বৃদ্ধাশ্রম কেবল একটি ভবন নয়

অনামিকা বড়ুয়া | শনিবার , ১১ জুলাই, ২০২৬ at ১০:৫২ পূর্বাহ্ণ

বৃদ্ধাশ্রমের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি বৃদ্ধ মা কিংবা বাবার চোখে শুধু অশ্রু নয়; সেখানে জমে থাকে এক জীবনের ত্যাগ, সন্তানের জন্য বিসর্জন দেওয়া অসংখ্য স্বপ্ন এবং এক নীরব প্রশ্ন ‘শেষ পর্যন্ত আমার ঠিকানা কি এই ঘরটুকুই?’

আমরা প্রায়ই সহজে বলে দিই, ‘ছেলেমেয়েরা স্বার্থপর হয়ে গেছে।’ কিন্তু বাস্তবতা সবসময় এত সরল নয়। একসময়ের যৌথ পরিবার আজ ছোট ফ্ল্যাট, কর্মব্যস্ত জীবন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও নগরায়ণের চাপে বদলে গেছে। অনেক সন্তান সীমাহীন দায়িত্বের ভিড়ে বাবামায়ের পাশে সময় দিতে পারেন না; আবার এমনও আছেন, যাঁরা অবহেলা ও আত্মকেন্দ্রিকতার কারণে তাঁদের একাকী করে দেন। একই সঙ্গে এমন অনেক প্রবীণও আছেন, যাঁরা উন্নত চিকিৎসা ও নিয়মিত পরিচর্যার জন্য নিজের ইচ্ছাতেই বৃদ্ধাশ্রমকে বেছে নেন। তাই প্রতিটি গল্পের পেছনের বাস্তবতা আলাদা।

তবু একটি প্রশ্ন থেকেই যায় প্রযুক্তি আমাদের পৃথিবীকে কাছে এনেছে, কিন্তু কি সম্পর্কগুলোকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে? আমরা দূরের মানুষের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যোগাযোগ রাখি, অথচ একই শহরে থাকা বৃদ্ধ মাবাবার সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা বলার সময়ও অনেকের হয়ে ওঠে না। অথচ বার্ধক্যে মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন কেবল ওষুধ নয়; প্রিয়জনের সান্নিধ্য, সম্মান ও আন্তরিক যত্ন।

সমাজের প্রকৃত সংকট এখানেই। আমরা সন্তানদের সফল হতে শেখাই, কিন্তু বাবাুমায়ের প্রতি দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার শিক্ষা যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দিই না। অথচ মাবাবার পাশে দাঁড়ানো কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি নৈতিক কর্তব্য এবং সভ্যতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড।

বৃদ্ধাশ্রম কেবল একটি ভবন নয়; এটি আমাদের সময়ের সামাজিক পরিবর্তনের নীরব দলিল। সেখানে যেমন অবহেলার গল্প আছে, তেমনি আছে অর্থনৈতিক বাস্তবতা, পারিবারিক পরিবর্তন এবং জীবনসংগ্রামের ইতিহাস। তাই সমাধান কাউকে শুধু ‘স্বার্থপর’ বলে দোষারোপ করার মধ্যে নয়; বরং এমন একটি সমাজ গড়ে তোলায়, যেখানে প্রবীণদের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ভালোবাসা পারিবারিক এবং সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

মনে রাখতে হবে, বার্ধক্য কারও জন্য ব্যতিক্রম নয়; এটি আমাদের সবার ভবিষ্যৎ। আজ আমরা যেভাবে আমাদের প্রবীণদের সঙ্গে আচরণ করছি, আগামী প্রজন্ম আমাদের কাছ থেকেই সেই শিক্ষাই গ্রহণ করবে। একটি জাতির প্রকৃত সভ্যতা তার দালানকোঠায় নয়, বরং সে তার প্রবীণ মানুষদের কতটা সম্মান, নিরাপত্তা ও ভালোবাসা দিতে পারে সেই মানবিকতার মধ্যেই প্রতিফলিত হয়।

পূর্ববর্তী নিবন্ধমা: আমার ধনী হওয়ার একমাত্র কারণ
পরবর্তী নিবন্ধজনসংখ্যাকে মানব সম্পদে রূপান্তরিত করতে হবে