প্রতি বর্ষায় চট্টগ্রামে একই দৃশ্য। কালো মেঘ জমে, বৃষ্টি নামে, পাহাড়ের মাটি নরম হয়। তারপর শুরু হয় প্রশাসনের মাইকিং ‘ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান।’ কিন্তু প্রশ্ন হলো, মানুষ কি শুধু মাইকিং শুনেই ঘর ছেড়ে চলে যেতে পারে? যে মানুষটির মাথা গোঁজার একমাত্র ঠাঁই পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে ওঠা একটি টিনের ঘর, যার সারা জীবনের সঞ্চয় কয়েকটি আসবাব, কিছু কাপড় আর সন্তানের বই–খাতা! সে কোথায় যাবে? আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে কি তার ঘর, তার স্বপ্ন, তার সামান্য সম্পদ নিরাপদ থাকবে? তাই অনেকের কাছে পাহাড়ধসের ভয়ও ‘হার’ মানে দারিদ্র্যের কাছে।
প্রশাসনের দায়িত্ব আছে মানুষকে সতর্ক করার। তারা করছে। স্বেচ্ছাসেবকেরা দিনরাত মাইকিং করছেন। আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শুধু আশ্রয়কেন্দ্র খুলে দিলেই সংকটের সমাধান হয় না। মানুষের মনে যদি এই বিশ্বাস না থাকে যে ফিরে এসে সে তার ঘর অক্ষত পাবে, তাহলে সে কেন ঘর ছাড়বে? চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে যত মানুষ মারা যায়, তাদের অধিকাংশই জানতেন তারা ঝুঁকিতে আছেন। কিন্তু তারা ছিলেন অসহায়। আর এই অসহায়ত্বের নাম ‘দারিদ্র্য’। প্রতি বছর পাহাড়ধসে কয়েকটি প্রাণ ঝরে। কয়েকদিন আলোচনা হয়। তদন্ত কমিটি হয়। কিছু প্রতিশ্রুতি আসে। তারপর আবার সব স্বাভাবিক। পরের বর্ষায় আবার একই খবর, একই কান্না, একই প্রশ্ন।
চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো কেবল মাটির স্তূপ নয়। এগুলো হাজারো নিম্নআয়ের মানুষের শেষ আশ্রয়। এই মানুষগুলো পাহাড় ভালোবেসে সেখানে থাকেন না; থাকেন কারণ শহর তাদের জন্য আর কোনো জায়গা রাখেনি। শহরের উন্নয়ন হয়েছে, বহুতল ভবন উঠেছে, কিন্তু নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসনের সুযোগ তাদের ভাগ্যে জোটেনি।
তাই যখন পাহাড়ধসের সতর্কবার্তা আসে, তখন তারা দুটি ভয় নিয়ে বাঁচে একদিকে পাহাড়ধস, অন্যদিকে ঘর হারানোর আশঙ্কা। অনেকের কাছে দ্বিতীয় ভয়টাই বড় হয়ে ওঠে। এই বাস্তবতা বদলাতে হলে শুধু মাইকিং যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নিরাপদ পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান এবং এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে মানুষ জানবে ঘর ছেড়ে গেলে সে শুধু প্রাণই বাঁচাবে না, তার সবকিছুই নিরাপদ থাকবে। কারণ, পাহাড়ধস মানুষকে হত্যা করে এক মুহূর্তে, কিন্তু ‘দারিদ্র্য’ মানুষকে প্রতিদিন সেই পাহাড়ের নিচে বাঁচতে বাধ্য করে। পাহাড়ধস বলছে ‘পালাও’, দারিদ্র্য বলছে ‘থাকো’। আর এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সবচেয়ে অসহায় মানুষগুলোই চট্টগ্রামের পাহাড়–ঘেঁষা জনপদের বাসিন্দা।











