২৭ হাজার টনের বেশি অকটেন নিয়ে দেশের ইতিহাসে পরিশোধিত জ্বালানি তেলবাহী সর্ববৃহৎ জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে। জাহাজটি থেকে বহির্নোঙরে অকটেন লাইটারিং করা হবে। এই লাইটারিং কার্যক্রম ঠিকভাবে সম্পন্ন করানোর জন্য অপর একটি বিদেশি জাহাজকে গত প্রায় দশ দিন ধরে বহির্নোঙরে অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছে। দেশে ডিজেল অকটেনসহ প্রচুর জ্বালানি তেলের মজুদ রয়েছে। আজ ৬৭ হাজার টনের বেশি ডিজেলসহ আরো দুটি জাহাজ বন্দরে পৌঁছাচ্ছে। আগামীকাল এবং পরশু আরো এক লাখ টনের বেশি ডিজেল এবং জেট ফুয়েল দেশে আসছে। ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন সীমিত হয়ে পড়ায় পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি বাড়িয়ে দেশের সরবরাহ চেইন ঠিক রাখার চেষ্টা চলছে। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিদেশি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় সহায়তা অব্যাহত রেখেছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে বিদেশি মাদার ভ্যাসেল থেকে অপর একটি মাদার ভ্যাসেলে লাইটারিং করে আজ অকটেনের একটি চালান বিপিসির ডিপোতে দেওয়া হবে। এর আগে আর কখনো এভাবে অকটেন সরবরাহ নেওয়া হয়নি উল্লেখ করে সূত্র জানিয়েছে, মালয়েশিয়া থেকে ২৭ হাজার ৩৬৩ টন অকটেন নিয়ে এমটি ন্যাভ সিয়েলো নামের একটি মাদার ট্যাংকার গত ১৭ এপ্রিল বহির্নোঙরে পৌঁছে। ২২০ মিটার লম্বা এবং সাড়ে ৯ মিটার ড্রাফটের জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেলে প্রবেশ করতে পারবে না। এটিকে বহির্নোঙরে অবস্থান করে অকটেন খালাস করতে হবে। কিন্তু জাহাজ থেকে অকটেন খালাসের টেকনিক্যাল বিষয়টি জটিল হওয়ায় এই তেল লাইটারিং করার জন্য অপর একটি বিদেশি জাহাজকে দশ দিন ধরে বহির্নোঙরে অপেক্ষমাণ রাখা হয়। এমটি সেন্ট্রাল স্টার নামের ১৮৩ মিটার লম্বা ওই জাহাজটি ৮ এপ্রিল ২৬ হাজার টন অকটেন নিয়ে চট্টগ্রামে এসেছিল। গুপ্তাখাল জেটিতে ওই জাহাজ থেকে তেল খালাসের পর সেটিকে বিদেশে ফেরত না পাঠিয়ে এমটি ন্যাভ সিয়েলোর অকটেন খালাসের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়। দুটি বিদেশি জাহাজ আজ পরস্পরের পাশে দাঁড়িয়ে ২৭ হাজার টন অকটেন লাইটারিং করবে।
দেশে এই দৃশ্য এর আগে আর দেখা যায়নি বলে জানিয়েছেন বিদেশি জাহাজ দুটির স্থানীয় এজেন্ট প্রাইড শিপিং লাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, এর মধ্যে এমটি ন্যাভ সিয়েলো সায়মন আইল্যান্ডের এবং এমটি সেন্ট্রাল স্টার মার্শাল আইল্যান্ডের পতাকাবাহী। মাত্র এগারো দিনের ব্যবধানে প্রায় ৫৪ হাজার টন অকটেন দেশে পৌঁছেছে। এই তেল আগামী এক মাসের বেশি সময়ের চাহিদা মেটাবে বলেও সূত্র জানিয়েছে।
উল্লেখ্য, দেশে নিজস্ব উৎস থেকেও অকটেন উৎপাদিত হয়। চাহিদার মাত্র ২০ শতাংশ অকটেন আমদানি করতে হয়। মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে ৫৪ হাজার টন আমদানিকৃত অকটেনের সাথে দেশীয় উৎস থেকে প্রাপ্ত অকটেন থাকায় সংকটের আশঙ্কা অমূলক বলে বিপিসির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা মন্তব্য করেছেন।
সূত্র জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর দেশে কোনো ক্রুড অয়েলের চালান আসেনি। ফলে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত একমাত্র জ্বালানি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তবে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের যোগান বাড়িয়ে দেশে পর্যাপ্ত মজুদ গড়ে তোলা হয়েছে। বিপিসি জানিয়েছে, ৮ ফেব্রুয়ারির পর থেকে গতকাল পর্যন্ত সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াভিত্তিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো পর্যাপ্ত জ্বালানি তেলের যোগান দিয়ে চলেছে। এর মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার বুমি সিয়াক পাসাকো (বিএসপি) ১ লাখ ৭১ হাজার ৪৯৪ টন ডিজেল, ২৫ হাজার ৮৬৪ টন ফার্নেস অয়েল এবং ২৭ হাজার ৩৬৩ টন অকটেনসহ মোট ২ লাখ ২৪ হাজার ৭২১ টন জ্বালানি তেলের যোগান দিয়েছে।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিটল ৩৩ হাজার টন জেট ফুয়েল, ৮৫ হাজার ২২০ টন ফার্নেস অয়েল, ২৬ হাজার ১ টন অকটেন এবং ২৭ হাজার ৩৫৬ টন ডিজেল মিলে মোট ১ লাখ ৭১ হাজার ৫৭৭ টন জ্বালানি তেল সরবরাহ দিয়েছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক ইউনিপ্যাক ২ লাখ ৩৫ হাজার ৭৩৮ টন ডিজেল এবং ৯ হাজার ২৭৭ টন জেট ফুয়েলসহ মোট ২ লাখ ৪৫ হাজার ৩৫ টন জ্বালানি তেল সরবরাহ দিয়েছে।
বিপিসির দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, ক্রুড অয়েল আমদানি না হলেও পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি হয়েছে ৬ লাখ ৪১ হাজার ৩৩৩ টন। তিনটি বিদেশি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিপিসি এই তেল আমদানি করেছে। এতে করে দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত গড়ে উঠেছে। শুধুমাত্র পেনিক বায়িং এবং অবৈধ মজুতদারির জন্য হাহাকার চলছে।
বিপিসির আমদানিকৃত জ্বালানি তেল পরিবহনে ব্যবহৃত জাহাজগুলোর স্থানীয় এজেন্ট প্রাইড শিপিং লাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রচুর তেল দেশে পৌঁছেছে। আরো অনেক তেল সরবরাহ লাইনে রয়েছে। আজ এমটি প্যাসিফিক ইন্ডিকো নামের একটি জাহাজ ৩৩ হাজার টন এবং এমটি এফপিএমসি–৩০ নামের অপর একটি জাহাজ ৩৪ হাজার ৩৫৩ টন ডিজেল নিয়ে বহির্নোঙরে পৌঁছাবে। এছাড়া আগামীকাল এমটি হাফনিয়া চিয়া নামের একটি জাহাজ ৩৩ হাজার ৪০৫ টন ডিজেল নিয়ে বহির্নোঙরে নোঙর করবে। আগামী ২৩ এপ্রিল এমটি কোয়েটা নামের একটি জাহাজ ৩৩ হাজার টন ডিজেল এবং ২৪ এপ্রিল এমটি জিংটন–৭৯৯ নামের একটি জাহাজ ৩৩ হাজার টন জেট ফুয়েল নিয়ে চট্টগ্রামে পৌঁছাবে। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকে আসা এসব জাহাজ এখন বাংলাদেশের জলসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে।














