রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, “সর্বোচ্চ শিক্ষা সেটাই, যা আমাদের কেবল তথ্য দেয় না; বরং আমাদের জীবনকে সামগ্রিক অস্তিত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলে।” আজকের বিশ্বে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যও ঠিক তাই, শুধু একজন স্নাতক তৈরি করা নয়, বরং এমন একজন মানুষ গড়ে তোলা, যিনি জ্ঞান, মূল্যবোধ, নেতৃত্ব এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার সমন্বয়ে সমাজ ও দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে সক্ষম।
প্রায় আড়াই দশকের শিক্ষকতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিজ্ঞতায় আমি একটি বিষয় গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি- একজন শিক্ষার্থীর সাফল্য কেবল তার সিজিপিএ ওপর নির্ভর করে না। বরং তার নেতৃত্বের সক্ষমতা, যোগাযোগ দক্ষতা, দলগতভাবে কাজ করার মানসিকতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, নৈতিকতা, অভিযোজনশীলতা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতাই তাকে একজন সফল পেশাজীবী ও দায়িত্বশীল নাগরিকে পরিণত করে। আর এসব গুণের বিকাশ ঘটে মূলত শ্রেণিকক্ষের বাইরের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং প্রযুক্তিনির্ভর কর্মপরিবেশ এমন এক প্রজন্মের চাহিদা তৈরি করেছে, যারা শুধু বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান অর্জন করলেই চলবে না; বরং পরিবর্তিত বাস্তবতায় নিজেকে মানিয়ে নিতে, নতুনভাবে চিন্তা করতে এবং বহুমাত্রিক পরিবেশে কার্যকরভাবে কাজ করতে পারতে হবে।
বাংলাদেশ বৈশ্বিক দর্শনের বাইরে নয়। জাতীয় শিক্ষানীতিতেও সৃজনশীলতা, নৈতিকতা, বৈজ্ঞানিক মনন, মানবিক মূল্যবোধ, দেশপ্রেম এবং নেতৃত্বের বিকাশকে শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার চতুর্থ লক্ষ্য ‘সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং আজীবন শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি’ শিক্ষাকে কেবল পরীক্ষার ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এমন নাগরিক তৈরির কথা বলে, যারা সমালোচনামূলকভাবে চিন্তা করতে পারে, বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভূমিকা রাখতে পারে এবং টেকসই উন্নয়নের অংশীদার হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে সফট স্কিল কর্মজীবনের অপরিহার্য ভিত্তি। যুক্তরাষ্ট্রের ঘঅঈঊ এর গবেষণায় দেখা যায়, নিয়োগদাতারা কার্যকর যোগাযোগ, দলগতভাবে কাজ করার সক্ষমতা, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নেয়া, সমালোচনামূলক চিন্তা, নেতৃত্ব, নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, পেশাদারিত্ব এবং উদ্যোগী মানসিকতাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতার মধ্যে বিবেচনা করেন।
কিন্তু এসব দক্ষতা কীভাবে গড়ে ওঠে?
এর উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় শিক্ষাবিদ জন ডিউই এবং ডেভিড কোলবের দর্শনে। জন ডিউই বলেছিলেন, “ÒEducation is not preparation for life; education is life itself. ” আর ডেভিড কোলবের ‘Experiential Learning Theor ’ অনুযায়ী, বাস্তব অভিজ্ঞতা, সেই অভিজ্ঞতার বিশ্লেষণ এবং পুনরায় তা প্রয়োগের মধ্য দিয়েই প্রকৃত শিক্ষা অর্জিত হয়।
আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, যে শিক্ষার্থী প্রথম বর্ষে নিজের পরিচয় দিতে সংকোচ বোধ করত, কয়েক বছরের মধ্যেই সেই শিক্ষার্থী একটি জাতীয় সম্মেলন সঞ্চালনা করছে, গবেষণাপত্র উপস্থাপন করছে, একটি সামাজিক উদ্যোগের সফল নেতৃত্ব দিচ্ছে। এই পরিবর্তনের পেছনে কোনো অলৌকিক ঘটনা নেই; রয়েছে সহশিক্ষা কার্যক্রমে ধারাবাহিক অংশগ্রহণ, দায়িত্ব গ্রহণের সুযোগ, ভুল থেকে শেখার মানসিকতা এবং একজন শিক্ষকের সঠিক দিকনির্দেশনা।
প্রকৃতপক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহশিক্ষা কার্যক্রমের শক্তি এখানেই। শ্রেণিকক্ষে অর্জিত তাত্ত্বিক জ্ঞান বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে একজন শিক্ষার্থীর মধ্যে আত্মবিশ্বাস, নেতৃত্ব, মানবিকতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার ভিত্তি তৈরি করে। একজন শিক্ষার্থী যখন কোনো সংগঠন পরিচালনা করে, গবেষণা প্রকল্পে অংশগ্রহণ করে, স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমে যুক্ত হয় তখন তার ভেতরে এমন কিছু দক্ষতা গড়ে ওঠে, যা কোনো পাঠ্যপুস্তক একা দিতে পারে না।
এই বাস্তবতার প্রতিফলন আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন ও সহশিক্ষা কার্যক্রমেও দেখতে পাই। প্রায় আড়াই দশকের শিক্ষকতা এবং বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, এসব প্ল্যাটফর্মে নিয়মিত অংশগ্রহণ একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্বে দৃশ্যমান পরিবর্তন নিয়ে আসে। প্রথম দিকে অনেক শিক্ষার্থীই দ্বিধাগ্রস্ত থাকে; কিন্তু পরিকল্পনা, আয়োজন, গবেষণা, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ দিয়ে তারা ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাসী, দায়িত্বশীল ও নেতৃত্বদানে সক্ষম হয়ে ওঠে।
এর বাস্তব উদাহরণ ‘One Health Young Voice, Bangladesh ’- মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্যকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করার ‘ওয়ান হেলথ’ ধারণাকে তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে সংগঠনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স, জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্যনিরাপত্তা, সংক্রামক রোগ, জনস্বাস্থ্য এর মতো বৈশ্বিক বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে এটি তাদের কেবল সচেতনই করছে না, বরং বাস্তব সমস্যার সমাধানে অংশগ্রহণের মানসিকতাও গড়ে তুলছে। একইভাবে ‘International Veterinary Students’ Association, Bangladesh ’- ভেটেরিনারি শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি ও পেশাগত সক্ষমতা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। পাশাপাশি ন্যাশনাল ডিবেট ফেডারেশন বাংলাদেশ -এনডিএফ বিডি শিক্ষার্থীদের যুক্তিবাদী চিন্তা, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ ও মতবিনিময় এবং গণতান্ত্রিক চর্চার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে। এসব সংগঠনের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, সহশিক্ষা কার্যক্রম কেবল একজন ভালো শিক্ষার্থী নয়, বরং একজন দক্ষ, মানবিক ও ভবিষ্যতমুখী নেতা গড়ে তোলার মাধ্যম।
শিক্ষার্থীদের এই বিকাশে রাষ্ট্রের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামপ্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ – যেমন নতুন কুঁড়ি ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড, উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন কার্যক্রম তরুণদের শ্রেণিকক্ষের বাইরে নিজেদের প্রতিভা বিকাশের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এসব উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল চিন্তা, বৈজ্ঞানিক কৌতূহল, পরিবেশ সচেতনতা, উদ্ভাবনী মনোভাব এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতে সহায়তা করছে। এ ধরনের উদ্যোগ যত বিস্তৃত হবে, ততই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি হবে।
তবে সহশিক্ষা কার্যক্রমের প্রকৃত সাফল্য অনেকাংশেই নির্ভর করে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের ওপর। একজন শিক্ষক কেবল পাঠদানকারী নন; তিনি একজন মেন্টর, অনুপ্রেরণাদাতা এবং পথপ্রদর্শক। একজন শিক্ষার্থীর সম্ভাবনা চিহ্নিত করা, তাকে দায়িত্ব দেওয়া, ভুল করার সুযোগ সৃষ্টি করা এবং সঠিক সময়ে উৎসাহ দেওয়া এসবই একজন শিক্ষকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, একজন শিক্ষকের সামান্য আস্থাও অনেক সময় একজন শিক্ষার্থীর জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। যে শিক্ষার্থী নিজেকে সাধারণ মনে করত, সঠিক দিকনির্দেশনা পেয়ে সেই শিক্ষার্থীই পরে গবেষক, সংগঠক কিংবা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের প্রতিনিধিত্বকারী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) বিভিন্ন সময়ে গবেষণা, উদ্ভাবন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিল্প-বিশ্ববিদ্যালয় সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। এখন সময় এসেছে সহশিক্ষা কার্যক্রমকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার প্রান্তিক বিষয় হিসেবে নয়, বরং উচ্চশিক্ষার একটি অপরিহার্য অংশ হিসেবে আরও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মূল্যায়ন করার।
আগামী বাংলাদেশের জন্য যদি আমরা দক্ষ, নৈতিক, উদ্ভাবনী ও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব গড়ে তুলতে চাই, তবে একাডেমিক উৎকর্ষের পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রম, গবেষণা, স্বেচ্ছাসেবা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক এবং শিক্ষার্থীদের সক্রিয় সম্পৃক্ততাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
লেখক: শিক্ষাবিদ ও অধ্যাপক, মনিটর, জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন (কৃষি, চট্টগ্রাম বিভাগ); পরিচালক, ওয়ান হেলথ ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় (সিভাসু)।











