দেশ হতে দেশান্তরে

বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো

সেলিম সোলায়মান | রবিবার , ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৮:৫৫ পূর্বাহ্ণ

বলির পাঠা লাগবে অবশ্যই। উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপিয়ে শেষ হবে না এর। সৌদিতে উত্তম প্রজাতির কোরবানির দুম্বা পাওয়া যায়। দামেও তা সুইজারল্যান্ডের চেয়ে ঢের কম। অতএব সমস্যা কী? হেডকোয়ার্টারের ফিসফিসানিতে মামুর জোরে বলিয়ান অকালকুষ্মাণ্ড সুখ্যাতিসম্পন্ন ভ্যাক্সিন সিইও, যে বালখিল্যতা করেছে সৌদি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সাথে, তীরে এসে তরি ডোবার অবস্থাই হয়েছে তাতে! বিজনেস ট্রান্সফরমেশনের জন্য করা দুই বছরের কাজ ফিলের পড়েছে তুমুল ঝুঁকিতে। প্রথমে ফিল এ নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন থাকলেও ফিরেছে দ্রুতই “কুছ পরোয়া নেই” ভাবের আপন মেজাজে।

ঘটেছে উল্টা অধমের। হেসেছি না বুঝে প্রথমে বেকুবের হাসি। ক্রমেই বুঝতে শুরু করেছি এই দুর্যোগ যদি সামলানো না যায়, তবে সে নিশ্চয় খুঁজবে দায় চাপানো যায় এমন ঘাড়। যতোই হই না কেন আমি বেঙ্গল গোট, মরুতে অবস্থানের ফলে বাসেল থেকে আমাকে সে ঠাউড়াতে পারে সৌদি দুম্বা। ভ্যাক্সিন ব্যবসার অতিরিক্ত দায়িত্ব তো আছে এ ঘাড়েই। কী আর হবে? ক্যান্সেল হবে এসাইনমেন্ট, হয়তো। ফিরে যাবো দেশে, এতো ভালো খবর। সমস্যা অন্য জায়গায়। তিনবছর মরুবাসের এই এসাইনমেন্টের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে, এইবার দেশে গিয়ে একটা ফ্লাটের বুকিং দেওয়ার কথা ছিল।

পরিবারের এই দাবিটি বহুদিন উপেক্ষা করে আসছিলাম, ব্যাংক ঋণের ফাঁদে আঁটকাবো না এই প্রতিজ্ঞায়। সৌদি বরকতের আশায় অবশেষে রাজী হয়েছিলাম। সে মোতাবেক স্ত্রী লাজু,বোন হেলেন, পেশাগত জীবনের দীর্ঘকালীন বস, জ্যেষ্ঠভ্রাতাসম মনসুর ভাইয়ের পরামর্শ মতে, লালমাটিয়ায় একটা ফ্ল্যাট পছন্দ করে রেখেছে। এ মাস শেষে যাবো যখন ঢাকায় নতুন ভিসার জন্য, তখন সেটি ফাইনাল করে বুকিং করার কথা ! থাক, ওসব চিন্তা আপাতত। যা হবার হবে। এ জীবনের সবই তো অনিশ্চিত! বিনামেঘে বজ্রাঘাতের মতো ঘটনাটি ঘটার পর, সহকর্মীরা যাতে আতঙ্কিত না হয় পরে, বা যাতে বেহুদা গুজবের নগরীতে পরিণত হয় কোম্পানি, সে লক্ষ্যে আমরা যারা আছি কোম্পানি পরিচালনা কমিটিতে, তারা সর্বসম্মতিক্রমে দুটো করছি কাজ চালাচ্ছি জোরেসোরে। প্রথমত, হেড অব সেলস খলিল, তুমুল আওয়াজ তুলে নিচ্ছে লাংকাভি কুয়ালালামপুর মিটিংয়ের প্রস্তুতি। মোটামুটি ৯০ ভাগ লোক যাবে ঐ মিটিংয়ে। জানুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহের অনুষ্ঠিতব্য ঐ মিটিংয়ের জন্য ভ্রমণপরিকল্পনা তো এখনি করতে হবে। ব্যস্ত রাখছে সে সবাইকে তা নিয়ে।

দ্বিতীয়ত, আমার টিমে যেহেতু আরো তিনজন ম্যানেজার নিয়োগের সম্মতি পাওয়া গেছে বসের কাছ থেকে, হেড অব এইচ আর গিউসি ও আমি গত এক সপ্তাহ ধরে আছি সেই থেকে ব্যস্ততা নিয়ে। সমুদ্রে ঝড় উঠলে, ঝানু জেলে যেমন তার জাল আর নৌকা মেরামতে মনোযোগ দেয়, ঐ রকমই আর কি।

ফিল, গিউসি ও আমি এ নিয়ে বেশ আগেই একমত হয়েছিলাম, তিনটা পজিশনের মধ্য, দু জনকে সেলস টিম থেকে পদোন্নতি দেয়া হবে। আর একজনকে, যেটি একটু সিনিয়র পদ, সেটিতে আমদানি করা হবে বাইরের কোন কোম্পানি থেকে যোগ্য লোক।

নিজেদের মধ্যে এ সিদ্ধান্ত মাস কী দেড় মাস আগে নিলেও, এ নিয়ে অগ্রগতি হয়নি সপ্তাহ খানেক আগ পর্যন্ত। বিজ্ঞাপন দেয়ার তো প্রশ্নই উঠে না। অবাক ব্যাপার, তারপরও কী করে যেন এই কথা পৌঁছেছে ঠিকই পাকিস্তানে! ফলে, সেই থেকে প্রায় প্রতিদিনই পাকিস্থান থেকে পাচ্ছিলাম, সিভি সহ চাকুরির আবেদন! শুরুর দিকের কয়েকটা আবেদনের প্রেক্ষিতে, ভদ্রতাবশত, ধন্যবাদ জানিয়ে উত্তর দিয়ে, যখনই বলেছি বাইরের দেশ থেকে লোক আনার যখনই পরিকল্পনা করবো, অবশ্যই তার আবেদন বিবেচনা করা হবে। সাথে সাথে উত্তরে এসেছে বিশাল অনুনয়পত্র। মানবিক বিবেচনার অনুনয়। কী রকম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে সে ও তার পরিবার, দিয়েছে সে বিষয়ে বিরাট ফিরিস্তি। স্কুলে বোমা ফুটছে। মসজিদে ফাটছে। ধ্বংস হচ্ছে বাজার, উড়ে যাচ্ছে শপিংমল বোমায়। জুড়ে দিয়েছে ওসবের দিন, তারিখ, ক্ষণসহ উদাহরণ। হয়েছি বড়ই বিব্রত। সাথে মনে হয়েছে হায় রে, কী যে অভাগা আমি! সৌদিরা আমারই ইকামা দেয়নি এখনো। অথচ বেশ পরে আসার পরও, সি এফ ও আমিন, যে দুজনকে এনেছে পাকিস্তান থেকে, দুজনেরই ইকামা হয়ে গেছে! এরকম হলে আমিও তো বাংলাদেশ থেকে আনতে পারতাম আমারই প্রাক্তন টিমের কাউকে!

কথায় কথায়, একদিন বলেছিলাম ফিল কে বিষয়টি। সাথে সাথে ফিল বলেছিল, ‘এ নির্ঘাত আমিনের কাজ। আমি চাই ডাইভারসিটি তৈরি করতে, আর সে শুধু আনছে পাকিস্তানি। ফিনান্স টিমের চারজনের তিনজনই এখন পাকিস্তানি। তুমি ওসব চিঠির জবাবই দেবে না’। শোন, আমিনকে যতোটা চিনেছি, মনে হয় না আমার, ও ওরকম করবে। ‘তাহলে কে? ঐ যে ফারুক আব্বাসকে আনলো কিছুদিন হল, এ নিশ্চয় তার কাজ!’ নাহ, তাও মনে হয় না। ফারুক পাকিস্তানি হলেও এবং তাকে পাকিস্তান থেকে আনা হলেও বড় হয়েছে সে দুবাইতে। আগে থেকেই তো চিনি। নিজেকে সে পাকিস্তানিদের চেয়ে উন্নত মনে করে। ফলে পাকিস্তান টিমেই খুব একটা গ্রহণযোগ্যতা ছিল না তার। ‘তবে অবশ্যই এ কাজীর কাজ।’ নিজেরও আমার তাই ধারণা। তারপরও ফিলের কথায় ঐ বিষয়ে চুপ থেকে বলেছিলাম, বাইরে থেকে যাকে নেব, পারলে ভারতীয় নেব। ‘দ্যাটস এ গুড আইডিয়া। তোমার টিমের ডাইভারসিটি বাড়বে।’ সে যাক, জরুরি অবস্থায় লোকজনকে ব্যস্ত রাখার মানসে, ভেতর থেকে যে দুই পদের প্রমোশন দেয়া হবে সেই ঘোষণা দিয়েছিল গিউসি, ঐ বজ্রাঘাত ঘটার পরপরই। স্বভাবতই হয়েছে তুমুল উত্তেজনা কোম্পানিজুড়ে। কিন্তু খেয়েছিলাম হোঁচট নিজে। যখনই শুনেছি এরই মধ্যে নিজ যোগ্যতায় আমার প্রিয় হয়ে ওঠা মোহাম্মদ আল গার, এ বিষয়ক পলিসির খাড়ার নীচে পরে, এসেসমেন্ট প্রক্রিয়াতেই ঢুকতে পারবে না। পলিসি মোতাবেক এবারও যদি সে ভাল পারফর্ম করে, তবে ঢুকতে পারবে সে আগামি বছরের এসেসেমেন্টে। এদিকে আগামী বছর তো নাড়ছে কড়া দরজায়। তাই, বিশেষ কোন বিবেচনা করা যায় কি না, গারের জন্য বলেছিলাম তা আকারে ইঙ্গিতে, গিউসি আর খলিলের সাথে। পেয়েছিলাম দু রকম প্রতিক্রিয়া তাতে। গিউসির প্রতিক্রিয়ায় মনে হল, খুবই বিরক্ত সে গারের উপর। অতএব পলিসির বাইরে কোন কিছুই করা হবে না, এ ছিল সোজা সাপটা জবাব। সাথে আমাকে দিয়েছে খোঁচা, ‘বস তো তোমাকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ দিয়েছে পলিসি তৈরি করার আর পলিসি কমপ্লায়েন্সের!’ কিল খেয়ে কিল হজম করে হটেছিলাম পিছু। ঐদিকে গা’রের ডাইরেক্ট বস, সেলস হেড খলিল, হাসতে হাসতে বলেছে– ‘আমার সবচেয়ে ভাল লোকটার প্রতি নজর পড়েছে বুঝি! কিন্তু ভাইয়া, আমি তাকে ছাড়তে রাজী না !’ হাসতে হাসতে বলেছি, আমার ঘাড়ে কি দুইটা মাথা নাকি যে, তোমার লোক কেড়ে নেব? সময় সুযোগ করে তুমিই বরং জিজ্ঞেস করো, মার্কেটিংয়ে কাজ করতে চায় কি না সে। সেটাই হয় যদি তার ইচ্ছা, তাতে বাঁধা পেলে কিন্তু চলে যাবে অন্য কোম্পনিতে। তখন হবে তোমার আমার দুজনেরই লস। সে যাক। এ যাবতকালের পেশাগত অভিজ্ঞতা থেকে যা শিখেছি, প্রমাণ হল তা ফের এই মরুতে। হেডহান্টারের গিউসি, ৪ টা ভিন্ন কোম্পানির পাঁচজন সম্ভাব্য প্রার্থীর সাথে কথা বলার ব্যবস্থা করেছিল, বাইরের লোক দিয়ে নতুন যে পদটি পূরণ করার কথা, সেটির জন্য।

এ ধরনের ইন্টারভিউ নেওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করি না আমি। এতে ভিন্ন লেন্সে দেখা যায় নিজেরই অতি পরিচিত মার্কেট। এই মার্কেটে তো আমি শিক্ষানবিস। খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করেছিলাম তাই ঐ সুযোগকে। পেয়েছিও ফল হাতে হাতে, তাতে। জিলেড সাইন্স কোম্পানির তরুণ স্মার্ট মিশরি এক প্রোডাক্ট ম্যানেজার, তার ইন্টারভিউতে, একটা বিষয়ে এক্কেবারে চোখ খুলে দিয়েছিল আমার। এইচ আই ভি মানে এইডস চিকিৎসার ঔষধের দায়িত্বে আছে সে। উদাহরণসহ বুঝিয়েছে অত্যন্ত সফল সে তার দায়িত্বে! ইন্টারভিউ শুরুর আগে ভেবেছিলাম, সৌদির মোতাওয়া নিয়ন্ত্রিত সমাজে এইডস রোগের ঔষধের মার্কেট আছে কী? থাকলে ওটা আর কতোই বড় হবে?

কথা বলতে গিয়ে বুঝলাম ছিলাম কী ভ্রান্তিতে! বেশ বিরাট বাজার এই ঔষধের। এখানকার সরকার এ নিয়ে কোন উচ্চবাচ্য করে না, তবে এ খাতে আছে বেশ বড় বাজেট বরাদ্দ। এ বিষয়ে ঐ তরুণ যাকে বলে কৃতবিদ্য না শুধু, তুমুল সফলও।

বুঝেছিলাম যখন তাকে জিজ্ঞেস করেছি, এই রোগীরা বিশেষত কারা? সাথে মন্তব্য করেছিলাম, এ রোগ তো সৌদিতে থাকার কথা না! সাথে সাথেই, কিছুকাল আগে আমার টিমের মার্কেটিং রিসার্চ ম্যানেজার রিজভির করা সামপ্রতিক গবেষণায় সৌদি পুরুষদের যৌনভাবনার যে প্রতিফলন দেখেছি, সেটির কথা মনে পড়েছিল। এ বিষয় ঘিরে এদের চুটকি জোকসও তো শুনেছি প্রচুর! ইন্টারভিউতে বাকী চার জনের কাছেও পেয়েছি নানান খবর। যেমন দুটো কোম্পানি, আগামী জুনে দক্ষিণ আফ্রিকায় বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর বসতে যাচ্ছে, তা নিয়ে পেয়েছি তাদের প্রস্তুতির ভেতরকার খবর। মানে তরতাজা কম্পিটিটরস ইফরমেশন। এক কোম্পানির প্রোডাক্ট ম্যানেজার জানিয়েছিল, কিভাবে সে ডজন তিন কী চার গুরুত্বপূর্ণ ডাক্তারের জন্য তাদের পছন্দের ম্যাচের টিকিট যোগাড় করেছে। এ ছাড়া বাকী ডাক্তারদের জন্য মরুভূমিতে দানবাকৃতির টিভি পর্দা বসানোর সাথে অবিরল ক্যাবসা ও শিশার ব্যবস্থা করার কাজ চলছে দ্রুত এগিয়ে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধদৈনিক আজাদী : সময়ের আয়নায় যার দীর্ঘ পথচলা