এখন চলছে কাঞ্চন পেয়ারার ভরা মৌসুম। বর্তমানে চন্দনাইশসহ আশেপাশের বেশ কয়েকটি উপজেলা, চট্টগ্রাম নগরীসহ সবখানে পাওয়া যাচ্ছে এই পেয়ারা। আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে পুরোদমে বাজারে আসছে পেয়ারা। প্রতিদিন চট্টগ্রাম–কঙবাজার মহাসড়কের বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি সংলগ্ন রওশনহাটে বসে কাঞ্চন পেয়ারার বিশাল বাজার। এছাড়া মহাসড়কের বাদামতল, বাগিচাহাট ও দোহাজারী সদরে বসে পেয়ারার বাজার।
পেয়ারা উৎপাদনের সাথে জড়িত চাষিরা প্রতিদিন গভীর রাতে ভয়–ডর উপেক্ষা করে পেয়ারা সংগ্রহ করতে চলে যান গহীন বাগানে। ভোরের আলো ফুটতেই পেয়ারা সংগ্রহ করে কাঁধে বহন করে কয়েক কিলোমিটার হেঁটে চলে আসেন চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কের পাশে। পাইকাররা সেখান থেকে পরিমাণ মতো পেয়ারা কিনে সরবরাহ করেন প্রত্যন্ত অঞ্চলে। কোনো ধরনের ক্ষতিকারক কীটনাশক প্রয়োগ ছাড়াই এখানকার পেয়ারা উৎপাদন হওয়ায় অর্গানিক পেয়ারা হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছে এটি। উপজেলার পাহাড়ি অঞ্চল কাঞ্চননগর, হাশিমপুর, দোহাজারী, ধোপাছড়ি এখন পেয়ারা গ্রাম হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে কাঞ্চননগরে সর্বাধিক উৎপাদন হওয়ায় এখানকার পেয়ারার নামকরণও হয়ে গেছে কাঞ্চন পেয়ারা হিসেবে।
কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে ৭৫৫ হেক্টর জমিতে পেয়ারা বাগান করেছেন বাগানিরা। প্রতি হেক্টরে ১৫ মেট্রিক টন হিসেবে পরিমাণ দাঁড়ায় ১১ হাজার ৩২৫ টন। প্রতি টন ৮৫ হাজার হিসেবে টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় ৯৬ কোটি টাকার উপরে। কাঞ্চন পেয়ারা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ২০২৪ সালের শুরুর দিকে ইউএনও অফিসের মাধ্যমে কাঞ্চন পেয়ারার বৈশিষ্ট তুলে ধরে জেলা অফিসে সকল প্রকার তথ্য প্রেরণ করেছে উপজেলা কৃষি অফিস।
জানা যায়, চন্দনাইশের কাঞ্চন পেয়ারা খুবই সুস্বাদু হওয়ায় সারা দেশে এর প্রচুর চাহিদা রয়েছে। তারপরও পেয়ারা মজুদ রাখার মত হিমাগারের অভাবে প্রতি মৌসুমে নষ্ট হয়ে যায় শত শত টন পেয়ারা। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এ এলাকায় গোয়াবা জেলির কারখানা করা যায়, তাহলে এ মূল্যবান কাঞ্চন পেয়ারা নষ্ট না হয়ে জেলি হিসেবে খেতে পারতেন সাধারণ মানুষ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পেয়ারা বাগান করে কয়েক হাজার মানুষ তাদের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে নিয়েছেন। শত শত বেকার যুবক স্বাবলম্বী হয়ে পরিবারের হাল ধরেছেন। পাশাপাশি সংগ্রহ, পরিবহনেও কয়েক হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। আবার অনেকেই পেয়ারা চাষে শূন্য থেকে পরিণত হয়েছে লাখপতিতে।
চলতি মৌসুমে ৭৫৫ হেক্টর পাহাড়ি ভূমিতে বড়–ছোট কমপক্ষে ২ হাজার বাগানে পেয়ারার চাষ হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আজাদ হোসেন। এ অঞ্চলে উৎপাদিত পেয়ারা সংরক্ষণের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতায় কৃষি বিপণন বিভাগ থেকে হিমাগার নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তিনি জানান, চলতি মৌসুমে পেয়ারার ফলন ভালো হয়েছে। পেয়ারা চাষে প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করা হয় চাষিদের। এছাড়া চন্দনাইশের বিখ্যাত এ পেয়ারার জিআই স্বীকৃতি পেতে ইতিমধ্যে সমস্ত তথ্য–উপাত্ত ইউএনও অফিসের মাধ্যমে জেলা অফিসে প্রেরণ করা হয়েছে। আশা করি জিআই স্বীকৃতি পাবে কাঞ্চন পেয়ারা। এখানকার উৎপাদিত পেয়ারা সাইজে বড়, দেখতে সুন্দর, খেতে সুস্বাদু এবং পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ হওয়ায় দেশব্যাপী প্রচুর চাহিদা রয়েছে।
প্রতিদিন দূর–দূরান্ত থেকে এসে পাইকাররা বিভিন্ন পরিবহনে করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সরবরাহ করেন। সাইজ অনুযায়ী বর্তমানে খুচরা বাজারে প্রতি ডজন ছোট আকারের পেয়ারা ৫০ টাকা আর বড় সাইজের প্রতি ডজন ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বিক্রির নির্দিষ্ট কোনো স্থান না থাকায় বাধ্য হয়ে পেয়ারা বিক্রেতারা চট্টগ্রাম–কঙবাজার মহাসড়কের পাশে বসেই বিক্রি করেন। প্রতিদিন ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে বেচাকেনা। আবার কাঞ্চননগর থেকে দোহাজারী পর্যন্ত শত শত কিশোর ও যুবক পেয়ারা নিয়ে মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থেকে মহাসড়কে চলাচলরত বিলাসবহুল গাড়ির যাত্রীদের কাছে ডজন হিসেবেও খুচরা বিক্রি করে। চট্টগ্রাম–কঙবাজার মহাসড়কে যাতায়ত করার সময় দেখা যায় এমন চিত্র।
ধোপাছড়ি ইউনিয়নের চাপাছড়ি এলাকার পেয়ারা বাগান মালিক ইকবাল হোসেন জানান, এ অঞ্চলটি পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় কোনো ধরনের যত্নআত্তি ছাড়াই এখানে পেয়ারার প্রচুর উৎপাদন হয়। এখানকার পেয়ারা সুস্বাদু ও পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ হওয়ায় সারা দেশে এর চাহিদা রয়েছে। আধুনিক প্রশিক্ষণ দিয়ে সুদমুক্ত ঋণদানের ব্যবস্থা করা হলে এ অঞ্চলে শুধুমাত্র পেয়ারা চাষ করেই দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারবেন তারা। তিনি জানান, প্রতি বছর খাজনা দিয়ে পেয়ারা চাষ করেন তারা। প্রতি মৌসুমে কোটি কোটি টাকার পেয়ারা উৎপাদন হওয়া সরকারি এসব পাহাড় চাষিরা যাতে স্থায়ী বন্দোবস্ত পায় সে দাবি জানিয়েছেন অনেকেই। পাশাপাশি মাঝে–মধ্যে পাহাড়ি সন্ত্রাসী কর্তৃক এখানকার বাগান মালিক ও পেয়ারা শ্রমিকদের অপহরণের ঘটনা ঘটে। শারীরিক নির্যাতন ও বিপুল অংকের টাকা মুক্তিপণ দিতে হয় তাদের। চন্দনাইশের পাহাড়ি অঞ্চলে সন্ত্রাসীদের তৎপরতা কমাতে প্রশাসনের প্রতি জোর দাবিও জানান পেয়ারা বাগান মালিক ও শ্রমিকরা।











