(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
হংকং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে প্রাইমারী স্কুলের বন্ধু খায়রুল ইসলাম নিজামী স্বপনকে পাওয়ার যে আনন্দ তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। কোন উর্বশী ফুল হাতে দাঁড়িয়ে থাকলেও এতো ভালো লাগতো কিনা কে জানে!
স্বপন বললো, দোস্ত গাড়ি আনিনি, পার্কিং ঝামেলা। বাসে যেতে সমস্যা হবে নাকি কার ভাড়া নেবো? আমি তাকে আশ্বস্ত করলাম যে, প্রাইভেট কারের চেয়ে বাসই ভালো। তোদের শহর দেখতে দেখতে যাবো। আমাদেরতো কোন তাড়া নেই।
স্বপন বললো, দোতলা বাস। উপরের ডেকে বসলে বেশ আরাম লাগে। ডাবল ডেকারের কথা শুনে আমি বেশ পুলকিত হলাম। বললাম, উপরের ডেকে দুইটি সিট পেলেই হবে। দুজন গল্প করতে করতে চলে যাবো। স্বপন আমার লাগেজ টেনে নিল এবং সামনে এগুলো।
বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দেখি একের পর এক লাল, কমলা আর রুপালি রঙের বিশাল দোতলা বাস এসে থামছে। প্রতিটি বাস নির্ধারিত সময়েই আসছে। চালক দরজা খুলছেন, যাত্রীরা শান্তভাবে উঠছেন, আবার দরজা বন্ধ করে বাস চলে যাচ্ছে। পুরো প্রক্রিয়াটি এতটাই নিখুঁত যে মনে হয় কোনো যান্ত্রিক ব্যবস্থা নিজেই সব পরিচালনা করছে। আমাদের বাস এখনো আসেনি। আরো মিনিট দশেক লাগবে। চমৎকার বাস স্টপেজে একপাশে দাঁড়ালাম আমরা। স্বপন গিয়ে আমার জন্য এক সপ্তাহের আললিমিটেড ইউজের একটি বাস টিকেট কিনে নিয়ে আসলো। ইন্টারনেট ডাটাসহ একটি সীম ঝোগাড় করার জন্য তাকে আগেই বলে রেখেছিলাম। সে আমাকে সীম দিল। সীম চালু করে আমি শাহীন ভাবীকে (মিসেস ইউছুপ আলী) ফোন করে পৌঁছে যাওয়ার কথা জানালাম। তিনি আফসোস করে বললেন, আগের ড্রাইভার চাকরি ছেড়ে চলে গেছে। দেশ থেকে নতুন একজন ড্রাইভার এনেছি। কিন্তু সে এতো বোকা যে না পারে গাড়ি চালাতে, না চিনে রাস্তা। এখন তাকে আমরা ধরে ধরে সবকিছু শিখিয়ে নিচ্ছি। ভাবী বললেন, আপনাকে বাসে আসতে হচ্ছে শুনে খারাপ লাগছে। আমি খুবই আনন্দিত গলায় বললাম, ডাবল ডেকার বাস, উপরের ডেকে বসে আপনার দেশ দেখতে দেখতে চলে আসবো। হোটেলের ঠিকানাটা দিলে ওখান থেকে ফ্রেশ হয়ে বাসায় আসতাম। ভাবী হাসলেন, বললেন, বাস স্টপেই মেয়ে ড্রাইভার নিয়ে আপনাকে আনতে যাবে। আগে বাসায় আসেন। আপনি কয়টার বাসে উঠছেন সেটা জানালেই হবে।
বাসে উঠেই আমরা সোজা উপরের ডেকে চলে গেলাম। সামনের সারি আসনগুলো খালি। ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছে এই আসন যেন এক বিশেষ সৌভাগ্য। সামনে পুরোটা জুড়ে বিশাল কাচ, যতদূর চোখ যায় সবই দেখা যাচ্ছিল। পুরো বাসই প্রায় খালি, দোতলা বাসটিতে জনাদশেক প্যাসেঞ্জার। বেশিরভাগই নিচের ডেকে। উপরে ডেকে পাশাপাশি চারটি সিট নিয়ে শুরু হলো আমাদের যাত্রা। হংকংয়ের বিখ্যাত ডাবল ডেকার বাস। শহরকে কাছ থেকে দেখার জন্য এর চেয়ে ভালো মাধ্যম আর কিছু হতে পারে বলে আমার মনে হচ্ছিলো না।
শাহীন ভাবীকে ফোন করে বাস ছেড়েছে বলে জানিয়ে দিলাম। বিমানবন্দরের বিশাল এলাকা ক্রমে পেছনে চলে যাচ্ছিলো। এগুচ্ছিলো আমাদের বাস। হংকং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি চেক ল্যাপ কক নামের একটি কৃত্রিম দ্বীপে গড়ে তোলা হয়েছে। অর্থাৎ সাগর ভরাট করেই বিমানবন্দরটি নির্মিত। বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এই বিমানবন্দরটিতে দৈনিক প্রায় ১১শ’ ফ্লাইট ওঠানামা করে। এসব ফ্লাইটে অন্তত দুই লাখ যাত্রী হ্যান্ডলিং করা হয়। এশিয়ার অন্যতম প্রধান এই এভিয়েশন হাবের চারপাশে জলরাশি, দূরে সারি সারি জাহাজ, আর ক্ষণে ক্ষণে বিমান উড়ে যাওয়া এবং অবতরণের দৃশ্য দেখা যাচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর বাস উঠে গেল বিশাল সেতুর ওপর। নিচে নীল সমুদ্র, দূরে সবুজ পাহাড়, মাঝখানে চলমান জাহাজ। কী দুর্দান্ত এক দৃশ্য!
স্বপন আমাকে তার বাসায় নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিলেও আমি তাকে হংকং সফরের উদ্দেশ্যটি জানালাম। সে মাথা নাড়লো। আর জোর করলো না। বললাম, তুই শুধু আমাকে বাস স্টপেজে পৌঁছে দে, পরের সবকিছু আমি সামলে নেবো। তাছাড়া যেহেতু কয়েকদিন থাকবো, তোর সাথে তো দেখা হবেই।
হংকংকে বলা হয় পাহাড় আর সমুদ্রের শহর। সেই পরিচয় প্রথম মুহূর্ত থেকেই স্পষ্ট হয়ে উঠল। কখনো পাহাড় কেটে তৈরি করা মহাসড়ক, কখনো সমুদ্রের বুক চিরে এগিয়ে চলা দীর্ঘ সেতু, আবার কখনো সুউচ্চ পাহাড়ের গা ঘেঁষে নির্মিত সুড়ঙ্গ। উন্নয়নের সোনার হরিণ হংকংয়ের এখানে ওখানে যেনো ঘোরাঘুরি করছে।
দোতলা বাস থেকে সবকিছুই দেখা যাচ্ছিলো। মুগ্ধ হয়ে লক্ষ্য করলাম, পুরো পথজুড়ে কোথাও এক টুকরো ময়লা নেই। রাস্তার পাশে নেই কোনো অবৈধ দোকান, নেই দখলদারিত্ব, নেই এলোমেলো পার্কিং। প্রতিটি গাছ পরিচর্যা করা, প্রতিটি সড়কের লাইন স্পষ্ট, প্রতিটি সাইনবোর্ড ঝকঝকে।
ডাবল ডেকারের ওপর থেকে হংকংকে দেখার আরেকটি বিশেষ আনন্দ আছে। সাধারণ গাড়িতে বসে যে দৃশ্য চোখে পড়ে না, ওপরের তলা থেকে তা অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। কখনো নিচে ছোট ছোট গাড়ি খেলনার মতো ছুটে যাচ্ছে, কখনো বিশাল কন্টেনার টার্মিনালের সারি, আবার কোথাও আকাশছোঁয়া আবাসিক ভবন!
হংকংয়ের সড়ক ব্যবস্থাও বিস্ময়কর। অনেক জায়গায় তিন কিংবা চার স্তরের ফ্লাইওভার। এক স্তরের ওপর আরেক স্তর, তার ওপর আরও একটি রাস্তা। দূর থেকে দেখলে মনে হয় কংক্রিটের তৈরি কোনো বিশাল শিল্পকর্ম। অথচ কোথাও যানজট নেই। হাজার হাজার গাড়ি ঘণ্টায় ৮০ থেকে ১০০ কিলোমিটার গতিতে ছুটে চলেছে। এত যানবাহনের মধ্যেও ট্রাফিক সিস্টেমের এক অনন্য উদাহরণ এই নগরী।
পথে কয়েকবার চোখে পড়ল দোতলা ট্রাম। পৃথিবীর হাতে গোনা কয়েকটি শহরে এখনও নিয়মিত ডাবল ডেকার ট্রাম চলে। হংকং তাদের অন্যতম। হংকংয়ের পাবলিত ট্রান্সপোর্ট সিস্টেমকে পৃথিবীর সেরা ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম বলা হয়। শত বছরের পুরোনো ঐতিহ্য তার যেমন ধরে রেখেছে, তেমনি নির্মাণ করেছে আধুনিক নগরজীবন।
আমাদের বাসে আরো কিছু যাত্রী উঠেছে। উপরের তলায় বেশ কিছু যাত্রী বসেছেন। তবে একটি বিষয় লক্ষ্য করলাম যে, বাসের ভেতরে কেউ উচ্চঃস্বরে কথা বলছে না। অধিকাংশ যাত্রী মোবাইলের দিকে চোখ, স্বপন জানালো, এরা সুযোগ পেলেই বই পড়ে। কেউ কেউ মোবাইলে সংবাদ দেখে ফেলেন, কেউবা বই হাতে নিয়ে পড়ছেন। কেউ ফোনে জোরে কথা বলছেন না। নির্দিষ্ট স্টপেজে বাস থামছে, স্বয়ংক্রিয়ভাবে দরজা খুলছে, যারা নামার নেমে যাচ্ছেন, কেউ কেউ বাসে চড়ছেন। চালক একাই বড়সড় বাসটির সবকিছু সামাল দিচ্ছেন। কোন সহকারী বা হেলপার নেই। মামা, বামে প্লাস্টিক বলে চিৎকার করার মতোও কাউকে দেখা গেলো না।
আমরা শহরের কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। দূরে ভিক্টোরিয়া হারবারের দিকের আকাশচুম্বী ভবনগুলো হংকংয়ের গৌরবগাঁথা যেনো চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছিলো। আমাদের বাস যতই অগ্রসর হচ্ছিলো, হংকং যেনো ততই ঘোমটা সরাচ্ছিলো।
আমাদের বাসটি নগরীতে প্রবেশ করলো। প্রচুর মানুষ, প্রচুর গাড়ি। তবে কোথাও আমাদের গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ছিলো না। কোন যানজটও চোখে পড়লো না। একেবারে পরিকল্পনা মতোই যেনো সবকিছু এগিয়ে যাচ্ছিলো।
কী পরিকল্পনা, কি বিন্যাস! আমাদের বাসটি একেবারে সময়ের কাঁটা ধরে এগুচ্ছিলো। যাত্রা শুরুর সময় বাসটি শেষ স্টপেজে যে সময়ে পৌঁছাবে বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে ঠিক সেই সময়ে বাসটি স্টপেজে পৌঁছালো। একমিনিট আগেও না, পরেও না। আমার মনে হলো হংকং শুধু অবকাঠামোখাতেই উন্নতি করেনি, তারা প্রকৌশল শিক্ষায়ও দুনিয়াকে তাক লাগানোর পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। আর এটি সম্ভব হয়েছে সময়ের প্রতিটি মিনিটের যথোপযুক্ত ব্যবহারে, সুনিপুণ পরিকল্পনার মাধ্যমে। মনে হলো, এখানে প্রতিটি মিনিটের মূল্য আছে, প্রতি ইঞ্চি জায়গার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে, আর সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি তা হচ্ছে প্রতিটি নাগরিকের আইনের প্রতি শ্রদ্ধা আছে, সময়ের প্রতি সম্মান আছে। (চলবে)
লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।











