বেশ কয়েক বছর আগে কলকাতা গিয়েছিলাম। ৪–৫ দিনের সেই সফরে রবীন্দ্রনাথের ঠাকুরবাড়িসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে ঘুরেছি। পুরোনো স্থাপনা ও স্থাপত্যশিল্প দেখে মুগ্ধ হয়েছি। সবচেয়ে ভালো লেগেছে ঠাকুরবাড়ির ভিতরে চলা বাচ্চাদের মিউজিকের তালিম নেওয়ার ক্লাস। অনেকক্ষণ বসে বাচ্চাদের বাদ্যযন্ত্র বাজানো উপভোগ করেছি। দেখলাম বিভিন্ন বিষয়ে এক একটি গ্রুপের ক্লাস ও তালিম চলছে। সেখানে সারা বছরই গান, নাচ, অভিনয়, আবৃত্তিসহ বিভিন্ন ইন্সট্রুমেন্ট বাজানো শেখানো হয়, রয়েছে বিভিন্ন মেয়াদি কোর্স। যেগুলো শেষ করলে সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। বর্তমান ভারতবর্ষের অনেক প্রতিষ্ঠিত গুণী শিল্পী ঠাকুরবাড়ির সেই মঞ্চ থেকে উঠে এসেছে। শুধু ওখানেই নয়, ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে এই ধরনের হাজার হাজার শিল্প–সংস্কৃতির কোর্স করার স্থাপনা রয়েছে। যেখানে শিল্প–সংস্কৃতি বিষয়ে ট্রেনিং ও গবেষণা করা হয়। কেন্দ্রীয় সরকারসহ রাজ্য সরকার এই বিষয়গুলোতে অর্থায়ন ও মনিটরিং করে। যেখানে দক্ষ জনশক্তি গড়ে ওঠে এবং মানুষ শিল্প–সংস্কৃতিকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে পারে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিবছর শত শত ট্রেনিংপ্রাপ্ত শিল্পী ও কলাকৌশলী বের হয় এবং তাদের মাধ্যমে ভারত বছরে কোটি কোটি ডলার আয় করে।
পাশাপাশি দেশ হলেও আমাদের দেশে শিল্প–সংস্কৃতি বিষয়কে কখনো তেমন গুরুত্ব দেওয়া হতো না। ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছু প্রতিষ্ঠান থাকলেও রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যে তেমন কোনো উদ্যোগ ছিল না। প্রতিটি জেলায় শিশু একাডেমি ও শিল্পকলা একাডেমি থাকলেও সেগুলোর কার্যক্রম ছিল সীমিত, ছিল বাজেটের স্বল্পতা। তবে বর্তমান সরকার এবারের বাজেটে এই সেক্টরকে গুরুত্ব দিয়ে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব পেশ করেছে। যা নিঃসন্দেহে একটি ভালো, প্রশংসনীয় ও চমৎকার উদ্যোগ।
দেশের তরুণদের মাদক, সন্ত্রাস ও উগ্রবাদ থেকে দূরে রাখতে সৃজনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর জোর দিচ্ছে সরকার। এর অংশ হিসেবে আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী সৃজনশীল অর্থনীতির সম্ভাবনা এবং এর রূপরেখা তুলে ধরেন। সাধারণভাবে সৃজনশীল অর্থনীতি বলতে চলচ্চিত্র, নাচ, গান, নাটক, প্রকাশনা, বিজ্ঞাপন, স্থাপত্য, শিল্পকলা, কারুশিল্প, নকশা, সফটওয়্যার, ভিডিও গেমস ইত্যাদিকে বোঝানো হয়।
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার (আঙ্কটাড) ‘সৃজনশীল অর্থনীতি বা ক্রিয়েটিভ ইকোনমি আউটলুক–২০২৪’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৃজনশীল অর্থনীতি বলতে এমন পণ্য ও সেবা তৈরি, উৎপাদন এবং বিপণনকে বোঝায়, যেখানে প্রধান উপাদান হিসেবে সৃজনশীলতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদকে ব্যবহার করা হয়। ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি ও মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) উন্নত দেশগুলোর পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও ভালো অবদান রাখছে সৃজনশীল (ক্রিয়েটিভ) অর্থনীতি। কিন্তু বাংলাদেশ ছিল এক্ষেত্রে পিছিয়ে। বাজেটে সরকার সৃজনশীল অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে নানাভাবে পৃষ্ঠপোষকতার পরিকল্পনা করেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশের পাশাপাশি সৃজনশীলতার মাধ্যমে উচ্চমূল্য তৈরি ও রপ্তানি আয় বৃদ্ধি সরকারের মূল উদ্দেশ্য। সৃজনশীল অর্থনীতির সম্ভাবনাময় খাতকে অর্থনীতির মূলধারায় সম্পৃক্ত করা এবং দেশের ব্র্যান্ডিং করাও রয়েছে এই উদ্দেশ্যের লক্ষ্য।
কয়েকদিন আগে অর্থমন্ত্রী এক গোলটেবিল বৈঠকে সৃজনশীল অর্থনীতি নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের সফট পাওয়ার নেই। অথচ পাশের দেশের চলচ্চিত্র, সংগীত ইত্যাদি বিশ্বের অন্য দেশে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী চান দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী নানা ধরনের সৃজনশীল কাজে যুক্ত থাকুক। এখানে দুটি দিক আছে প্রথমটি হলো শারীরিক ও মানসিক বিকাশের পাশাপাশি মাদক ও জঙ্গিবাদ থেকে তরুণদের দূরে রাখা। এজন্য উত্তম উপায় হচ্ছে সাহিত্য, সংস্কৃতি, খেলাধুলাসহ সব ধরনের সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে তাদের যুক্ত করা। দ্বিতীয়টি হলো সৃজনশীল কাজকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া। এ বিষয়ে এত দিন কোনো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছিল না। তবে এবারের পরিকল্পনা হচ্ছে দেশে সৃজনশীল অর্থনীতি উদ্দীপ্ত করা। এ জন্য প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হবে। আর এর মাধ্যমে বহুমাত্রিকভাবে লাভবান হবে বাংলাদেশ। বিএনপি তার নির্বাচনী ইশতেহারে ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’ নিয়ে কর্মপরিকল্পনা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এতে বলা হয়েছে, জিডিপিতে সৃজনশীল অর্থনীতি খাতের অবদান হবে কমপক্ষে ১.৫% এবং কর্মসংস্থান হবে ৫ লাখ মানুষের।
সৃজনশীল অর্থনীতি খাতের কৌশলগত নেতৃত্ব দিতে ‘বাংলাদেশ ক্রিয়েটিভ ডেভেলপমেন্ট অথরিটি’ গঠন এবং আন্তর্জাতিক উৎসব ও বাজারে সৃজনশীল সম্ভাবনাকে তুলে ধরতে ‘ক্রিয়েটেড ইন বাংলাদেশ’ নামে জাতীয় ব্র্যান্ড চালু করার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে ইশতেহারে। সেই প্রতিশ্রুতি পূরণে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী সচিবালয়ে অংশীজনদের নিয়ে দুই দফা বৈঠক করেছেন। দুই দফা বৈঠক শেষে কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও বেসরকারি খাতের দায়িত্ব ভাগও করে দেওয়া হয়েছে। সিদ্ধান্তগুলো হলো, ঢাকার পূর্বাচলে ১০০ একর জায়গার ওপর একটি সৃজনশীল কেন্দ্র (ক্রিয়েটিভ হাব) করা। এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব উপস্থাপনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনকে। দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শিল্পকলা একাডেমি চত্বরে হবে সৃজনশীল কেন্দ্র। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও ব্র্যাক যৌথভাবে এ বিষয়ে একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করবে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও স্নাতক পর্যায়ের সরকারি কলেজগুলোতে উদ্ভাবন (ইনোভেশন) কেন্দ্র করারও সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ব্যাপারে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করবে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ। খালি ও অব্যবহৃত জায়গা ও প্লট চিহ্নিত করে এগুলোকে সৃজনশীল কার্যক্রম, প্রশিক্ষণকেন্দ্র এবং হস্তশিল্পের জন্য সৃজনশীল কেন্দ্র গড়ে তোলার জন্য কর্মপরিকল্পনা তৈরি করবে বিসিক। ‘একটি গ্রাম–একটি পণ্য’ উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য সৃজনশীল অর্থনীতিভিত্তিক পণ্য অর্থাৎ মৃৎশিল্প, বুননশিল্প, শীতলপাটি, কাঠের খেলনা, হাতে তৈরি গয়না, টেরাকোটা ইত্যাদি পণ্য চিহ্নিত করার কাজও করবে বিসিক।
আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের প্রতিযোগিতা–সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য দেশীয় ডিজাইনারদের সমন্বয়ে করা হবে একটি জাতীয় পুল, যে ব্যাপারে সরকারকে প্রস্তাব দেবে জয়িতা ফাউন্ডেশন।
পর্যটন খাতের সামগ্রিক সম্ভাবনা, বৈচিত্র্য ও ধারণা নিয়ে একটি পর্যটন মহাপরিকল্পনা হাতে নেবে সরকার। ট্যুরিজম বোর্ড এটা চূড়ান্ত করবে। পর্যটন খাতের বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য কক্সবাজারে করা হবে একটি আন্তর্জাতিক মানের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণকেন্দ্র, যা বাস্তবায়ন করবে পর্যটন করপোরেশন। ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক পর্যটনের উন্নয়নে উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি একটি ‘জাতীয় উৎসব ক্যালেন্ডার’ করবে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়।
অর্থ বিভাগ কিছু খাতকে চিহ্নিত করেছে, যার মধ্যে লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্য অন্যতম। লোকসংস্কৃতির মধ্যে রয়েছে লোকসংগীত, লোকনৃত্য, পালাগান, জারিগান ইত্যাদি। এ ছাড়া আছে হস্তশিল্প। হস্তশিল্পের মধ্যে রয়েছে শীতলপাটি, মাটির কাজ, বাঁশ ও বেতশিল্প। আর ঐতিহ্যবাহী উৎসবের মধ্যে রয়েছে বাংলা নববর্ষ, গ্রামীণ মেলা ইত্যাদি।
আরও কয়েকটি খাত চিহ্নিত করা হয়। বলা হয়েছে, শিল্পকলা ও পারফর্মিং আর্টসের মধ্যে রয়েছে থিয়েটার ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, সংগীত, নাটক, নৃত্য, চিত্রকলা ও ভাস্কর্য। মিডিয়া ও বিনোদন শিল্পের মধ্যে রয়েছে চলচ্চিত্র, টেলিভিশন ও রেডিও সমপ্রচার, কনটেন্ট তৈরি, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ইত্যাদি। প্রকাশনা ও সাহিত্যের মধ্যে বই, পত্রিকা, জার্নাল, অনলাইন ব্লগ ও ডিজিটাল প্রকাশনা, অনুবাদ ও সাহিত্যকর্ম ইত্যাদি। ডিজাইন ও ক্রিয়েটিভ সেবার মধ্যে রয়েছে গ্রাফিক ও ইন্টেরিয়র ডিজাইন। তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল ক্রিয়েটিভিটির মধ্যে রয়েছে সফটওয়্যার ও অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট, ওয়েব ডিজাইন ইত্যাদি। পর্যটন ও সাংস্কৃতিক শিল্পের মধ্যে ইকোট্যুরিজম ও সাংস্কৃতিক পর্যটন, ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটন পণ্য ও সেবা, উৎসবভিত্তিক পর্যটন, প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহ্যবাহী পর্যটন। ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল শিল্পের মধ্যে নকশা ও বুটিক, জুয়েলারি, ফ্যাশন ডিজাইন, লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড ও হাতে তৈরি পণ্য, মেকআপ ইত্যাদি। এ ছাড়া করপোরেট ও ব্র্যান্ডের মধ্যে রয়েছে ক্রিয়েটিভ মিডিয়া সেবাদাতা সফটওয়্যার কোম্পানি, ইনফ্লুয়েন্সিং, বিজ্ঞাপন ও ব্র্যান্ডিং, ডিজিটাল মার্কেটিং ইত্যাদি।
আসলে সৃজনশীল অর্থনীতি নিয়ে সরকারের এই উদ্যোগটি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। আশা করি সরকার সৃজনশীল অর্থনীতির প্রসারে চলচ্চিত্র, কারুশিল্প ও সাংস্কৃতিক পর্যটন এই তিন মাধ্যমেই জোর দেবে। মনে রাখতে হবে, আমাদের সমাজে নানা ধরনের গোঁড়ামি ও অপশক্তি আছে, এগুলোর প্রভাব দূর করতে সৃজনশীলতার কোনো বিকল্প নেই এবং এতে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি। আর এবারের বাজেট বরাদ্দের মাধ্যমে সরকার সেই লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে। যা খুবই আশাব্যঞ্জক ও অভিনন্দনযোগ্য একটি পদক্ষেপ।
লেখক: প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট।











