চট্টগ্রামে কবি আল মাহমুদ : স্মৃতির ক্যানভাসে দেখা

মোসতাক খন্দকার | শনিবার , ১১ জুলাই, ২০২৬ at ১০:৫৪ পূর্বাহ্ণ

আশিনব্বই দশকের শেষের দিকে কবি আল মাহমুদ খুব বেশি বেশি চট্টগ্রাম আসতেন। চট্টগ্রামের মানুষের আতিথেয়তা তিনি খুব উপভোগ করতেন। চট্টগ্রাম ছিল তাঁর স্বপ্নের জায়গা। চট্টগ্রামে আসলেই ছুটে যেতেন সমুদ্রের কাছে। তাঁর লেখায় যে সমুদ্রকে তিনি নাম দিয়েছিলেন ‘তৃষিত জলধি’। চট্টগ্রামে একটা বাড়ি করার কথা বারবার বলতেন তিনি। এই নগরীতে কবি আল মাহমুদ আমন্ত্রিত হয়ে নানা অনুষ্ঠানে আতিথ্য গ্রহণে ব্যস্ত থাকলেও তাঁর একান্ত সান্নিধ্যলাভের সুযোগ হতো এবং আড্ডা চলতো। [চট্টগ্রামে আসলে কেন জানি না আমাকেই ডেকে নিতেন। এমন কোনদিন হয়নি কবি আল মাহমুদ চট্টগ্রাম এসেছেন কিন্তু আমাকে স্মরণ করেননি কিংবা তাঁর সঙ্গ মেলেনি। অনেকেই আমাকে কবির চট্টগ্রামস্থ প্রতিনিধি বলে মজা করতেন। ১৯৮৮ সালের আমার আবৃত্তি সংগঠন ক্বণন শুদ্ধতম আবৃত্তি অঙ্গনের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির অনুষ্ঠানে, ১৯৯৮ সালে, ২০০০ সালে এবং ২০০৬ সালে বিশ বছর পূর্তি উৎসব এই চারটি বড় আয়োজনে কবি আল মাহমুদকে প্রধান অতিথি হিসাবে পাবার সৌভাগ্য হয়েছিল। এছাড়াও আরও কিছু আয়োজনে তিনি আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন। তখন তাকে খুব কাছে পাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। চট্টগ্রামে আসলে আল মাহমুদ ভাই কারও বাসায় থাকতে পছন্দ করতেন। তেমন একটি উল্লেখযোগ্য বাসা ছিল চট্টগ্রামের বিশিষ্ট শিল্পপতি ও সংগীত অনুরাগী আকবর খানের পাঁচলাইশের বাসাটি। অনেক দেশবরেণ্য ও আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বের সাময়িকভাবে বসবাসের কারণে আকবর খানের পাঁচলাইশের বাসাটি ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। এছাড়াও তিনি চট্টেশ্বরী রোডে হারুন শেঠ এবং রহমতগঞ্জে কবি মুস্তাফা মুনীরুদ্দীনের বাসায়ও থেকেছেন।

১৯৯০ সালের ২১ জুন। ওইদিন বিকেলে কবি আল মাহমুদ আন্দরকিল্লায় ‘গ্রন্থবিতান’ নামে আমাদের বইয়ের দোকানে এসেছিলেন। তখন গ্রন্থবিতান কবিলেখকদের আকর্ষণের কেন্দ্র এবং আড্ডার জায়গা ছিল। আল মাহমুদ গ্রন্থবিতানে এসেই আমার নাম ধরে ডাক দিলেন, বললেন – ‘চল, নিউমার্কেটে যাবো’। আমি রিক্সা নিতে চাইলাম, বললেন হেঁটে যাবেন এবং ঐতিহাসিক লালদিঘি মাঠ হয়ে যাবেন। লালদিঘির মাঠ সংলগ্ন ফুটপাতে পা রাখতেই বললেন, তিনি মাঠের ভেতর দিয়েই হেঁটে যাবেন। একটু অবাক হলাম। হাঁটতে হাঁটতে সরকারি মুসলিম হাই স্কুল, কোতোয়ালি থানা অতিক্রম করে পাথরঘাটা আর ফিরিঙ্গবাজারের মুখে আসতেই কবি থমকে দাঁড়ালেন। আমি বুঝতে পারলাম, কবি আল মাহমুদ স্মৃতিকাতর হয়ে গেছেন। কারণ আমি কবির আত্মজৈবনিক স্মৃতি, অনেকের স্মৃতিচারণ এবং তাঁর সাথে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় জেনেছি এই এলাকাতেই আল মাহমুদ ভাইয়ের যৌবনকালের একটা গুরুত্বপূর্ণ সময়ের দারিদ্র্য আর স্বল্প বেতনের পেশাগত ও যাপিত জীবন ছিল। হয়তোবা তাঁর স্মৃতির ক্যানভাসে ভেসে উঠেছে বইঘর স্বত্বাধিকারী সৈয়দ মোহাম্মদ শফি, সিগনেট প্রেস, ইউসুফ চৌধুরী, সাধুর মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, গল্পকার সুচরিত চৌধুরী, বিখ্যাত গায়ক শ্যামসুন্দর বৈষ্ণব প্রমুখের কথা। আর বহুলপঠিত ও জনপ্রিয় ‘সোনালী কাবিন’ এবং ‘পাখির কাছে ফুলের কাছে’ গ্রন্থের কবিতাগুলো রচনার কথা। ‘আহ্‌হা’ বলে একটা আবেগময় দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাঁটতে শুরু করলেন। আমরা নিউমার্কেট পৌঁছে একটু ঘোরাঘুরি করে দোতলায় আইসক্রিম শপ লিবার্টিতে বসলাম এবং লিবার্টির স্পেশাল ফালুদা খেলাম। একটু পরেই আবার ফিরে আসলাম রহমতগঞ্জে কবি মুস্তাফা মুনীরুদ্দীনের বাসায়। চেইঞ্জ করে কাগজ নিয়ে বসলেন এবং কী যেন লিখে চললেন। লেখাটা শেষ করেই আমার হাতে দিলেন পড়তে। আমি পড়লাম। যদিও কথাগুলো আমার জন্য বিব্রতকর এবং সংকোচের তবুও এখানে উল্লেখ করছি। কারণ আজকের দিনে কথাগুলো তাঁর সাহচর্যের অনন্য ও মূল্যবান স্মারক। তিনি লিখেছেন – ‘মোসতাক মানেই হল, চট্টগ্রাম। যখনই ভাবি চাটগাঁ বেড়াতে যাব। তখনই কয়েকটা আত্মীয়ের মুখ মনের আয়নায় ভেসে ওঠে। এর মধ্যে মোসতাকের বন্ধুসুলভ সুন্দর মুখটি সবার আগে। এবার মোসতাককে নিয়ে ঘুরলাম পরিচিত এমন একটা পায়ে চলা পথে যে পথের সাথে জড়ানো রয়েছে আমার জীবনের দিকনির্ণায়ক কত স্মৃতি। স্মৃতি, প্রেম ও পাপ। মোসতাক অবশ্য এসবের কিছুই জানেনা। লালদিঘির পাশের রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে মনে মনে বললাম, কেমন আছো লালদিঘি? মনে নেই, তোমার জবাফুলের গাছগুলোর আড়ালে সে দাঁড়িয়ে আমাকে কি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল? আস্তে বলো, মোসতাক শুনতে পাবে। আর সে শুনলে সে কি চাইবে আমি ফের চাটগাঁ আসি?’ এমন আরও অনেক স্মৃতি আছে যা পত্রিকার সীমিত পরিসরে লেখা সম্ভব নয়, গ্রন্থে ধারণ করার প্রয়োজন রয়েছে।

আমি মূলত আবৃত্তিশিল্পের মানুষ। আবৃত্তিশিল্পের সাথেই আমার ৪২ বছরের বসবাস। কবি আল মাহমুদ আমার ভীষণ ভাল লাগা প্রিয় কবি। দারুণ মুগ্ধতার সাথে এই কবির কবিতার পর কবিতা আবৃত্তি করেছি। বলা যায় এই আবৃত্তিই কবি আল মাহমুদের সাথে আমার নিবিড় সম্পর্কের সেতুবন্ধন তৈরি করে দিয়েছিল। আল মাহমুদ নামটি আমার অনেক আবেগ, অনেক স্মৃতি, ভীষণ ভালবাসার সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে লেপ্টে আছে।

লেখক: আবৃত্তি শিল্পের শিক্ষক, সভাপতি, ক্বণন, সিনিয়র সহকারী পরিচালক, জনসংযোগ, আইআইইউসি

পূর্ববর্তী নিবন্ধকর্ণফুলীতে ব্রাজিলের তৈরি ৯ এমএম পিস্তল উদ্ধার
পরবর্তী নিবন্ধহল্যান্ড থেকে