নড়বড়ে খুঁটির ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় তিনশো ফুট দীর্ঘ একটি জরাজীর্ণ কাঠের সেতু। এর ওপর দিয়ে একটি মোটরসাইকেল কিংবা সিএনজি টেক্সি গেলেই পুরো সেতুটি দুলতে থাকে। ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলার নারায়ণহাট বাজার এলাকায় হালদা নদীর ওপর নির্মিত এই সেতুটি দিয়ে প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হচ্ছেন। একটি স্থায়ী পাকা বা বেইলী সেতুর অভাবে নারায়ণহাট ইউনিয়নের হাঁপানিয়া, সুন্দরপুর ও সাপমারাসহ পাঁচটি গ্রামের প্রায় ১৫ হাজার বাসিন্দাকে নিত্যদিনই চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, জনগুরুত্বপূর্ণ এই স্থানে একটি টেকসই সেতু নির্মিত হলে এই অঞ্চলের গ্রামগুলো সরাসরি ফেনী–চট্টগ্রামের অন্যতম বিকল্প রুট হিসেবে পরিচিত গহিরা–হেঁয়াকো সড়কের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারত। সেতুটি দিয়ে প্রতিদিন স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় যাতায়াত করতে হয় শত শত কোমলমতি শিক্ষার্থীর। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী আফরোজা আক্তার তার নিত্যদিনের ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলে, আমরা প্রতিদিন যখন এই ব্রিজ দিয়ে পার হই, তখন আতঙ্কে আমাদের বুক কাঁপে। আর বর্ষাকালে নদীর পানি বৃদ্ধি পেলে ব্রিজের ওপর দিয়ে যাওয়া যায় না। ব্রিজটি ভেঙে গেলে তখন বাধ্য হয়ে ছোট নৌকায় করে চরম ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হতে হয়। আমাদের এই ভয় আর কষ্টের শেষ কোথায় আমরা জানি না।
দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই চরম ভোগান্তি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিত্ব তাহের মাস্টার। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আমরা যুগের পর যুগ ধরে এভাবে কষ্ট করে যাচ্ছি। এই ব্রিজটার জন্য প্রশাসনের বিভিন্ন জায়গায় অনেক তদবির করেছি, কিন্তু এখনো কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আমরা আর কতকাল এভাবে চলব? এই নরকযন্ত্রণা থেকে আমরা দ্রুত পরিত্রাণ চাই।
জানা যায়, সবচেয়ে বড় দুর্ভোগ দেখা দেয় বর্ষা মৌসুমে। বন্যা বা পাহাড়ি ঢলে উজানের পানির তোড়ে প্রতিবছরই সেতুটি আংশিক বা পুরোপুরি ভেঙে যায়, কিংবা নদীর পানিতে তলিয়ে থাকে। সেতুটি ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে দুর্ভোগের আর সীমা থাকে না। পরবর্তীতে নিরুপায় হয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা আবারো নিজেদের মধ্যে চাঁদা তোলেন। প্রতিবার এভাবে ১ থেকে দেড় লাখ টাকা সংগ্রহ করে নিজেদের উদ্যোগে সেতুটি মেরামত বা পুনঃনির্মাণ করে সাময়িকভাবে যাতায়াত সচল করতে হয়।
নারায়ণহাটের বাসিন্দারা জানান, এই পাঁচ গ্রামের উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারে নেওয়া কিংবা যেকোনো জরুরি চিকিৎসায় অ্যাম্বুলেন্স বা ভারী যান নিয়ে এলাকায় ঢোকার কোনো উপায় নেই। কাঠের এই দুর্বল কাঠামোর কারণে গহিরা–হেঁয়াকো মূল সড়ক থেকে কোনো জরুরি যানবাহন এসব গ্রামে প্রবেশ করতে পারে না। ফলে চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবেও পিছিয়ে পড়ছে পুরো অঞ্চলটি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফটিকছড়ি উপজেলা প্রকৌশলী জুনায়েদ আবছার বলেন, হালদা নদীর ওপর দিয়ে সরাসরি পাকা ব্রিজ বা সেতু করার ক্ষেত্রে সরকারি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এখানে ঝুলন্ত সেতু করতে হলেও পরিবেশ ও কারিগরি অনেকগুলো দিকনির্দেশনা মেনে চলতে হয়। তবে আশার কথা হলো, স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘবে নারায়ণহাট এলাকায় হালদা নদীর ওপর একটি বেইলি ব্রিজ নির্মাণের প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে।
উপজেলা প্রকৌশলীর বেইলি ব্রিজের এই আশ্বাসের পর ফটিকছড়ির এই প্রত্যন্ত অঞ্চলের ভুক্তভোগী মানুষেরা এখন চেয়ে আছেন–কবে নাগাদ আলোর মুখ দেখবে এই প্রকল্প এবং কবে শেষ হবে তাদের তিন দশকের এই ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার।












