বিশ্বের মুসলিম প্রধান দেশগুলোর একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন হচ্ছে ওআইসি। ইসলামিক সহায়তা সংস্থা (ওআইসি) বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম আন্তর্জাতিক সংগঠন এর অবস্থান জাতিসংঘের পরেই। বর্তমানে চারটি মহাদেশের অন্তত ৫৭টি মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করছে ওআইসি। সমগ্র মুসলিম বিশ্বের শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে চেষ্টা করে যাচ্ছে সংস্থাটি। তার মূল লক্ষ্য সব শ্রেণির মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ রাখা। এরই ফলশ্রুতিতে বৈশ্বিক অঙ্গনে অবিস্মরণীয় কিছু কৃতিত্ব স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে সংস্থাটি। ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠাকে ওআইসির অন্যতম অর্জন হিসেবে গণ্য করা হয়। পূর্বে সংস্থাটির নাম ছিল ইসলামি সম্মেলন সংস্থা। ১৯৬৯ সালে গঠিত সংস্থাটিতে ৫৭টি দেশ প্রতিনিধিত্ব করছে যার মধ্যে ৪৯টি মুসলমান প্রধান দেশ। সংস্থাটির মতে তারা ‘মুসলিম বিশ্বের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর’ হিসেবে এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও সম্প্রীতি প্রচারের চেতনা নিয়ে মুসলিম বিশ্বের স্বার্থ ধারণ ও সুরক্ষায় কাজ করে থাকে।
বর্তমানে মুসলমানরা অনেক স্বাধীন রাষ্ট্রের অধিকারী। অর্ধশতাব্দী আগে তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের কয়েকজন নেতা মুসলিম ঐক্যের একটি বিরাট প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দিয়েছিলেন যার ওপর দাঁড়িয়ে আধুনিক মুসলিম বিশ্ব উম্মাহর ঐক্যকে আরো কার্যকরভাবে সুসংহত করতে পারে। ইসলাম ও মুসলিম স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যুতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ওআইসির সম্মিলিত ভূমিকা পালনে চেষ্টা করা উচিত। ওআইসি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সম্পদের সহজ প্রবাহ অপেক্ষাকৃত ধনী রাষ্ট্রগুলো কর্তৃক দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোকে সাহায্য দান এবং ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশে চেষ্টা চালানো উচিত। ক্ষুধার্তকে খাদ্য দেয়া ইসলামের নির্দেশ। মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে পৃথিবীর দরিদ্র এলাকা গুলোতে দারিদ্র্য পীড়িত জনগণের ক্ষুধা নিবারণসহ জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ওআইসির প্রচেষ্টা চালানো উচিত। মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আন্ত:রাষ্ট্র বিরোধ কিংবা যে কোনো দ্বন্দ্ব–সংঘাত নিরসনে এবং যে কোনো সদস্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার সংরক্ষণে ওআইসির ভূমিকা পালন করাই প্রত্যাশিত।
জাতীয় স্বার্থে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য প্রতিষ্ঠায় মধ্যপ্রাচ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে তারা মুসলিম দেশগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে ওআইসি কাজ করে যাচ্ছে, ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক কিংবা আরব লীগ, গালফ্ কো–অপারেশন কাউন্সিলও (জিসিসি) কাজ করে আসছে। ডিএইচ সম্মেলনেও মুসলিম দেশগুলোর একটা গুরুত্ব আমরা লক্ষ্য করি, মুসলিম দেশগুলোর এক ধরনের প্রাধান্য আছে। যার ফলে মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর ভেতরে এক ধরনের ঐক্য তৈরির ক্ষেত্রে ধর্মীয় বোঝাপড়া বা ধর্মীয় অনুষঙ্গ এখানে কাজ করে। মুসলিম বিশ্বের সাংগঠনিক ঐক্যের পাশাপাশি অনৈক্যের বিপরীত চিত্রও লক্ষ্য করা যায়। কারণ বিশ্বের অনেক মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে পরস্পরের প্রতি এক ধরনের প্রতিযোগিতা কিংবা পরস্পরের প্রতি এক ধরনের অবিশ্বাস কাজ করে যাচ্ছে। যার ফলে একে অপরের প্রতি বিভক্তি বাড়ছে অনৈক্যের সৃষ্টি হচ্ছে। আর এ সব কারণে অনেক সময় উপহাস করে বলা হয় ওআইসির মতো সংগঠন বা সংস্থা কোনো কাজই করছে না। ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক কিংবা আরব লীগ এমনকি গালফ কো–অপারেশন কাউন্সিল এ প্রতিষ্ঠানগুলোও মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে খুব একটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। যার ফলে মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোতে বিরাজমান যে অস্থিরতা তার সমাধানে তেমন কোনো কার্যকরী ভূমিকা আমরা দেখতে পাচ্ছি না। এ বিষয়টিই সব সময় সামনে চলে আসে। বিশেষ করে যে ইস্যুটি এক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য সেটি হলো প্যালেস্টাইন সমস্যা। এ ইস্যুটি একেবারে জ্বলন্তভাবে আমাদের সামনে উপস্থিত। প্যালেস্টানিয়ানদের এ সমস্যাটি ১৯৪৮ সাল থেকে শুরু হয়ে অদ্যাবধি চলে আসছে। মুসলিম দেশগুলোকে অনেকটা অঙ্গুলি নিদর্শন করে তারা সেখানে অবস্থান করে যাচ্ছে। বিষয়টি দেখেও যেন দেখার কেউ নেই। যার ফলে দীর্ঘ সময় ধরে এ সমস্যাটি চলমান আছে। মুসলিম বিশ্বের কোনো দেশই প্যালেস্টাইনের পক্ষে তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি।
মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ইরান, ইরাক, সৌদি আরব কিংবা তুরস্ক এ আঞ্চলিক শক্তির দেশগুলোর মধ্যে এক ধরনের প্রতিযোগিতা বিদ্যমান আছে। ফলে এখানে অনৈক্যের বার্তা বিরজমান। মুসলিম বিশ্বের প্রায় সব দেশের মধ্যেই এক ধরনের অস্থিতিশীলতা আছে এবং রাজনৈতিক সংকট কাজ করছে। পৃথিবীতে কম বেশি প্রায় ২০০ কোটি মুসলিম রয়েছে। শুধু ফিলিস্তিন নয় বিশ্বের বেশির ভাগ দেশেই মুসলিমরা মজলুম। হত্যাযজ্ঞ কিংবা নির্যাতনের শিকার। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার, ফিলিস্তিন, ইরাক, ইরান, বসনিয়া, চেসনিয়া, আফগানিস্তান, সুদানসহ আরো কতকগুলো রাষ্ট্র। জানামতে বিশ্বে পূর্ণাঙ্গ মুসলিম দেশ আছে প্রায় ষাটটির মতো। আছে ওআইসি’র মতো বিশ্ব মুসলিম সংস্থা। এ বিশাল জনগোষ্ঠী তথা প্রায় অর্ধ পৃথিবীর স্বত্বাধিকারী হওয়া সত্ত্বেও মুসলিমরা কেন নির্যাতিত হচ্ছে!
‘মুসলিম জাতি এক দেহ এক প্রাণ’ এই চেতনাবোধ দিনে দিনে ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে আসছে। এ পথ থেকে মুসলিম উম্মাহকে ফিরে আসতে হবে। মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ থাকার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলেই তারা তাদের পুরনো ঐতিহ্য ফিরে পাবে। বাংলাদেশ ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় শীর্ষ সম্মেলনে ওআইসির সদস্যপদ পায়। এই সদস্যপদ লাভের মধ্য দিয়ে মুসলিম বিশ্বের সাথে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠে। শুরু থেকে বাংলাদেশ ওআইসির বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে আসছে।
তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে তেলসমৃদ্ধ মুসলিম দেশগুলোতে বাংলাদেশের বিশাল জনশক্তি রপ্তানি যা কর্মসংস্থানসহ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ছাড়াও শিক্ষা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ওআইসির সদস্য দেশগুলোর সহযোগিতা লাভ করে আসছে। প্রতিবছর বাংলাদেশের বহুসংখ্যক লোক পবিত্র হজ্জব্রত পালনের জন্য সৌদি আরব যায়। তাছাড়া বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এবং পুরাতন মসজিদ সংরক্ষণের জন্য বাংলাদেশ ওআইসির কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা পায়। গাজীপুরে অবস্থিত ‘ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি‘ ওআইসির আর্থিক সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত হচ্ছে। বস্তুত বাংলাদেশ ওআইসির সদস্য হওয়ার পর থেকে এর নীতি ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। মুসলিম বিশ্বের উন্নয়ন সংহতির এবং ঐক্যের জন্য যে সংগঠনগুলো আছে বা যে ধরনের প্রতিষ্ঠান আছে সেগুলো কার্যকর করা খুবই জরুরি।
লেখক : ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট।











