প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ঐতিহ্যের পরিপূর্ণতা, সংষ্কৃতির হস্তান্তর, বাণিজ্যিক ধরনের হস্তান্তর, আচরণের হস্তান্তর, ভাষার হস্তান্তর, ইতিহাসের হস্তান্তর এখনো ঐতিহ্যের আলিঙ্গন করে। যেমন –
হালিশহর: আরবী হাওয়ালে শহর থেকে উৎপত্তি যার অর্থ শহরতলি। এটা ছিল আরব বণিকদের সাময়িক বসবাসের জন্য নির্ধারিত স্থান।
শুলকবহর : আরব বণিকদের নৌ– বাণিজ্যের যুগে প্রাচীন বাণিজ্যিক কর্ণফুলী নদীর তীরে বাণিজ্য তরী অবস্থান করত। তৎকালে সেটি ‘সুলকুলবহর’ নামে খ্যাত ছিল। আরবী সুলকুলবহর শব্দের অর্থ হচ্ছে বাণিজ্য তরীর বিরতি স্থান– পোতাশ্রয়। বর্তমান শুলকবহর।
ষোলশহর : ষোলশহরের জায়গাটি চাহেলে শহর নামে পরিচিত ছিল। চাহেলে শব্দের অর্থ নদীর তীরবর্তী শহর। তৎকালীন একটি ছোট উপনদী বহদ্দারহাট হয়ে ষোলশহরের দিকে ধাবিত ছিল। কালক্রমে আজ যার নাম ষোলশহর।
আন্দরকিল্লা : আরকানি আমলে প্রাচীন দুর্গ ছিল ‘চাটিগাঁ দুর্গ’। ১৬৬৬ সালে মোগল বাহিনী আরকানি বাহিনীকে পরাজিত করে এই দুর্গ দখল করলে সেনাপতি উমেদ খাঁ এই দুর্গের নাম দেন আন্দরকিল্লা।
লালদিঘি : বর্তমান মেট্রোপলিটন পুলিশ সদর দপ্তরের কাছে একটি লাল দালান ছিল, নাম ছিল লাল কুটির, তার সন্নিকটে দিঘিটি হওয়াতে তার নাম ছিল লালদিঘি।
হাজারী লেইন : আন্দরকিল্লার সন্নিকটে অবস্থিত এই গলিটি ১২ জন মোগল হাজারী বা সেনাপতির অন্যতম ভগবান সিংহ হাজারীর বাড়ী ছিল। সেই থেকে বর্তমানে হাজারী লেইন নামের উৎপত্তি।
মেহেদীবাগ : তৎকালে এই এলাকাতে প্রচুর মেহেদী গাছ ছিল। বণিকরা এই এলাকা থেকে মেহেদী পাতা সংগ্রহ করে বিভিন্ন অঞ্চলে বাণিজ্য করতেন। সেই থেকে এই অঞ্চলের নাম মেহেদীবাগ।
চকবাজার : পূর্ব নাম সদর বাজার। আরকানিদের হটিয়ে চট্টগ্রাম মোগল সম্রাজ্যের অন্তুর্ভুক্ত হলে এই বাজার স্থাপনের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম শহরের গোড়াপত্তন হয়। চট্টগ্রামের ১৬তম মোগল শাসক নবাব আলী বেগ খাঁ সদর বাজারের নাম পরিবর্তন করে চকবাজার করেন।
কাপাসগোলা : কার্পাস শব্দের বিকৃত অর্থ রূপ কাপাস। চট্টগ্রামের সমস্ত কার্পাস তুলা বিক্রির জন্য এই অঞ্চলে গোলা বানিয়ে বণিকেরা জমা করত। সেই থেকে এই অঞ্চলের নাম হয় কাপাসগোলা।
কাঠগড় : এই অঞ্চলে আরকানিদের কাঠের নির্মিত দূর্গ ছিল। কাঠের দুর্গের অপরনাম কাঠগড়।
লাভলেইন : ব্রিটিশ আমলে এই স্থানটি ছিল ব্রিটিশ কর্মচারীদের আবাসিক এলাকা। এই এলাকাতে ইংরেজ নারী পুরুষ অবাধে মেলামেশা করত এবং প্রকাশ্যে প্রেম করত। সেই সংষ্কৃতির ধারায় এই অঞ্চলের নাম ছিল লাভলেইন।
আলকরণ : আলকরণের অর্থ হচ্ছে গণ্ডারের সিং। আরব বণিকরা উনাদের বাণিজ্যিক যুগে এই অঞ্চলে গণ্ডারের সিং সংগ্রহ করে জমা করত। তৎকালে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সংগৃহীত গণ্ডারের সিং আলকরণে অবস্থিত আড়ৎ থেকে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে রপ্তানী করত। সেই থেকে এই অঞ্চলের নাম আলকরন।
দেব পাহাড় : ব্রিটিশ সরকার শরচন্দ্র নামের এক ব্যক্তির কাছে খুশি হয়ে পুরস্কার স্বরুপ জয়নামা বা জাহানুমা পাহাড়টি প্রদান করেন। শরচন্দ্র ঐ পাহাড়ের শীর্ষে একটি দেব মন্দির স্থাপন করেন। সেই থেকে এই পাহাড়ের নাম হয় দেব পাহাড়।
অভয়মিত্র ঘাট : ফিরিঙ্গী বাজার নিবাসী ধনাঢ্য রায় বাহাদুর অভয়চরণ মিত্রের নামে এই ঘাট এবং অঞ্চলের নাম হয় অভয়মিত্র ঘাট।
চন্দনপুরা : পার্বত্য চট্টগ্রমে উৎপাদিত আগরকাঠ প্রাচীন কাল হতে চট্টগ্রাম বন্দর হতে জাহাজযোগে ইউরোপে রপ্তানী হতো। আগরকাঠ সেকালে চট্টগ্রামবাসীর কাছে চন্দন কাঠ নামে খ্যাত ছিল। বর্তমান চন্দনপুরায় আগরকাঠের গোলাঘর থাকায় এই অঞ্চলের নাম হয় চন্দনপুরা।
প্যার্সিভিল হিল : চন্দনপুরার বিপরীতে এই উচু পাহাড়ে ব্রেডন প্যার্সিভাল নামের এক পর্তুগীজ বসবাস করার জন্য স্বপরিবারে একটি বাড়ী তৈরী করেন। এই প্যার্সিভাল পরিবারের একাধিক সদস্য ছিল। এক সদস্য চট্টগ্রাম জজ কোর্টের আইনজীবি ছিলেন আর এক সদস্য কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় প্যার্সিভাল পরিবারের শেষ পুরুষ চট্টগ্রাম শহর ত্যাগ করে লন্ডনবাসী হন। তথ্যসূত্র : বিভিন্ন গ্রন্থ ও প্রবন্ধ
লেখক : কবি–ছড়াকার ও মুক্তিযোদ্ধা









