জনসংখ্যাকে মানব সম্পদে রূপান্তরিত করতে হবে

সালাহউদ্দিন শাহরিয়ার চৌধুরী | শনিবার , ১১ জুলাই, ২০২৬ at ১০:৫৩ পূর্বাহ্ণ

বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর ১১ জুলাই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস পালন করা হয়। জনসংখ্যা বিষয় সচেতনতা বাড়ানো এবং উন্নয়নের লক্ষ্যে রেখে ১৯৯০ সাল থেকে জাতিসংঘ ও সদস্যদেশগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে এ দিবস পালন করে আসছে। পৃথিবীতে জনসংখ্যা কারো জন্য অভিশাপ আবার কারো জন্য আশীর্বাদ। এই বৈশ্বিক পৃথিবী পরিবেশ, জলবায়ু, অর্থনীতিসহ নানা বিষয়ে দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, আর এই পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হলো জনসংখ্যা। বিশ্বে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার, এমনকি মোট প্রজননহার (টিএফআর) ক্রমাগত কমে এলেও বৈশ্বিক জনসংখ্যার আকার বাড়ছে। ২০২৬ সালে বিশ্বের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৮.৩ বিলিয়ন বা ৮৩০ কোটিতে পৌঁছেছে। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ক বিভাগের (টঘ, উঊঝঅ) ওয়ার্ল্ড পপুলেশন হাইলাইটস ২০২৬ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের জনসংখ্যা বৃদ্ধির বর্তমান বার্ষিক হার প্রায় ০.৮৩ থেকে ০.৮৮ শতাংশ। এটি সমগ্র পৃথিবীর জন্য যেমন, বড় সম্ভাবনা ও তেমনি বড় চ্যালেঞ্জও বটে। ২০২৩ সালে ভারত চীনকে পেছনে ফেলে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশে পরিণত হয়েছে, ভারতের জনসংখ্যা এখন প্রায় ১৪৮ কোটি, চীন এখন দ্বিতীয় অবস্থানে নেমে গেছে চীনের জনসংখ্যা প্রায় ১৪১ কোটি। অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপকে সামাল দেওয়ার জন্য চীনের গৃহীত ব্যবস্থার কারণে চীনে জন্মহার হ্রাস এবং বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে তাদের জনসংখ্যা কমছে। তালিকার শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে রয়েছে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ ৩টিই দক্ষিণ এশিয়ার দেশ। পৃথিবীর অনেক জনবহুল দেশ তাদের জনসংখ্যাকে জনশক্তি বা মানব সম্পদে পরিণত করছে। ২০২৬ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বের ৮ম জনবহুল দেশ। বাংলাদেশের জনসংখ্যা এখন প্রায় ১৭ কোটি ৭৮ লাখ। জনবহুল দেশ হলেও সে তুলনায় বাংলাদেশে কর্মসংস্থান কম তাই এই বিশাল জনসংখ্যা আমাদের জন্য শংকার বিষয়। তবে আমাদের ইতিবাচক দিক হলো, বাংলাদেশে জন্মহার নিয়ন্ত্রণে আগের চেয়ে অনেক উন্নতি হয়েছে। তবে এই জনসংখ্যার আধিক্যকে আমাদের জনশক্তিতে পরিণত করতে হবে। এই জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে পরিণত করতে হলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায়ও অনেক পরিবর্তন আনতে হবে। আমাদের শিক্ষার্থীরা শুধু কয়েকটি বিষয় নিয়ে লেখাপড়ার চিন্তা করে। অথচ বিশ্বের চাহিদা নির্ভর শ্রমবাজারে আরো অনেক বিষয় রয়েছে যেগুলোতে আমরা দক্ষ জনশক্তি বা মানবসম্পদ তৈরি করতে পারছিনা ফলে আমরা যেমন দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি করতে পারছি না তেমনি অনেক সময় বিদেশ থেকে বিষয় ভিত্তিক জনশক্তি আমদানি করতে হচ্ছে। তাই আমাদের শিক্ষা পদ্ধতিতে বিশেষ করে উচ্চ শিক্ষায় শ্রমবাজার নির্ভর ক্যারিকুলাম চালু করা প্রয়োজন যদিও বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষায় নতুন করে ঙইঊ (আউটকাম বেজড এডুকেশন) পদ্ধতি চালু হয়েছে যেখানে কিছুটা চাহিদা নির্ভর গ্র্যাজুয়েট তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত শিক্ষিত বেকার বাড়ছে কারণ আমরা তাদের কর্মসংস্থানের জন্য সঠিক কোন ব্যবস্থা করতে পারিনি। বর্তমান বিশ্বে কর্মসংস্থানের ধরন, চাহিদা ও প্রতিযোগিতা দিনদিন পরিবর্তিত হচ্ছে। বর্তমানে শ্রমবাজারের পরিধি বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন এটি তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, শিক্ষা, চিকিৎসা, পর্যটন, ফ্রিল্যান্সিং, কল সেন্টার, ব্যবসাবাণিজ্য এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের কর্মক্ষেত্র পর্যন্ত বিস্তৃৃত। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে বিশ্বের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ কর্মী অর্থাৎ মানবসম্পদ তৈরি করতে হবে।

আমাদের দেশে জনসংখ্যার চাপকে জনশক্তিতে রূপান্তর করতে আমাদের দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করে তাদের জন্য দেশে বিদেশে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে, না হয় ভবিষ্যতে এ জনসংখ্যার অত্যধিক চাপ আরো ভয়াবহ হবে। লক্ষণীয় বিষয় বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারত এবং চীন তাদের বিভিন্নভাবে তাদের জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তর করছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায় আন্তর্জাতিক শ্রম বাজারে জনশক্তি রপ্তানিতে ভারতের অবস্থান ১ম সেখানে বাংলাদেশের অবস্থান ৬ষ্ঠ, ভারত বিশ্বের ১ম রেমিট্যান্স গ্রহণকারী দেশ অন্যদিকে বাংলাদেশ ৮ম বৃহত্তম রেমিট্যান্স গ্রহণকারী দেশ, বাংলাদেশ অদক্ষ ও অর্ধদক্ষ জনশক্তি বেশি রপ্তানী করে অন্যদিকে ভারত দক্ষ ও শিক্ষিত জনশক্তি রপ্তানী করে ফলে ভারতের অর্থনীতিতে তার অনেক বেশি প্রভাব পড়ছে। বাংলাদেশে তরুণ জনগোষ্ঠীর হার বেশি, এটি আমাদের জন্য হতে পারে এক বিশাল মানবসম্পদ। বর্তমানে বাংলাদেশে এ তরুণযুবাগোষ্ঠীর মানুষ রয়েছেন প্রায় ৩ কোটিরও অধিক। কিন্তু তাদের মধ্যে প্রচুর শিক্ষিত তরুণ বেকার, রয়েছে কর্মসংস্থানের তীব্র অভাব। কিন্তু এই মানবসম্পদকে বিশ্বমানের শ্রমশক্তিতে পরিণত করতে হলে এ জনগোষ্ঠীর সবার সুযোগকে সমানভাবে কাজে লাগাতে আমাদের নানা প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে, প্রান্তিক বা পিছিয়ে থাকা মানুষদের দিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখতে হবে। এখনো শ্রমবাজারে নারীপুরুষের অংশগ্রহণের হারে ব্যাপক ব্যবধান রয়েছে অর্থাৎ নারীরা বেশ পিছিয়ে রয়েছেন, সেখানে নারীকে প্রাধান্য দিতে হবে। প্রযুক্তির উন্নতির কারণে বর্তমানে শ্রমবাজারে ভাষাগত এবং প্রযুক্তির জ্ঞান থাকা অত্যাবশ্যকীয় হয়ে পড়েছে তাই ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে দক্ষ মানব সম্পদ তৈরী বা জনশক্তি রপ্তানীর জন্য আমাদের বিভিন্ন ভাষা শেখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

পৃথিবীর অনেক দেশের শ্রমবাজারে শ্রমিক সংকট রয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শ্রমশক্তি রফতানির সুযোগ তৈরি হওয়া বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সম্ভাবনা। এই জনসংখ্যার মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। তবে আমাদের বিদেশে জনশক্তি রফতানির সম্ভাবনাময় খাতটি দীর্ঘদিন ধরে সঠিক পরিকল্পনা ও উদ্যোগের কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর অন্তত ১০ লাখ মানুষ বৈদেশিক শ্রমবাজারে পাড়ি জমাচ্ছেন। বাংলাদেশে অনেক শ্রমিক থাকলেও সবাই সেই মান অনুযায়ী প্রশিক্ষিত নন। সেই নিরিখে চাহিদা অনুপাতে দক্ষ শ্রমিক পাঠাতে পারলে দেশের বেকারত্ব অনেকাংশে হ্রাস পাবে, বিশ্ব শ্রমবাজারে চাহিদা যদি পরিকল্পিত ও দক্ষভাবে কাজে লাগানো যায়, তাহলে এটি দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ জনসংখ্যাকে মানবসম্পদে রূপান্তরিত করতে হলে জনশক্তির উন্নয়নে সরকারসহ দেশীয়বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান সমূহকে একযোগে কাজ করতে হবে। জনসংখ্যার আকারের পাশাপাশি সবার ক্ষেত্রে সমসুযোগ ও সমসম্ভাবনা রয়েছে কি না, সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রান্তিক বা সুবিধাবঞ্চিত তরুণযুবাগোষ্ঠীকে সর্বাগ্রে প্রাধান্য দিতে হবে, এই মুহূর্তে বাংলাদেশে জনসংখ্যাকে বিশেষ করে তরুণযুবাগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে মানবসম্পদ তৈরীর জন্য সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা করে তাতে বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বৈশ্বিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার স্বার্থে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রয়োজনীয় দক্ষতা বৃদ্ধিতে আমাদের আরো দৃশ্যমান উদ্যোগ নিতে হবে, বিশেষ করে নজর দিতে হবে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে। যাতে এই জনসংখ্যাকে মানব সম্পদে রূপান্তরিত করে আমরা দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসতে পারি।

লেখক: ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবৃদ্ধাশ্রম কেবল একটি ভবন নয়
পরবর্তী নিবন্ধকর্ণফুলীতে ব্রাজিলের তৈরি ৯ এমএম পিস্তল উদ্ধার