমে সৈকতের প্রাকৃতিক ঝাউবন রক্ষার পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সৈকতকে বাঁচাতে টেকসই সুপার ডাইক বেড়িবাঁধ নির্মাণসহ একগুচ্ছ পরিকল্পনা করা হয়েছে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সঙ্গে টেকসই উন্নয়ন ও পর্যটন সেক্টরে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে ৫৪৮ কোটি ১৯ লাখ টাকার এ প্রকল্প বাস্তবায়ন উপকূলের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
প্রকল্পটিতে উপকূলকে সুরক্ষিত করতে ৩২০ কোটি টাকা ব্যয়ে পারকি উপকূলের প্রায় তিন কিলোমিটার সাগরপাড়ের তীর সংরক্ষণ ও শক্তিশালীকরণ করার পাশাপাশি ৫৭ কোটি টাকা ব্যয়ে পারকির সাড়ে তিন কিলেমিটার সুপার ডাইক বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হবে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে সৈকত ছাড়াও উপকূলীয় বারশত এবং রায়পুর ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষা পাবে এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের (আনোয়ারা) উপ–বিভাগীয় প্রকৌশলী বর্ণ হক জানান, পারকি সমুদ্র সৈকত রক্ষায় ৫৪৮ কোটি ১৯ লাখ টাকার মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে পানি উন্নযন বোর্ড। ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে প্রকল্পটি। তিনি বলেন, এ প্রকল্পের মাধ্যমে পারকি উপকূল থেকে কর্ণফুলীর মোহনা পর্যন্ত টেকসই আধুনিক ব্লক বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও তীর সংরক্ষণ ছাড়াও প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে ১ দশমিক ৫০ মিটার থেকে ১ দশমিক ৮০ মিটার পানি নিষ্কাশন অবকাঠামো ১৪ (২–ভেন্ট) নির্মাণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। শুধু তাই নয় এ প্রকল্পের মাধ্যমে ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩০ হেক্টর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও নদী তীরের মধ্যবর্তী উন্মুক্ত ভূমিতে সবুজ বনায়ন করে ঘন ঝাউবন সৃষ্টি করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এছাড়া ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রায় পৌনে তিন কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ পরিকল্পনা, তিন কোটি টাকা ব্যয়ে ১ দশমিক ৬০০ কিলোমিটার সাপমারা খাল খনন, ১৪৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ভূমি অধিগ্রহণ ও অফিস ভবন নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, ইনশাআল্লাহ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন কাজ শেষ হলে পারকি সৈকত আধুনিকায়নের মাধ্যমে নতুন রূপে পর্যটকদের মাঝে ফিরে আসবে। দেশের অর্থনীতিতে এই সৈকত বড় ভূমিকা রাখবে। এবং পর্যটন সুবিধা অনেক বেড়ে যাবে।
চট্টগ্রাম ১৩ (আনোয়ারা কর্ণফুলী) আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম জানান, পারকি সৈকতের উন্নয়নে পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক ৫৪৮ কোটি টাকার গৃহীত উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। এই ব্যাপারে পর্যটন মন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ করে দ্রুত প্রকল্প অনুমোদনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।












