যে পরম রহস্য সর্বজীবে লুকায়িত আছে, বিশ্বব্যাপী যার অবস্থানের জন্য সমস্ত সৃষ্টি অর্থপূর্ণ, সুন্দর ও নয়নাভিরাম হয়েছে, তারই প্রতি মরমী সাধকেরা আকৃষ্ট হন। কেন না মনের মুকুরে তার ছবি ভেসে ওঠে, যদি সে মুকুরে ক্লেদ–গ্লানি না লাগে।
মানুষ না বুঝে বনে– জংগলে পাহাড়–পর্বতে তাঁকে সন্ধান করে, কিন্তু পরম আরাধ্য বাস করেন মানুষের হৃদয়ে। সেই প্রেমময়ের প্রেম–অভিষিক্ত ধরণীর আলোঝলমল একটি পাতার দিকে তাকিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন–
এই তো তোমার প্রেম ওগো হৃদয় হরণ
এই যে পাতায় আলো নাচে সোনার বরণ।
এ সম্পর্কে মরমী কবি শেখ শাদীর উক্তিও স্মরণীয়।
তিনি বলেন :
‘হে প্রভু তোমাকে বুঝিবার জন্য সহস্র খণ্ড হাদিস ও দর্শনের প্রয়োজন হয় না। ঐ যে প্রভু শ্যামল তরুশিরে সুচিত্রিত পল্লবরাজি, তত্ত্বজ্ঞানীর নয়নে ইহার প্রত্যেক পত্র তোমার মাহাত্ম্যপূর্ণ একটি মহাগ্রন্থ স্বরূপ। সুতরাং মরমী দৃষ্টিতে বিশ্বের মধ্যে স্রষ্টাকে উপলব্ধি করিবার চেতনা এক অতি স্বাভাবিক ব্যাপার।’
কবি ব্লেকের ভাষায়–
‘To see World in a grain of sand
And a Haven in a wild flower
Hold infinity i the palm of your hand
And Eternity in an hour.’
সাধক কবি রকিব শাহের মধ্যে ও মনের মানুষের সন্ধানের প্রবণতা জন্মেছিল ঐ সব অন্তর্দৃষ্টির প্রভাবে, স্রষ্টার সৃষ্টিরহস্য উপলব্ধির প্রাবল্যে। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন সেই চিরন্তন মহাশক্তি আপন ঘরে বিরাজমান ।
ইংরেজিতে ‘মিস্টিসিজম’ একটি তাৎপর্যপূর্ণ শব্দ। এই শব্দটির বাংলা অর্থ হচ্ছে ‘মরমীবাদ’। আবার ‘মরমী’ বলতে এমন একটি বিষয়কে বুঝায়, যে বিষয়টি অস্পষ্ট, গূঢ় অর্থপূর্ণ, গুপ্তরহস্যমণ্ডিত এবং হৃদয় দ্বারা অনুভূত বিষয়। ‘মরমী’ একজন ব্যক্তিকেও বুঝায়, যে ব্যক্তি স্রষ্টার সাথে প্রত্যক্ষ সংযোগ স্থাপন করতে সক্ষম। অর্থাৎ পরম সত্যের সাথে যার মর্ম বা অন্তঃকরণ সংযুক্ত তিনিই মরমী। প্রেম মিশ্রিত ধ্যান ও স্বজ্ঞা বা বোধি দ্বারা পরম সত্তার সাথে যোগাযোগ স্থাপনের অভিজ্ঞতাই ‘মরমীবাদ’।
মরমী সাধক রকীব শাহ সিলেট শহরের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত কাজিটুলায় ১৩০৮ বংগাব্দের (১৯০২খ্রী) ১৭ ফাল্গুন জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম কাজী মোহাম্মদ ইব্রাহিম এবং মাতার নাম জমির রৌশন। তার আসল নাম আবদুর রকীব। পরে লেখালেখিতে রকীব শাহ উল্লেখ করেন।
প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে রকীব শাহ সিলেটের রাজা জি, সি, উ”চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পর থেকে তার মধ্যে ভাবান্তর পরিলিক্ষত হয়। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে তার মনে জীবন ও জগত সম্পর্কে নানা জিজ্ঞাসার উদয় হয়।
রকীব শাহ সুনামগঞ্জের মহকুমা প্রশাসক এর কার্যালয়ে অফিস সহকারী পদে চাকুরিরত অবস্থায় সুনামগঞ্জের আউল বাঊল, ওলি আউলিয়া, পীর ফকিরের এই ভাটি এলাকার মরমী ভাবধারা এবং মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ তাঁকে ভাবুক করে তোলে।
সুনামগঞ্জের প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী, অবারিত মাঠ, উদার আকাশ প্রভৃতির প্রভাব রকীব শাহ কে রীতিমত মরমী কবি করে তোলে। উপরন্তু আরকুম শাহ এর মরমী সংগীত যেমন:
দেখ চাইয়া তোর দেহার মাঝে
লাগছে রসের বিকি
পিন্িজরা তুই খরিদ কর পাখী।
বস্তুত পিন্িজরা, পাখী, দেহতরী ইত্যাদি রূপক শব্দ এবং সংগীতে বিধৃত তত্ত্ব রকীব মানসে সৃষ্টি করে অনেক জিজ্ঞাসা ।
বিশেষতঃ বিশ্বের বহু দেশ পরিভ্রমণ, বহু সাংস্কৃতি ও মানুষ, মানুষের ভাষা রপ্ত ও মানুষ্য জাতির বিভিন্নতা, ধর্ম, আচার, আচরণ লক্ষ্য করে ফিরে এসে অবশেষে সুনামগঞ্জের মরমী পরিবেশ রকীবের মানস চাঞ্চল্য ঘটায় আর যে তত্ত্ব পিপাসা সৃষ্টি করে সিলেটের দূই মরমী কবি (আরকুম শাহ ও লতিফ শাহ) তাই জাগায় রকীব মানসে মরমী সংগীতের ঢেউ এবং এতসব বিষয়াবলী ও এ জগতের চেয়ে পরজগতের ভাবনাই তাঁকে বেশি বিচলিত করে।
সরকারি চাকরি ছেড়ে রকীব শাহ কিছু দিন ঘরে বসে আধ্যাত্ম ভাবনায় ও সাধনায় নিমগ্ন হন। এ সময় তিনি একজন আধ্যাত্ম সাধকের সান্নিধ্যে আসেন। এই সংস্পর্শ বদলে দেয় রকিব শাহের দৃষ্টিভংগী। তিনি পার্থিব জীবনকে গৌণ ভেবে পারলৌকিক জীবনকে মুখ্য বলে ধরে নেন। তিনি একজন গুরুর সন্ধান করতে থাকেন। অবশেষে আক্রম আলী ওরফে আরকুম শাহ এর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন।
আরকুম শাহের নিম্নোক্ত গানের মর্ম উপলব্ধি করে রকীব শাহ আরকুম শাহের প্রতি আকৃষ্ট হন–
চার চিজে পিন্িজরা বানাই
মোরে কইলাম বন(বন্দি)
রে বন্ধু নির্ধনিয়ার ধন
আমি নি পাইমুরে কালা
তোর দরশন।
রকীব শাহের জীবনের সাধনার মূল হচ্ছে ‘মরমী’ সংগীত। তাই তিনি মরমী সাধক। এই মরমী সংগীত আসলে লোকসংগীত। রকীব শাহ ছিলেন একজন সূফী মরমীয়া ভাবসাধক। তিনি লেখেন:
মনরে,
কামনদীর তরঙ্গ ভারী
এই নদীতে দিওনা পাড়ি
এই নদীতে কত মানুষ মইলা ডুবিয়া।।
ধর্মের গুপ্তরহস্য বা তাসাউফ যা থেকে সুফীতত্ত্বের উদ্ভব ও বিকাশ তাকেই তিনি মানুষ্যজন্মের সারাৎসার সাধন পন্থা বলে মেনে নিয়েছেন।
রকীব শাহ তাঁর বনবীথি কাব্যের ‘তোমার আসন’ কবিতায় লেখেন:
আমার মলিন হিংসা মনের চোখের জলে
ডুবুক সকল বন– গহীনের অতল তলে
আমার জীবন রঙিন স্বপন
আমার সকল সত্য সাধন
লুটিয়া পড়ুক তোমার পায়ের ধূলার পরে
হয় যেন সব আমার সকল তোমার তরে।
স্রষ্টার নিকট পূর্ণ আত্মসমর্পণ, তার চরণে সকল চাওয়া পাওয়ার ইচ্ছা বিলীন করা সর্বোপরি তারই সত্তায় নিজের সত্তা হারিয়ে ফেলা এবং সকল অহংবোধ বিসর্জন দেওয়া এ স্তবকের মর্মকথা।
আত্মতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব বা নিজেকে জানা, মুর্শিদ বাক্য বা গুরুবাক্য পালন বা ‘বরযখ’ যা পীর মুরশীদের সুরত।
বস্তুত বরযখ ধরেই মরমীদের সাধনা। রকীব শাহের মরমী দর্শন এই বিশ্বাস ও তত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত।
রকীব শাহ সুফীত্ত্বত্বের অনুসারী সাধক। তাই তিনি ফানাফিল্লাহ স্তর পেরিয়ে বাকাবিল্লা লাভের সাধনায় মশগুল ছিলেন।
সকল মরমী কবিই দেহকে সাধনার প্রধান অবলম্বন বলে ধরে নিয়েছেন। মাটির দেহ হচ্ছে এই আরাধ্যের বারামখানা। বাইরে না খুঁজে দেহ মধ্যেই তাকে খোঁজ করতে হয়। স্রষ্টা কোন ঊর্ধ্ব লোকে নেই, তিনি আছেন মনের মণিকোঠায় অর্থাৎ এই মাটির দেহেই তার অবস্থান। মরমীবাদের এই সহজ তত্ত্বটি রকীব শাহের নিম্নোক্ত গানে বিধৃত হয়েছে:
খাকের পিন্জরে আও দেখি
আমার রঙ দুলাল পাখী
খাকের পিন্জরে আও দেখি।।
পাখীরে ,
আমি ডাকি অন্তর চিরি,
করিওনা ওড়াউড়ি
সোনালী পিন্জরে আও দেখি
ঘরের পাখী ঘরে আওরে,
রাখব তোরে যত্ন করে
সুখেতে করিবে বাস
আমার সংগে থাকি।।
পাখীরে,
রাখব পাখী পালি পুষি,
করিব তোমারে খুশী
হইবাই তুমি এ জনমের সুখী
পাখী তুমি আর যাইওনা,
তোমাকে করি যে মানা
গেল তুমি কলংকিনী আমি।।
পাখীরে,
আব আতশ খাগ বাত,
বানাইয়া পিন্জরের সাথ
সেই পিন্জরে কৈলাম তোমায় বন্দী
কদমী মোকামে থাকি
আনন্দে বিরাজ পাখী
শুনব মুখের মধু মাখা বাণী।।
পাখীরে,
হেরিবো মুই লীলা খেলা
করিব মুই রঙের মেলা
তোমায় লইয়া দিবস যামিনী
মৌলার পাগল রকীব সাথে
থাক পাখী আনন্দেতে
জীবন ভরিয়া তোমায় দেখি।।
১৩৭৪ (১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দ) বংগাব্দের ২৮ বৈশাখ শুক্রবার
রাত ১০টায় ৬৬ বছর বয়সে অল্প দিনের জন্য এসে কাব্য ও মরমী সংগীত জগতে যথেষ্ট অবদান ও দক্ষতার স্বাক্ষর রেখে মরমী কবি রকীব শাহ নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে যান।
চতুর্দশ শতক থেকে উনিশ শতক পর্যন্ত সাধক ফকির দরবেশ এবং কবি সাহিত্যিকের অবদানে বাংলায় সুফীতত্ত্ব, মরমী সাহিত্য ও সংগীতের ধারা সমৃদ্ধ হয়েছে। এ প্রসঙ্গে ভাবসংগীত রচয়িতা লালন শাহ, দুদ্দু শাহ, পান্জুশাহের নাম স্মরণীয়। তাদের আত্ত্বিক ও তাত্ত্বিক অবদান অনস্বীকার্য। রকিব শাহ এ ধারারই এক অতি স্বাভাবিক এবং স্বতঃস্ফূর্ত প্রবাহ সৃষ্ট সাধক কবি। সুফীতত্ত্বের দীর্ঘ ইতিহাসের সাথে তিনি স্বনামধন্য সাধক কবি হিসেবে নিজেকে যুক্ত করেছেন। তাঁর এ সংযুক্তি বাংলাদেশের মরমী চিন্তা ধারা এবং মরমী সাহিত্যধারার সপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ প্রাপ্তি।
লেখক : লোকসংগীত শিল্পী, প্রাবন্ধিক












