ইদানীং সমাজের সর্বত্র ক্ষমতার মোহ বা নেতৃত্বের লোভ মারাত্মক ব্যাধি হিসাবে দৃশ্যমান। মোহগ্রস্ত হওয়ার কারণে এটি মানুষের বিবেককে বিভ্রান্তির পথে ঠেলে দেয় এবং সমাজ, রাষ্ট্র, এবং প্রতিষ্ঠানকে বিশৃঙ্খলা ও বিপর্যয়পূর্ণ পরিস্থিতির মুখে দাঁড় করায়। মানুষ নীতিজ্ঞাণহীন হয়ে পড়ে বিধায় দুর্নীতি, অনিয়ম, অন্যায় ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। ক্ষমতার মোহে মানুষ অনৈতিক পার্থিব লাভ ও ইহকালের সাময়িক সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে।
অনৈতিকভাবে ক্ষমতালাভের স্বপ্ন মানুষের মাঝে অসহিষ্ণুতা, দ্বন্দ্ব ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্ম দেয়। তখন অনায়াসে ক্ষমতা লাভের প্রচণ্ড লোভ সমাজ, রাষ্ট্র এবং প্রতিষ্ঠানের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। ক্ষমাতালিপসু ও অর্থলিপসু ব্যক্তির কারণে প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড বাধাপ্রাপ্ত হয়। এসব ক্ষমতা পাগল ব্যক্তিরা উর্ধ্বতন কর্তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকে। দ্বিমুখী চরিত্রের অধিকারী এসব ব্যক্তি সহপাঠী, কর্তব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষের মাঝে বিভাজন বা ভুল বোঝাবোঝি সৃষ্টি করে কর্তাব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করার হীন চক্রান্তে লিপ্ত থাকে। এ লোকগুলো বিদ্যাচর্চা বা জ্ঞানচর্চায় উদাসীন এবং বিদ্যা ও জ্ঞানের অনুশীলন ও প্রয়োগে ততই উদাসীন যতবেশি পারদর্শী বিদ্যা ও জ্ঞানের অপব্যবহারে। তারা অপ্রয়োজনীয় কাজে শ্রম বিনিয়োগ করে মিথ্যাকে সত্য সাজিয়ে, অন্যায়কে ন্যায় বানিয়ে সর্বত্রই প্রতিষ্ঠা পেতে মরিয়া হয়ে ওঠে। ক্ষমতার মোহ, ব্যক্তিগত স্বার্থ, অনৈতিক সুযোগ সুবিধা লাভ তাদের কাছে মুখ্য, যেখানে সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও প্রতিষ্ঠানিক স্বার্থ গৌণ। এ ধরনের লোকগুলো অনৈতিক পন্থায় ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার দুর্দমনীয় লোভে পড়ে নিজের আখের গোছাতে বেশী যত্নবান। সর্বক্ষণ চিন্তায় থাকে কিভাবে রাতারাতি বিত্তশালী হয়ে উঠবে, প্রয়োজনে পরের নাম বিক্রি করে বা পরের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে হলেও।
আসলে ক্ষমতার মোহ মানব চরিত্রের একটি কলঙ্কজনক ও ধ্বংসাত্মক ব্যধি। এটি মানুষকে নীতিবোধ, মানবিকতা ও জবাবদিহিতার কথা ভুলিয়ে দেয়। ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে মানুষ প্রায়শই বিবেক বর্জিত হয়ে পড়ে। ক্ষমতালোভীরা বুঝতে পারে না যে ক্ষমতার জৌলুস মানুষকে সাময়িকভাবে অন্ধ করে দেয়, যারফলে নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ব ও জবাবদিহিতার কথা বেমালুম ভুলে যায়। তারা সৌজন্যবোধ, লজ্জাবোধের মাথা খেয়ে নিজেদের সীমিত জ্ঞানের অহংবোধ নিয়ে জ্ঞানী–গুণীদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে খাটো করার অপচেষ্টায় লিপ্ত থাকে। ইসলামে ক্ষমতা এবং নেতৃত্বের লোভকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। অনিয়য়মতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার অপচেষ্টা থেকে নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়াই শ্রেয়। ক্ষমতার লোভ মানুষকে উচ্চাবিলাসী করে তুলে। নমরুদ ফেরাউন তো ক্ষমতার দাপটে নিজেকে খোদা বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের ক্ষমতা টিকে থাকেনি। অপদস্ত হয়ে তাদেরকে দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল। মোগল সম্রাট হুমায়ুন তাঁর হাতে নিযুক্ত বাংলার গভর্নর শের খানের হাতে পরাজিত হয়ে পথে পথে ঘুরেছিলেন। বলা হতো বৃটিশ সামরাজ্যের সূর্য অস্ত যায়না। শেষপার্যন্ত বৃটিশরা কলোনি গুটিয়ে সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরে গিয়েছিল। বাংলার নবাব সিরাজ উদৌল্লাহকে হত্যা করার পর মীরজাফর তো ক্ষমতা ভাগ করে যেতে পারেনি। বিস্বাসঘাতকতার কলংক মাথায় নিয়ে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল। তবুও মানুষ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়না। ক্ষমতার লোভ মানুষকে অমোঘ সত্য ইতিহাস ভুলিয়ে দেয়। ক্ষমতার অহংকার থেকে যেমন দূরে থাকা উচিৎ, তেমনি অশিক্ষা, অযোগ্যতার মধ্য দিয়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার অশুভ, অনৈতিক তৎপরতা থেকে দূরে থাকা প্রয়োজন। ক্ষমতা জোর করে ছিনিয়ে নেওয়ার বিষয় না, শিক্ষা, নৈতিকতা ও যোগ্যতার মাধ্যমে ক্ষমতা অর্জন করতে হবে।
নেতৃত্বের লোভ এবং ক্ষমতার মোহ মানুষকে এমনভাবে মোহগ্রস্ত করে যে মানুষ তখন সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা, আশেপাশের মানুষের প্রতি তাদের কাঙ্ক্ষিত ও করণীয় দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা ভুলে যায়। নিরন্তর ব্যস্ত থাকে অবৈধভাবে অর্থ সম্পদ উপার্জনের হীন কৌশল নিয়ে। এক্ষেত্রে তারা ভুলে যায় নীতি, নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের কথা। কাজেই নৈতিকতার কবর রচনা করে বিবেকের অসম্মান ঘটিয়ে যারা বিভেদ, বিভাজন সৃষ্টি করে এসব অপকর্ম করে তাদের শিক্ষাগত সনদ, উচ্চতর ডিগ্রি সমাজ, রাষ্ট্র এবং জনগণের কাছে নিন্দার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অশুভ চিন্তা – চেতনা নিয়ে এসব মানুষ সকলকে অন্ধ ভেবে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে ভালো এবং মহৎ সাজার চেষ্টা করে। কিন্তু কথায় আছে, পাপ বাপকে ছাড়ে না। তাদের অপকর্মের শাস্তি একসময় তাদেরকে ভোগ করতেই হবে। কারো কারো অভাবের কারণ এসব ঘৃণিত চৌর্য বৃত্তি অবলম্বনের প্রেরণা যোগায়। আবার কারো কারো ক্ষেত্রে পারিবারিক সঠিক শিক্ষার অভাব অর্থ সম্পদের প্রতি অনৈতিকভাবে কিছু কিছু মানুষের মনে লোভের আগ্রহ জোগায়। নীতিবোধ হারানোর এসব অপকর্ম তাদের মজ্জাগত স্বভাবে পরিণত হয়। এদের কাছে মানুষের সম্মান, শ্রদ্ধা, আন্তরিকতা ও স্নেহ ভালোবাসার কোনো মূল্যই নেই। লোভ–দ্বেষ–মোহ এদেরকে প্রতিহিংসা পরায়ন ও হিংস্র করে তুলে। লোভ ও মোহের বশবর্তী হয়ে সহজ উপায়ে প্রতিষ্ঠা লাভের লক্ষ্যে এরা বেপরোয়া হয়ে উঠে। সম্মানী ব্যক্তিকে সম্মান করা, রাষ্ট্র, সমাজ ও প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষায় এরা শুধু উদাসীন নয় বরং দারুণভাবে ব্যর্থ। তাই নীতিজ্ঞানহীন, ক্ষমতালোভী ও অর্থোলোভী ব্যক্তিদের সংযম ও সহনশীলতা অনুশীলন করা খুবই প্রয়োজন। রাতারাতি আকাশচুম্বি সফলতার অলীক স্বপ্নে বিভোর না থেকে তাদের সমাজের নিচু তলায় বাসকরা হতদরিদ্র জনগণের দিকে তাকানো প্রয়োজন। এসব লোকদের স্বপ্ন দুবেলা দুমুঠো খেয়ে সাধারণ পোশাক পরিধান করে একটু শান্তিতে ঘুমানো। পেটের ক্ষিধায় অস্থির এসব মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করলেও বিলাসী ও ঐশ্বর্যময় জীবনের স্বপ্ন দেখে না। কাজেই সমাজের কিছু লোক বিশেষ করে শিক্ষা সংস্কৃতির ধ্বজাধারী ব্যক্তিগণ যারা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার দুঃস্বপ্নে মেতে ওঠে, তাদেরকে প্রচলিত প্রবাদটি ‘আয় বুঝে ব্যয় কর’ চর্চা করা প্রয়োজন। বৌদ্ধ শাস্ত্রে উল্লেখ আছে ‘সন্তুষ্টি পরম ধন’। এই আপ্ত বাক্যটির মর্মার্থ আমাদের অনুধাবন করা প্রয়োজন।
সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলে তারা ন্যায়নীতি, সৌজন্যবোধ, ভদ্রতা, নম্রতা – এসব আদর্শিক গুণগুলোকে গুরুত্ব দেয় না বিধায় সময়মতো ভালোকাজের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা অর্জনের প্রয়াস, প্রচেষ্টা, আগ্রহের প্রতিও উদাসীন থাকে। অন্যদিকে লোভের মোহে দুর্নীতির পথ বেছে নিতে আগ্রহী হয়ে পড়ে। ব্যর্থ হয়ে এসব লোককে কখনো আবার নতজানু হয়ে অতিভক্তি দেখাতে লক্ষ্য করা যায়। এরা মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে অযোগ্যতার দায়ভার অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে দ্বিধাবোধ করেনা। মিথ্যা, কপটতা, চৌর্যবৃত্তির স্বভাব এদের আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে বিধায় সীমিত জ্ঞান নিয়ে ভালো কিছু, মহৎ কিছু শেখার আগে দুর্নীতির কৌশলগুলো শিখে নেয়। সুশিক্ষা ও সৎকর্ম চর্চা এরা করেনা বিধায় অশান্তি ও অস্বস্তিতে ভোগে।
সুতরাং, মানবতার স্বার্থে সুন্দর পৃথিবীতে সুস্থ সুন্দর পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে এবং পরবর্তী প্রজন্মকে সৎ জীবন যাপন, সুশিক্ষার আলোকে নীতি নৈতিকতার বিধান মেনে লোভ–দ্বেষ–মোহ ধ্বংস করার আদর্শে সুশিক্ষিত করে তুলতে হবে। তাদেরকে শেখাতে হবে অন্যায় দুর্নীতির পথে ক্ষমতা অর্জন নয়, লোভ, মোহ ধ্বংস করে শিক্ষা, দক্ষতা, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার আলোকে মানুষকে ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছাতে হবে। অন্যথায় দেশ, জাতি, সমাজ, প্রতিষ্ঠান ক্ষমতা ও লোভের হিংস্র থাবায় ধ্বংসের মুখোমুখি হবে।
লেখক : শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট, প্রাক্তন অধ্যক্ষ, রাংগুনিয়া সরকারি কলেজ, চট্টগ্রাম ও বর্তমানে রেক্টর, বনফুল আদিবাসী গ্রীনহার্ট কলেজ, মিরপুর, ঢাকা।











