স্থূলকায় শিশুর ওজন কমানো

ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী | বৃহস্পতিবার , ৩০ জুলাই, ২০২৬ at ৫:৩৫ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান পুষ্টি সমস্যা শিশুর স্থূলকায়ত্ব। মেদবহুল শিশুকে ‘স্বাস্থ্যবান শিশু’ বলা চলে না। স্থূলকায়ত্ব একটা অসুখ। শিশুবয়সে যারা এর শিকার, প্রাপ্তবয়স্ককালে তারা নানাবিধ রোগজটিলতায় পড়ে।

বিএমআই হিসেব করে শিশুর স্থূলকায়ত্ব নির্ধারণ করা হয়। যেমন

ক্স দু’বছরের বেশি বয়সে শিশুর বিএমআই যদি ৯৫তম সারণীর সমান বা বেশি থাকে তবে তাকে ‘স্থূলকায়’ বলে চিহ্নিত করা যায়। বিএমআই ৮৫ থেকে ৯৫ তম রেখার মধ্যে থাকে যদি, তবে সে হবে ‘অতিরিক্ত ওজন’ এর তালিকাভুক্ত।

হ অতিরিক্ত ওজনের শিশু প্রধানত দুধরনের। প্রথমটা প্রাইমারি। যেখানে স্থূলকায় হওয়ার বংশগত ধাত পাওয়া যায়। তবে এক্ষেত্রে ওজন অনুযায়ী শিশুর উচ্চতা থাকে স্বাভাবিক। এধরনের মেদবহুলতার এর সূচনা ঘটেঅতিরিক্ত খাওয়ানো, অতিরিক্ত ক্যালরির যোগান। যা ক্রমাগত জমা হয়ে দেহে চর্বি বৃদ্ধি ঘটায় ও শিশুকে মেদবহুল করে।

হ শিশুর অতিরিক্ত ওজন হওয়ার দ্বিতীয় শ্রেণিটা সেকেন্ডারি, যা হরমোন সমস্যা সহ বিভিন্ন অসুখের কারণে তৈরি।

স্থূলকায় শিশুর নানা ঝুঁকি

সাইকোলজিক্যাল: স্কুলে স্থূলকায় বলে তাকে উপহাসের কারণে মানসিক আঘাত।

– ‘সিডোটিউমার সেরিব্রি’ নামক ব্রেইনের অসুখ।

শ্বাসপ্রশ্বাসে কষ্ট, বিশেষত ঘুমানো অবস্থায়।

উচ্চ রক্তচাপ, হার্টের অসুখ, ডায়াবেটিস, বিভিন্ন বাতব্যাধি।

স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলাদৌঁড়া ব্যাহত , ফলে নানা পথ দুর্ঘটনায় পড়ে।

স্থূলকায় হওয়ার কার্যকারণ

হ শিশু স্থূলকায় হওয়ার জন্য শিশুজীবনের প্রথম বছরটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত খাওয়ানোর কারণে স্থূলকায় হওয়া শিশুর বেশিসংখ্যক চর্বিকোষ এজন্য দায়ী, যা শিশুর প্রথম বছরে নির্ধারিত হয়। পরে এসব কোষ কেবল আকারে বাড়ে। মনে রাখতে হবে জীবনের কোনো পর্বে মোটা হওয়াটা বাঞ্ছনীয় নয়, তা একদিনের শিশুবয়স থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স অবধি।

হ রোগ নির্ণয়ে যেসব ইতিহাস নেওয়া হয় তার মধ্যে আছেকখন থেকে অতিরিক্ত ওজন বাড়া শুরু , শিশুর খাবার গ্রহণের চার্ট, খেলাধুলা শরীরচর্চা করে কতটা, কতটা সময় শিশু সেডেনট্যারি কাজে কাটায়, যেমনসোফায় বসে টেলিভিশনে মজে থাকা, পরিবারে আরো স্থূলকায় সন্তান, বা বয়স্ক লোকজন আছে কিনা ইত্যাদি।

হ টেলিভিশনে বেশি সময় কাটানোর সাথে সঙ্গতি রেখে শিশু স্থূল ওজনের হয়। এছাড়া পিতামাতার একমাত্র সন্তান হলে সে শিশুর স্থূলকায় হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

হ স্থূল ওজনের শিশুর রক্তচাপ, ত্বকের পরীক্ষা, থাইরয়েড, হার্ট, পেট, প্রস্রাব , এনডোক্রিন সম্পর্কিত ল্যাবটেস্টের প্রয়োজন হতে পারে।

শিশুর অতিরিক্ত ওজন : প্রতিরোধ ব্যবস্থাপনা

. মায়ের গর্ভকালিন সময়ে :

হ স্বাভাবিক ‘বিএমআই’

হ অধূমপায়ী

হ মাঝারি ধরনের (সহ্য করার মতো ) ব্যায়াম

হ গর্ভকালিন ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা।

.শিশুর প্রথম বছর :

হ ৬ মাস বয়স পর্যন্ত শুধুমাত্র বুকের দুধপান

হ ফর্মূলা খাবার না খাওয়ানো।

. পরিবারে :

হ নির্দিষ্ট সময়ে পরিবারের সবাই মিলে একত্রে খাবার গ্রহণ

হ শিশুকে খাওয়ানো যেন মাঝে মাঝে বাদ না যায়বিশেষত: ব্রেকফাস্ট

হ খাওয়ানোর সময় টেলিভিশন বা মোবাইল না দেখা

হ ছোট প্লেট ও সারভিং ডিশ্‌ এর ব্যবহার

হ বেশি বেশি মিষ্টি বা চর্বিজাতীয় খাবার, বা সুগার ড্রিংকস না খাওয়ানো

হ শিশুর বেডরুম হতে টেলিভিশন অপসারণ। এবং তার টেলিভিশন ও ভিডিও গেমস্‌ খেলা কড়াকড়ি ভাবে নির্ধারণ।

. স্কুলে :

হ ক্যান্ডি, কুকি এসব খাবারের যোগান বন্ধ

হ জুসড্রিংকস এ জাতীয় খাবার কেনার টাকা না দেওয়া

হ পরিশ্রুত পানীয় জলের ব্যবস্থা

হ ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতিতে শিক্ষকশিক্ষিকাদের স্বাস্থ্যকর খাবার ও লাইফস্টাইল নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম

হ সপ্তাহে অন্তত ৫ দিন, দৈনিক ৬০ মিনিটের শরীরচর্চা।

লেখক : চিকিৎসাবিদ, অধ্যাপক; সাবেক বিভাগীয় প্রধান,

শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপ্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সুরক্ষা প্রসঙ্গে
পরবর্তী নিবন্ধযে শিক্ষা সিলেবাসে নেই, কিন্তু জীবন গড়ে