একটি দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়ন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তার সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। উৎপাদন ও আমদানির মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয় যখন একটি অর্থনীতিকে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দেয়, তখন বৈশ্বিক যোগাযোগ হয়ে ওঠে সেই অগ্রগতির প্রধান চালিকাশক্তি। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের মানচিত্রে এক কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে। বর্তমান বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পেছনে রয়েছে সমুদ্রপথের টেকসই ও কার্যকর ব্যবহার। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বিপুল সামুদ্রিক অর্থনীতির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সমুদ্র বাণিজ্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত।
১৯৭২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি)। প্রতিষ্ঠানটির মূল লক্ষ্য ছিল নিজস্ব জাহাজ বহরের মাধ্যমে বহির্বিশ্বের সঙ্গে দেশের বাণিজ্যিক যোগাযোগ সুদৃঢ় করা এবং অর্থনৈতিক সফলতা অর্জন। দীর্ঘ পরিক্রমায় আধুনিক ও বহুমুখী জাহাজ বহর যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে আজ বিএসসি এক অনন্য অবস্থানে পৌঁছেছে।
অগ্রগতির নেপথ্যে দুই নতুন জাহাজ শিপিং বাণিজ্যের প্রতিযোগিতামূলক বাজারে নিজস্ব উন্নত প্রযুক্তিসম্পন্ন জাহাজ বহর থাকা অত্যন্ত লাভজনক। এই লক্ষ্যে গত বছর সেপ্টেম্বরে বিএসসি বহরে যুক্ত হয়েছে চীন থেকে আমদানি করা অত্যাধুনিক প্রযুক্তির দুটি নতুন জাহাজ ‘বাংলার প্রগতি’ ও ‘বাংলার নবযাত্রা’। বর্তমানে জাহাজ দুটি প্রতিষ্ঠানের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। তথ্য অনুযায়ী, এই দুই জাহাজ থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০ লাখ টাকা আয় হচ্ছে। বহরে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই এরা ৫০ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আয় করেছে, যা বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বড় ভূমিকা রাখছে। ৯৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে সংগৃহীত এই আধুনিক বাল্ক ক্যারিয়ার দুটি আগামী অন্তত ২০ বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে সেবা প্রদান করতে সক্ষম হবে। আধুনিক বায়ুগতীয় কাঠামো ও উন্নত নকশার কারণে জাহাজগুলো প্রতিকূল সমুদ্র পরিবেশেও স্থিতিশীলভাবে চলাচল করতে পারে এবং জ্বালানি ব্যবহারে অধিক সাশ্রয়ী। বর্তমানে শুধু ‘বাংলার প্রগতি’ থেকেই প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজার মার্কিন ডলার আয় হচ্ছে। বিএসসির তথ্য অনুযায়ী, এই দুটি জাহাজ ভাড়াভিত্তিক পরিচালনার মাধ্যমে বছরে প্রায় ২০০ কোটি টাকা মুনাফা অর্জন সম্ভব। গত অর্থবছরে বিএসসি তার ৫৪ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৩০৬ কোটি টাকা নিট মুনাফা অর্জন করে রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সম্ভাবনার এই অনন্য উচ্চতায় পৌঁছানো বিএসসির সক্ষমতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
জাতীয় অর্থনীতি ও পণ্য সরবরাহে ভূমিকা বাংলাদেশের ৭১১ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্র উপকূল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। দেশের মোট আমদানি–রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ সমুদ্রপথে সম্পন্ন হয়। সমুদ্র জয়ে বিএসসির বর্তমান বহর প্রতিষ্ঠার পরপরই ‘বাংলার দূত’ এবং ‘বাংলার সম্পদ’ জাহাজ সংগ্রহের মাধ্যমে বিএসসির অপারেশনাল কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে মোট ৪৫টি জাহাজ সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে জাহাজের বয়সসীমা অতিক্রান্ত ও বাণিজ্যিকভাবে অলাভজনক হওয়ায় বিভিন্ন সময়ে ৩৬টি জাহাজ স্ক্র্যাপ বা বিক্রি করা হয়েছে। বর্তমানে ৭টি আধুনিক জাহাজের একটি দক্ষ বহর নিয়ে বিএসসি বিশ্বজুড়ে সগৌরবে বাংলাদেশের লাল–সবুজ পতাকা বহন করছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে দেশি নাবিকদের পেশাদারিত্ব বিএসসিকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি নির্ভরযোগ্য নাম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বর্তমানে বিএসসির জাহাজগুলো যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ার কঠোরতম পোর্ট স্টেট ইন্সপেকশনে নিয়মিতভাবে ‘নিল ডেফিসিয়েন্সি’ বা কোনো ধরনের ত্রুটি ছাড়াই উত্তীর্ণ হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে অত্যন্ত সম্মানজনক। তেলবাহী ও কেমিক্যাল ট্যাঙ্কারের ক্ষেত্রে সিডিআই এর মতো চ্যালেঞ্জিং পরীক্ষাগুলোতেও বিএসসি সফল। জাহাজে আইএসএম ও আইএসপিএস কোড কঠোরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। লয়েডস রেজিস্টার, এবিএস, বিভি ও ডিএনভি–এর মতো শীর্ষস্থানীয ক্লাসিফিকেশন সোসাইটি থেকে নিয়মিত কারিগরি নিরীক্ষা ও সনদায়ন গ্রহণ করা হয়।
প্রযুক্তি, সুরক্ষা ও পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগ জাহাজের গতিবিধি পর্যবেক্ষণে লং রেঞ্জ আইডেন্টিফিকেশন ও এআইএস কার্যকর রয়েছে। গভীর সমুদ্রে যোগাযোগ আরও আধুনিক করতে জাহাজগুলোতে উচ্চগতির স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট যুক্ত করা হয়েছে, যা রিয়েল–টাইম মনিটরিং ও নাবিকদের সার্বক্ষণিক যোগাযোগের সুযোগ করে দিয়ে তাদের মানসিক প্রশান্তি নিশ্চিত করছে। পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ হ্রাস সংক্রান্ত আইএমও–২০২০ ও বাল্লাস্ট ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট আইন পালনে বিএসসি প্রতিবছর বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে বিশ্বমানের শিপিং কোম্পানি হিসেবে শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখছে। মেরিটাইম জনশক্তি উন্নয়ন বিএসসি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মেরিটাইম পেশাদার তৈরির অন্যতম কারিগর। সরকারি–বেসরকারি মেরিন একাডেমি ও ন্যাশনাল মেরিটাইম ইনস্টিটিউটের ক্যাডেটদের হাতে–কলমে নিবিড় প্রশিক্ষণ দিচ্ছে বিএসসি। সংস্থায় কর্মরত অভিজ্ঞ মাস্টার ও ইঞ্জিনিয়ারগণ প্রেষণে প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করে ভবিষ্যৎ পেশাদার তৈরিতে ভূমিকা রাখছেন। এখানকার প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা পরবর্তীতে বিদেশি জাহাজ সংস্থায় উচ্চপদে আসীন হয়ে বিপুল রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও স্বাবলম্বিতার অনন্য নজির ‘জাহাজ প্রতিস্থাপন ও সমপ্রসারণ কর্মসূচি‘র আওতায় বিএসসি তাদের নিজস্ব বহরকে আধুনিকীকরণ করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। শতভাগ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নতুন জাহাজ সংগ্রহ প্রতিষ্ঠানটির পেশাদারিত্বের প্রমাণ। সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে। ২০১৬ সালে চীন সরকারের ঋণ সহায়তায় গৃহীত প্রকল্পের বিপরীতে ২ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা পরিশোধের যে গুরুদায়িত্ব বিএসসির ওপর ছিল, তা প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব মুনাফা থেকেই সম্পন্ন করছে। গত ২৬ নভেম্বর বিএসসি তাদের অর্জিত লাভ থেকে ৪৭৫ কোটি ২৫ লক্ষ ১৩ হাজার ৩৪০ টাকার একটি বড় অংকের চেক গত সরকারকে পরিশোধ করেছে। সরকারি ভর্তুকি বা অনুদানের ওপর নির্ভর না করে নিজস্ব আয়ে ঋণের টাকা পরিশোধ করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার এই ঘটনা কেবল একটি ‘টোকেন অব এঙিবিশন’ নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের স্বাবলম্বিতার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ এবং জাতীয় অর্থনীতির এক অনন্য মাইলফলক।
লেখক: আবাসিক সম্পাদক, দৈনিক আমার দেশ।












